আবার যদি মূলস্রোতে ফেরার সুযোগ মেলে

শেষ আপডেট:

মানবেন্দ্র সাহা

একদিন মনে হল, তাই তো অনেকদিন চাকরি হয়ে গেল– প্রায় সাড়ে তিন দশকের পালা সাঙ্গ হতে চলেছে আর কয়েকদিন পরে। কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেল, দশ, নয়, আট করে একদিন শূন্যে গিয়ে ঠেকবে। সত্যি সত্যি যখন অবসরের সময় যত এগিয়ে আসতে লাগল তখন এক ধরনের স্বস্তি পেতে থাকি। কত কিছুই না ভেবে রেখেছি অবসরকালীন জীবনে কী কী করব, কোন কোন বই পড়ব, কোথায় কোথায় বেড়াতে যাব। পুরোনো বন্ধুদের খুঁজে পেয়ে তাদের সান্নিধ্য আবার ফিরে পাব– এই আনন্দে মন মশগুল।  যারা ইতিমধ্যে অবসর নিয়েছে তারা সকাল বিকালে হাঁটে, পাড়ার মোড়ের রকে বসে আড্ডা মারে, মাঠে গিয়ে নরক গুলজার করে… তাদেরই সঙ্গে দেদার মজার জীবন কাটাব। আবার ব্যাগ নিয়ে ইচ্ছেমতো ঘুরে ঘুরে বাজার করব। শুনেছি যাঁরা অবসর নিয়েছেন তাঁরা অনেকেই একটু দেরি করে বাজারে যান। দেরিতে বাজারে গিয়ে দরদাম করে সস্তায় তরিতরকারি আর মাছ কেনা  যায়। এতে অবশ্য কোনও লজ্জা নেই। অনেকেই নাকি তাই করে। চাকরি জীবনের বেতন তো আর পাওয়া যাবে না,  অবসরকালীন জীবনে বেতনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পেনশনের টাকায় একটু পাকা পটল, পোকায় কাটা বেগুন, ট্যারা ঝিঙে, একটু দাগি আলু, মুখ-হাঁ করা স্কোয়াশ, শুকিয়ে যাওয়া গাজর আর শেষবেলায় ঝড়তি-পড়তি  মাছ কিনলে একটু সাশ্রয় হবে। অনেকেই নাকি এভাবে তাদের ব্যয়ভার লাঘব করে।

পেনশনভোগীদের তো আর বছর বছর ইনক্রিমেন্ট হয় না যা দিয়ে তাদের প্রাত্যহিক জীবনের মানোন্নয়ন ঘটাতে পারবে। তাদের একই পেনশনে থাকতে হয়  যতদিন বেঁচে থাকবে। তারা সব সময়ই সচেষ্ট থাকে কোনওমতেই যেন জীবনযাত্রার মান না বেড়ে যায়। তারপর ওষুধপত্র, চিকিৎসা, হাসপাতাল, নার্সিংহোম ইত্যাদির চক্কর তো আছেই। তাই ‘সাধু সাবধান’ ভঙ্গি নিয়ে টিপে টিপে পয়সা খরচ করে,  যা লোকের কাছে কখনো-কখনো দৃষ্টিকটু ঠেকলেও তার কাছে অন্য কোন উপায় থাকে না।

কালের নিয়মে একদিন সত্যি সত্যি অবসর নিয়ে নিলাম। হেডমাস্টারমশাই তাঁর ঘরে আমাকে ডেকে নিয়ে হাতে একটা ফুলের তোড়া আর একটা রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ দিয়ে বললেন, ‘ভালো থাকবেন’। স্কুলের ছাত্রছাত্রী,  কাকপক্ষীও জানল না যে আমি চলে যাচ্ছি। সেদিন যেটুকু কাজকর্ম ছিল সব গুটিয়ে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। ভেবে রেখেছিলাম বিদায়বেলায় কী বলব, কিন্তু সেসব আর বলা হল না বরং গলার কাছে দলা পাকানো একটা কষ্টের দলার সঙ্গে সেই বক্তৃতাও গিলে নিলাম। কয়েকজন শিক্ষক–শিক্ষিকা বিদায়বেলায় এসে প্রণাম করল, আমায় ভালো থাকার কথা বলল, দীর্ঘজীবন কামনা করল। কেউবা আবার দূর থেকে লক্ষ  করল যে একজন কেউ চলে যাচ্ছে। স্কুলে আবেগের ঘাটতি হয়েছে, সেদিন তা  নতুন করে উপলব্ধি করলাম। বুঝলাম সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে জনপ্রিয়তাও অর্জন করতে পারিনি।

অবসরকালীন জীবন কাটতে লাগল। ক’দিনের ভালোলাগায় অচিরেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের উজ্জ্বল মুখ আর ওদের সান্নিধ্যের অভাব বোধ করতে লাগলাম। কত কথা বলতাম পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে, এই তুই একটু সোজা হয়ে বস,  তোর হাতের লেখায় মনোযোগ দে, তুই নামতায় একেবারে কাঁচা– কুড়িঘর পর্যন্ত মুখস্থ করে এনে আমাকে শোনাবি। বাংলা বর্ণমালার পঞ্চাশটি  বর্ণকে আবার নতুন করে ছাত্রদের শেখাতাম, অনেকেই যে বলতে হোঁচট খায়। বাংলা যে বড়ই দুঃখিনী বর্ণমালা। শিক্ষিত মানুষেরাও বাংলায় ভুল লিখলে অপরাধ বোধে ভোগে না  যতটা ইংরেজিতে ভুল লিখলে ভোগে। ওরা কি শেষপর্যন্ত সেগুলো ঠিকঠাক শিখল? খুব জানতে ইচ্ছে করে। স্কুলে আসতে আসতে হঠাৎ সমীর একদিন আসা বন্ধ করল। ওর খোঁজখবর নেব নেব করেও আর নেওয়া হয়নি। কেন যে খোঁজ নিতে যাইনি,  আজকেও আফসোস হয়। কত ছেলেমেয়েকে যে কত উপদেশ দিয়েছি, তার কোনও ঠিকঠিকানা নেই। কেউ কেউ নিশ্চয়ই কখনও হয়তো আমাকে ‘জ্ঞানদাশঙ্কর’ বলে  ডেকেছে। তা ডাকুক। লোকে বলে শিক্ষকরা জাতির মেরুদণ্ড। কথাটা যে ফ্যালনা নয় তা আমি বুঝেছি যখন অন্য সরকারি চাকরি ছেড়ে এখানে শিক্ষকতার কাজে আবার যুক্ত হয়েছি। মেরুদণ্ড সোজা রাখলে বাঁচার আনন্দটাই যে অন্যরকম সেটা টের পাই এখনও। মাঝে মাঝে কোমরের পেছনে হাত দিয়ে দেখি জিনিসটা ঠিক জায়গায় আছে কি না।

জীবনসায়াহ্নে এসে অবসরের নিরিবিলি প্রহরগুলো যখন একঘেয়েমির ধূসর চাদরে ঢাকা পড়ে, তখন পুনরায় কর্মমুখর পৃথিবীতে ফিরে আসা অনেকের কাছেই এক নতুন ভোরের মতো প্রতিভাত হয়। এই ফিরে আসার অভিজ্ঞতা কেবল জীবিকার প্রয়োজনে নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের সার্থকতা খুঁজে পাওয়ার এক নিরন্তর সংগ্রাম। কর্মজীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যাঁরা বিশ্রামের আলস্যে তিতিবিরক্ত হয়ে পড়েছেন, তাঁদের কাছে পুরোনো অভ্যাসে ফেরা মানে যেন মরুপথে মরূদ্যানের সন্ধান পাওয়া। অভিজ্ঞতার ঝুলি সাজিয়ে যখন তাঁরা আবার পরিচিত দপ্তরে বা নতুন কোনও কর্মস্থলে পা রাখেন, তখন তাঁদের চোখেমুখে খেলে যায় আত্মবিশ্বাসের এক স্নিগ্ধ দীপ্তি। দীর্ঘ বছরের অর্জিত প্রজ্ঞা আর ধীরস্থির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের করে তোলে অনন্য, যা নবীন প্রজন্মের চপলতার ভিড়ে এক বটবৃক্ষের মতো আশ্রয় দেয়। তবে নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি, এই প্রত্যাবর্তনের পথটি কুসুমাস্তীর্ণ নয়; সময়ের দ্রুতগামী রথ আর প্রযুক্তির নিত্যনতুন মারপ্যাঁচের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে প্রাণ হাঁফিয়ে ওঠে। ডিজিটাল পর্দার নীল আলো কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জটিল সমীকরণ চিরচেনা কাজের জগৎকে কিছুটা অচেনা করে তোলে। শারীরিক ক্লান্তি আর সময়ের সীমাবদ্ধতা রক্তচক্ষু দেখালেও, মনের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কর্মঠ থাকার ব্যাকুলতা প্রতিটি বাধা ডিঙিয়ে যেতে শেখায়। দিনশেষে, অবসর ভেঙে কাজে ফেরার এই অভিজ্ঞতা যেন হেমন্তের ঝরা পাতার গান ছাপিয়ে বসন্তের নতুন কুঁড়ি মেলে ধরার এক স্পর্ধা।

এখনও মাঝে মাঝে আমার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে আমার সেই স্কুল প্রাঙ্গণে। সবাইকে নানা মনীষীর কথা বলতে ইচ্ছে করে। শিক্ষকরা ওদের মনীষীদের কথা বলেন কি না জানতে ইচ্ছে করে।  কিন্তু বাস্তবে কি আর যাওয়া হয়?  মাঝে মাঝে রাস্তায় কোনও কোনও ছাত্রের সঙ্গে দেখা হলে  প্রণাম করে।  কেউবা আমার কুশল জানতে চায়।  তারা সবাই সমানভাবে জীবনে হয়তো সফল হয়নি। কেউ বড় বড় বাড়ি গাড়ি হাঁকিয়েছে, কেউবা উদায়স্ত পরিশ্রম করে সাইকেলে করে মালপত্র এ দোকান ও দোকানে বিক্রি করে জীবিকানির্বাহ করে। তেমনি এক ছাত্র একদিন রাস্তায় দেখা হতে এগিয়ে এসে আমাকে প্রণাম করে বলল, ‘স্যর আপনার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সৎ থাকার চেষ্টা করি।’ জানতে ইচ্ছে করে ছেলেরা কি এখনও কোমর সোজা করে বেঞ্চে বসার চেষ্টা করে?  নিজের বাবার নাম বলার আগে কি শ্রী ব্যবহার করে,  বানান কি  ওরা এখনও  ‘বানাম’ লেখে ? ‘সম্মান’ শব্দটিকে সন্ধি বিচ্ছেদ করে বুঝেছিলাম সম+মান। ওরা কি এখনও ‘সন্মান’ বলে বা লেখে?  বন্ধুদের উপদেশ, ‘বেশি বুঝতে চাস না– তবলা বাজানো শেখ বা গান গেয়ে সময় কাটানোর চেষ্টা কর। সমস্ত হিসেবই মিলে যাবে।’ মনে পড়ে, ‘মেলাবেন তিনি ঝোড়ো হওয়া আর / পোড়ো বাড়িটার / ঐ ভাঙা দরজাটা/মেলাবেন।’

 মানুষ তো জীবনভর মেলাতেই চায় কিন্তু যখন দেখি মিলের থেকে অমিলই বেশি — তা দূর করব কীভাবে? এ কোন মনীষীর কাজ? কোনও একদিন একজন মনীষী এসে নিশ্চয়ই বলে উঠবেন,  ‘এসো, এসো উঠে এসো। তাঁর উত্তোলিত  দু’বাহুর মাঝখানে যে হৃদয় সেখানে সবাইকে ঠাঁই দেবেন, এই আশায় থাকি।’ আবার ফিরে যেতে ইচ্ছা করে যা কিছু শেখানো হয়নি যা কিছু এখনও  বলা হয়নি—সেকথা কীভাবে বলব? আর  ফিরে গেলেই বা ঠিক কী শেখাব?

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ

Share post:

Popular

More like this
Related

গ্যাসওয়ালা

শুভ্র মৈত্র এর চেয়ে বেশি মতিন কিছু চাইতেই পারে না।...

লোডশেডিং, কলিং বেল ও ভোম্বলের প্রেম

সানি সরকার মেঘলা আকাশ চিরে আচমকা এক চিলতে রোদের...

অণুগল্প

অযোগ্য সুদীপ্তা বন্দ্যোপাধ্যায়  হেডস্যর ফোন করে জানালেন, কোর্টের নিদানে অযোগ্যের তালিকায় নাম রয়েছে সৌম্যর। ফিজিক্সে মাস্টার্স...

উত্তরের সাহিত্যিক

নীতীশ বসু নীতীশ বসু শিশু সাহিত্যিক। মূলত ছোটদের জন‌্য...