খিদে
অভিজিৎ বিশ্বাস
যে বই কেউ খোলে না, তার পাতা থেকে অক্ষরগুলো আলগা হয়ে গেলে সে চুপিচুপি সেগুলো চেটে নেয়। ভালোবাসা, বিপ্লব, ক্ষমা- সবই তার খাদ্য। তবু তার পেট ভরে না।
মানুষ এখন আর খুব একটা লাইব্রেরিতে আসে না। শহরের বুকে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় পরিত্যক্ত এই লাইব্রেরি। ধুলো জমা তাক, ছেঁড়া মলাট, ইঁদুরে কাটা পাতা- সবই এখন তার আশ্রয়। সে অন্য ভূতদের মতো রক্ত চায় না, কারও ঘাড়ও মটকায় না। সে শুধু চায় অক্ষর।
লেখক নির্মল বসু- সারাজীবন অসংখ্য বই পড়েছেন, লিখেছেন, তাক ভরে সাজিয়ে রেখেছেন দেশ-বিদেশের নতুন-পুরোনো বই। কিন্তু এখন আর কেউ আসে না। কারও হাতে সময় নেই।
মৃত্যুর পর থেকে নির্মল এই লাইব্রেরিতেই রয়ে গিয়েছেন- শব্দের স্বাদে-গন্ধে বেঁচে থাকা এক ভূত হয়ে।
সেদিন লাইব্রেরির এক কোণে বসে একটি মেয়ে কিছু লিখছিল। হঠাৎ সে লিখে ফেলে-
‘আমি খুব ক্লান্ত। আমি আর পারছি না। অন্তত কেউ আমার লেখা পড়ুক।’
শব্দের গন্ধে দিশেহারা হয়ে ছুটে এল নির্মল। সে চাইছিল শব্দগুলো খেয়ে ফেলতে।
কিন্তু না- খেয়ে ফেললে মেয়েটার কথাগুলো যে হারিয়ে যাবে, যেমন হারিয়ে গিয়েছিল তার নিজের কথা।
এই প্রথম সে নিজেকে না-খাইয়ে রাখল।
তাক থেকে আলতো করে একটি পুরোনো বই ফেলে দিল, যাতে মেয়েটি খেয়াল করে।
মেয়েটি চমকে তাকাল। বইটি হাতে তুলে নিল। তারপর পাতা উলটে পড়তে শুরু করতেই নির্মলের পেট ভরে যেতে লাগল- খিদে মিটে গেল।
অভিনেত্রী
জিকেল দে
তিস্তার বাঁধ ঘেঁষে অনেক খোঁজাখুঁজির পর খুঁজে পেলাম নমিতা মাসির বাড়ি। ঠিক বাড়ি নয়। ঝুপড়ি। বেড়ার দরজা ঠেলে যখন ভেতরে ঢুকলাম দিনের বেলাতেও অন্ধকারে ভিজে আছে গোটা ঘর। বিছানায় শুয়ে নমিতা মাসি। পাশে টুল টেনে বসলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘যাও না কেন? শরীর খারাপ?’
‘জ্বর। কাউকে পেলাম না খবর পাঠানোর। শরীর একটু ভালো আছে এখন। দিদিকে বলো কাল থেকে যাব। আজকের দিনটা একটু কষ্ট করে সামলে নিক। বাবু আছে কেমন?’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে কাশির দমকে থামল নমিতা মাসি।
দু’মাস আগে বাবার ছোটখাটো একটা স্ট্রোক হয়। সেই থেকে বিছানায়। সারাদিনের দেখাশোনার জন্য নমিতা মাসিকে ঠিক করে দেয় আমাদেরই অফিসের তরুণ। কিন্তু গত চারদিন কোনও খবর ছাড়াই নমিতা মাসি অনুপস্থিত। মোবাইলে যোগাযোগের কোনও ব্যবস্থা নেই। তরুণকে জিজ্ঞেস করাতে ও জানাল তিস্তার তিন নম্বর স্পারের কাছেই বাড়ি। সেই থেকেই খোঁজ নিতে আসা।
কথায় কথায় নজর গেল বেড়ার দেওয়ালে। বড় ফ্রেমে বাঁধানো একটা সাদা কালো ছবি। মঞ্চে অভিনয়ের দৃশ্য। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি অভিনয় করতে নাকি?’
নমিতা মাসি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘করতাম এককালে। এখনও ছাড়তে পারলাম কই! এখন যে আয়ার কাজ করি তা তো অভিনয়ই। কখনও মা, কখনও বোন কখনও মাসি বা দিদির ভূমিকায়। শুধু মঞ্চটা আলাদা।’

