শনিবার, জানুয়ারি ২১, ২০১৭


Find us on

স্বপ্ন এবং বাস্তব

কেন্দ্রের মোদি সরকার দেশে বুলেট ট্রেন চালানোর ব্যাপারে আগ্রহী। এ নিয়ে তাদের উদ্যোগ আয়োজন এগোচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বুলেট ট্রেনে আগ্রহ দেশবাসীকেও স্বপ্ন দেখায় উত্সাহিত করেছে। দেশ উন্নতির পথে দ্রুত এগোবে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রেলও গতি পাবে, এমনটাই তো স্বাভাবিক, এমন ভাবনাই তো যথাযথ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রেল এখনও তার পুরোনো ব্যবস্থাদিতেই যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় রাখতে পারছে না। রেলে সুরক্ষা তথা যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রেল এখনও নড়বড়ে অবস্থায়। কানপুর থেকে ষাট কিলোমিটার দূরে মালাসা ও পুখরায়ন স্টেশনের মাঝে রবিবার ভোররাতে ইন্দোর-পাটনা এক্সপ্রেস দুর্ঘটনায় এমনটা মনে হওয়া অসংগত নয়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাকে সাম্প্রতিক অতীতে ভারতীয় রেলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো বলে অভিহিত করা হচ্ছে।এ দুর্ঘটনায় প্রাথমিক হিসেবে সরকারি তরফে মৃতের সংখ্যা ১৪৫ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জখমের সংখ্যা দ্বিশতাধিক। নোট নিয়ে জাতির চরম দুর্ভোগের মধ্যে এমন সংবাদ এক কথায় মর্মান্তিক এবং দুর্ভাগ্যজনক। এই দুর্ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন তাঁদের পরিবারের প্রতি রইল সহানুভূতি। কিন্তু এহেন দুর্ঘটনার কারণ কী? প্রাথমিক যে ধারণা তাতে গাফিলতির বড়ো হয়ে উঠেছে। যে সমস্ত সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে তাও ভাববার মতো। যেমন বলা হচ্ছে, লাইনে ফাটল দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। শীতের সূচনায় সাধারণত লাইনে সংকোচন হয়। তা লাইনে চিড় ধরিয়ে দিতে পারে। আর তাতে বহু ক্ষেত্রে এই চিড় দুর্ঘটনার কারণ হয়। শীতের শুরুতে তাই লাইন রক্ষণাবেক্ষণে নিয়মমাফিক পরীক্ষা করা হয়। এই লাইরে তা কি করা হয়েছে? অন্য একটি অভিযোগ চাকা নিয়ে। দুর্ঘটনাগ্রস্ত এই ট্রেনের এক যাত্রী ট্রেন চলতে শুরু করার পর চাকার অস্বাভাবিক শব্দ শুনে মনে করেছিলেন নিশ্চয় কোনো গন্ডোগল রয়েছে। তিনি তা টিকিট চেকারকে জানিয়েছিলেন। পরে এক স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে স্টেশন কর্তৃপক্ষকেও নাকি জানিয়েছিলেন। তাঁর কথায় কেউ কর্ণপাত করেননি। এ যাত্রী এস-২ কামরাতে চেপে ইন্দোর থেকে উজ্জয়িনী যাচ্ছিলেন। যাই হোক, দুর্ঘটনায় যে সমস্ত কামরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তার মধ্যে এই কম্পার্টমেন্টও রয়েছে। এই ট্রেনের গতি নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। ইন্দোর-পাটনা এক্সপ্রেস ট্রেনের মতো দূরপাল্লার ট্রেনের গতি নাকি ঘন্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে রাখাই উচিত। কিন্তু অভিযোগ, চালক ট্রেন ছোটাচ্ছিলেন ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি বেগে। এক রেলকর্তা দাবি করেছেন, ট্রেন চলছিল ১১০-১২০ কিলোমিটার বেগে। অন্যদিকে, চালকের এক্সপ্রেস ট্রেন চালানোর মতো শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতি ছিল কিনা তাও নাকি খতিয়ে দেখা হবে। অর্থাৎ সে ব্যাপারেও সন্দেহ রয়েছে! ট্রেনের কামরা নিয়েও বক্তব্য রয়েছে। এখন অধিকাংশ রাজধানী বা শতাব্দীতে এলএইচবি কামরা ব্যবহৃত হয়। এই কামরাগুলি লাইনচ্যুত হলে একটি অন্যটির পিছনে ঢুকে যাওয়ার পরিবর্তে ঘাড়ের ওপর চড়ে যায়। ফলে প্রাণহানি কম হয়। ইন্দোর-পাটনা এক্সপ্রেসে মান্ধাতার আমলের টেলিস্কোপিক কামরা ব্যবহার করা হয়েছে। কম গুরুত্বের ট্রেনে এমনটাই নাকি হয়। দুর্ঘটনায় ঘটলে এক্ষেত্রে কামরাগুলি একটি অন্যটির ভেতরে ঢুকে যায়। তাতে প্রাণহানি বেশি হয়। অর্থাত্ দেখা যাচ্ছে, রেলে আধুনিক সরঞ্জাম এবং ব্যবস্থাদি সব ট্রেনে সংযুক্ত করা যায়নি। রেলকে সর্বাঙ্গীণভাবে আধুনিক করে তোলা যে আবশ্যিক তা যাত্রীসুরক্ষার দিক থেকে মেনে নিতে হবে। যাত্রীসুরক্ষা সুনিশ্চিত করার আগেই বুলেট ট্রেনের দিকে পা বাড়ানো কেবল চমক সৃষ্টি এবং বিপদের সম্ভাবনা বাড়ানো ছাড়া আর কিছু নয়। প্রধানমন্ত্রী আমজনতার রেলযাত্রা নিরাপদ করার ডাক দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বক্তব্য, যাত্রী নিরাপত্তা হাঁকডাকের ব্যাপার নয়, তা করে তুলতে হয়। দেশের তথা শাসকদল চলে ভোটের কথা মাথায় রেখে। তাই তাঁদের কেবল হাঁকডাক, বড়ো বড়ো কথা আর ভাবনা। কাজের বেলায় থেকে যায় ষোলো আনার গাফিলতি। নইলে রেলে ছোটো-বড়ো দুর্ঘটনা লেগে থাকবে কেন? পূর্বে পৃথক রেল বাজেট হত। বাজেট পেশের দিন রেল নিয়ে বিস্তর কথা হত। সরকারের ভাবনাচিন্তার আভাস মিলত। এবার তো সে প্রথার বিলোপ ঘটেছে। সাধারণ বাজেটের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে রেল বাজেটও। রেল নিয়ে বিশদ আলোচনা বা আলোকপাত এবার অনুপস্থিত থাকাই স্বাভাবিক। এদেশে সাধারণের যাতায়াতে রেলই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই রেলকে নিয়ে সাধারণের মধ্যে মাথাব্যথা বিস্তর। রেলযাত্রা নিরাপদ হোক, রেলে যাত্রীসুবিধা সুনিশ্চিত করা হোক, রেল ফিরুক শৃঙ্খলায়-এমনটা সবাই চায়। প্রধানমন্ত্রীর কথা থেকে মনে হয় তিনিও তাই চান। রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভুজিও নিশ্চয় তেমনটাই চান। কিন্তু তারপরেও রেলের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। কেন? আমরা এ অবস্থার শেষ চাই।