Find us on

দেশনায়কের পথে
অন্যান্য
প্রথম পাতা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবিস্মরণীয পটভূমিকায় নেতাজি তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজকে নিয়ে লড়েছিলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার শেষ যুদ্ধ। সিঙ্গাপুর থেকে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও তখনকার বর্মা হয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ প্রবেশ করেছিল মণিপুরে, ভারতের মাটিতে। এখন সেই পথেই নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজের স্মৃতি খুঁজে ফিরবেন সাইকেলে আফ্রিকা এবং সাহারা মরুভমি অভিযানখ্যাত অভিযাত্রী অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়। 
গোস্বামী তুলসীদাসকে উদ্ধৃত করে ভবঘুরে শাস্ত্রে রাহুল সাংকৃত্যায়ন লিখেছিলেন,
আজ পৃথিবীতে এমন ভবঘুরের দরকার যিনি তাঁর ভ্রমণকে কেবল ‘স্বান্তঃ সুখায়’ স্তরে
আবদ্ধ রাখবেন না। তাঁকে মনে রাখতে হবে, সব জিনিসকে তিনি যে দৃষ্টিতে দেখবেন,
ঘরে বসে থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষও যেন সে রকম দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেন। আবার সেই
শাস্ত্রেরই একেবারে শেষ পৃষ্ঠায রাহুলজি লিখেছিলেন, ভবঘুরে শাস্ত্রের চেয়ে
ভবঘুরেমির আদর্শ অনেক পুরোনো। ভবঘুরেমির ছাত্র হওয়ার পর থেকে আমার
নিজেরও বারবার মনে হয়েছে আদর্শটাই বড়ো কথা, শাস্ত্র বললেই কেমন যেন সিলেবাস
এবং প্রশ্নপত্র গোছের শোনায়। মনে হয়, বেঁচে থাকার তাগিদে এক সমাজের সিলেবাস
মেনে চলতে গিয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত, তায় ভবঘুরেমিকেও যদি ডুজ অ্যান্ড ডোন্টজ-এ বেঁধে
এক ফাইনাল পরীক্ষায় বসতে হয; তাহলে তো এন্ডগেম আসন্ন!
ভবঘুরে ঘর ছাড়ে নতুন কিছু জানার এক অদম্য কৌতূহলে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে,
সে তার ঘর, স্বজন, স্বদেশকে ভুলে যেতে চায়। জাত ভবঘুরেরা এসকেপিস্ট নয়। তাঁদের
চোখ-কান খোলা থাকে বাস্তবের রোজনামচায়, মগজে আনাগোনা করে কয়েক শতাব্দীর
ইতিহাস আর হৃদয় জুড়ে থাকে মানুষকে চেনার, তাকে আরও ভালবাসার আগ্রহ। তাদের
মনে এক অসম্ভব তাগিদ কাজ করে আবিষ্কারের বিস্ময় কাটিয়ে সত্যকে জানার এবং
সুযোগ পেলেই সেই অভিজ্ঞতা আরও পাঁচজনের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার। তাকে সেই
দায়িত্ব কেউ দেয়নি, তবু এক ঝলক তাজা বাতাস একটা বন্ধ ঘরের মধ্যে আনার জন্য
সে সর্বদাই উদগ্রীব। বাইরের দুনিয়ার হালহকিকত আপনজনের কাছে নিভৃতে বসে ভাগ
করে নেওয়াই তার একমাত্র স্বঘোষিত ধর্ম। তবে এই লেখার প্রারম্ভেই ভবঘুরেমির
চরিত্র এবং শ্রেণিবিন্যাসে আর না জড়িয়ে পড়ে আসুন, বরং ফিরে আসি সেই স্বান্তঃ
সুখায় তে।
স্বান্তঃ সুখায়, অর্থাত্, আপন মনের সুখের খোঁজে নিজের মাঝে মজে থাকার ঝোঁকেই
একসময় আমারও পথ চলা শুরু হয়েছিল। শুরু হয়েছিল পর্বতারোহণের হাত ধরে। প্রথম
দিকে অবশ্য কেবল বেরিয়ে পড়ার রোমান্টিসিজমটাই ছিল, আর ছিল অ্যাডভেঞ্চারের খিদে। দুঃসাহসিক, চ্যালেঞ্জিং কিছু করার মধ্যে একটা অপরিসীম পরিতৃপ্তি আমি
পেতাম। সেই পরিতৃপ্তিকে আজ মনে হয় স্বান্তঃ সুখায়- এক ধরনের ছেলেমানুষি
আত্মমগ্নতা। ঠিক যেন আমাকে আমার মতো থাকতে দাও যুগের যোগ্য স্লোগান। তাই
সেই উপলব্ধি আজ আমাকে নিজের কাছে করে তোলে অল্প হলেও হাস্যকর। ২০১২তে
আফ্রিকার অন্দরমহলের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার পর থেকে আমি রাহুলজির কথা
আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। তারপর থেকেই আমার ভবঘুরেমির মধ্যে সবসময়ে একটা
অর্থবহ এবং তাত্পর্যপূর্ণ কিছু করার তাগিদ কাজ করে। নিছক ব্যাকপ্যাকিং
কিংবা কোনো একটা বিখ্যাত পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার মধ্যে ক্ষণিকের আনন্দ পেলেও
আর পরিতৃপ্তি পাই না। সেই অতৃপ্তি থেকেই সাইকেলে সাহারা মরুভূমি পার, চিনের ভুলে
যাওয়া উপজাতি ব্ল্যাক লোলোদের সঙ্গে নিয়ে এক নতুন পর্বতমালার খোঁজ কিংবা
শংকরের স্বপ্ন সফলের উদ্দেশ্যে চাঁদের পাহাড় আরোহণের মত কাজের জন্ম হয়। তবু,
কেন জানি না কেবলই মনে হয় সময় ফুরিয়ে আসছে, এইবেলা কিছু কাজের কাজ করা
দরকার। কারণ ভবঘুরেমির দর্শন এবং পন্থা নিতান্ত নিরর্থক নয়। ইবন বতুতা থেকে
বিল ব্রাইসন, মার্ক টোয়েন থেকে এডোর্ড অ্যাবে, মার্কো পোলো থেকে পল থেরু,
আমার এই দাবির পক্ষে এমন অনেক ভবঘুরের নাম আমি লিখে যেতে পারি যাঁদের
ভ্রমণকাহিনি নিছক ট্রাভেলগ নয়- বরং মানুষের ইতিহাস পড়া এবং তাকে বোঝার এক
একটি অমূল্য দলিল।
আমি তাই ভবঘুরেমির পন্থা বেছে নিলাম আরও একবার। ভাবলাম, যেহেতু এক কৌতূহলী
পথিকের কাজটাই আমার দ্বারা হয়, তাই নিজেকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা
যাক এইবার! নিজেকে নিয়ে ফেলা যাক মাত্র ৭৫ বছর আগের এক ঐতিহাসিক
পটভূমিকায়। এমন এক ইতিহাস, যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আধুনিক
ভারতবর্ষের বুনিয়াদ। ফিরে দেখা যাক এমন এক সময় যখন দলগত রাজনীতির অনেক
ঊর্ধ্বে উঠে গর্জে উঠেছিল আমাদের দেশপ্রেম। আরও একবার কাছ থেকে দেখা যাক
ভারতবর্ষের শেষ স্বাধীনতার যুদ্ধ- দি লাস্ট ওয়ার অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স। ছুঁয়ে আসা
যাক এমন এক দুঃসাহসিক টাইমলাইন, যা হার মানাতে পারে যেকোনো হলিউড থ্রিলার
কিংবা অ্যাকশন মুভিকে। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং রাজসভার ঐতিহাসিকদের
বদান্যতায়, সে এমন এক সময় এবং তার নায়কের কাহিনি, যাকে ঘিরে গড়া হয়েছে
অহেতুক বিভ্রান্তির ঘেরাটোপ- একবার নয়, বারবার। এই সময়ে কেন্দ্রবিন্দু এমন
এক চরিত্র যিনি নিজেই দেশপ্রেম, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদের একটি
সংজ্ঞা; আবার মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কাছে একজন পথভ্রষ্ট রাজনৈতিক নেতা। এমন
এক মানুষ, যাঁর জীবন এবং কাজের পর্যালোচনা ছেড়ে, কেবল মৃত্যু নিয়ে ভারতবাসীর
রহস্যের জাল বোনার আগ্রহ অনেক বেশি, আজও।
এই ভবঘুরের কিন্তু আজও রাতের ঘুম চলে যায় সেই রোমহর্ষক দিনগুলির কথা ভাবলে,
যখন চিন্ডউইন নদী পার করে, আরাকানের দুর্ভেদ্য পাহাড়ি জঙ্গলে, এক অসম, কিন্তু দুঃসাহসিক যুদ্ধে একটু একটু করে স্বদেশের দিকে এগিয়ে চলছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের
নেহরু, গান্ধি এবং সুভাষ ব্রিগেড। তাই কেবল লাইব্রেরির বই ঘেঁটে কৌতূহল মেটার
কথা আমার নয়। আমার কেবলই মনে হয় ছুঁয়ে আসা দরকার সিঙ্গাপুর থেকে মালয়
পেনিনসুলা ধরে, বর্মার পাহাড়-জঙ্গল টপকে মণিপুরে পেঁছানোর সেই পথ, যেপথ দিয়ে
একদিন অগ্রসর হয়েছিল আমাদের আজাদ হিন্দ ফৌজ -কখনও ট্রাকে, কখনও
মালগাড়ির বগিতে বোঝাই হয়ে কখনও পায়ে হেঁটে। যে পথে ছড়িযে রয়েছে নেতাজি এবং
তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজের অসংখ্য স্মৃতি- দুঃসাহস, আত্মত্যাগ, ক্ষণিকের
বিজয়োল্লাস, অনেক রক্তক্ষরণ এবং এক হেরে যাওযা যুদ্ধের গ্লানি। যে পথে নামার
আগে নেতাজি তাঁর অনুগামীদের বলেছিলেন, আমি তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি,
অন্ধকারে অথবা সুর্যালোকে, দুঃখে অথবা সুখে, লাঞ্ছনায় অথবা বিজয়োত্সবে
আমি তোমাদের সঙ্গে থাকব। আজ আমি তোমাদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অভাব, ক্লেশদায়ক
পদযাত্রা ও মৃত্যু ছাড়া আর কিছু দিতে পারব না।
তাই আরম্ভ হোক এক পথ চলা। শুরু হোক সিঙ্গাপুরের সেই পাদাং থেকে, যে ময়দানে
দাঁড়িয়ে ১৯৪৩ এর ৬ জুলাই নেতাজি আজাদ হিন্দ ফৌজের কুচকাওয়াজ
আনুষ্ঠানিকভাবে পরিদর্শন করেছিলেন। যেখানে দাঁড়িযে নেতাজি তাঁর সেনাবাহিনীর
উদ্দেশে বলেছিলেন, Soldiers of Indias Army of Liberation, today is the
proudest day of my life. Today it has pleased Providence to give me the
unique privilege and honour of announcing to the whole world that Indias
Army of Liberation has come into being. তার ঠিক তিন দিন পরেই নেতাজি ঘোষণা
করেছিলেন এক সর্বাত্মক প্রস্তুতির পরিকল্পনা। বলেছিলেন, I want total
mobilization and nothing less. এই ঘোষণায নেতাজি গোটা পূর্ব এশিয়ার প্রবাসী
ভারতবাসীর হৃদয় জয় করে ফেলেছিলেন। এতদিন পরে যেন তাঁদের যোগ্য নেতার আগমন
হয়েছে। এই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে কৃষ্ণা বসু লিখেছেন, কে বা আগে প্রাণ, করিবেক
দান, পড়ি গেল কাড়াকাড়ি। শুধু প্রাণ নয়, ধন-প্রাণ নিয়ে পূর্ণ জমায়েতের ডাকে সাড়া
দিলেন সকল ভারতবাসী। তাই আমার এই পথ চলার একমাত্র উদ্দেশ্য কেবল নেতাজি
এবং তাঁর আজাদ হিন্দ বাহিনীর চরণরেখা ছুঁয়ে এক স্মৃতি রোমন্থন কিংবা ইতিহাসকে
ফিরে দেখা নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আজাদ হিন্দ আন্দোলনের উত্তরাধিকারটিকেও
খুঁজে বেড়ানো। গত এক বছর ধরে আমি নিজেকে নিয়োজিত করেছি নেতাজি এবং আজাদ
হিন্দ ফৌজ সংক্রান্ত পড়াশোনায়। আজ সময় এসেছে পথে নামার। আমি প্রস্তুত
নিজেকে সেই মানুষটির জীবনের অন্তিম অধ্যায়ে পদচিহ্ন অনুসরণ করতে, যিনি ছিলেন
ভারতবাসীর নেতাজি এবং স্বযং রবীন্দ্রনাথ যাঁকে ডেকেছিলেন দেশনায়ক সম্বোধনে।
সেই দেশনায়কের পথে এবার শুরু হোক এই ভবঘুরের তীর্থযাত্রা। আর হ্যাঁ একটা কথা
প্রথমেই পরিষ্কার করে দেওয়া ভালো- আমার এই অভিযানের সঙ্গে কোনো ষড়যন্ত্র-তত্ব বিলাসী ব্যক্তি বা দল, কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক নেই এবং আশা
করি ভবিষ্যতেও থাকবে না।

দেশনায়কের পথে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *