পরাশরবাবু হইতে সাবধান

শেষ আপডেট:

শুভ্রদীপ চৌধুরী

পরাশরবাবুর সঙ্গে দেখা হওয়া মানেই বিপদে পড়া। না জেনে বিপদে পড়লে বিস্তর সহানুভূতি পাওয়া যায়। কিন্তু পরাশরবাবুর পাল্লায় পড়লে চেনা মানুষেরা বলেন, ‘দোষ তোমার, তুমি পালাওনি কেন? তোমার উচিত ছিল লোকটাকে দেখেই একছুটে অন্তত ৫০০ মিটার দূরে যাওয়া। তা যখন পারোনি তখন সহ্য করো।’

নিশ্চয় ভাবছেন, পরাশরবাবু কে? তাঁর সঙ্গে দেখা হলে কী এমন বিপদ হয়?

যাঁরা  চেনেন না তাঁদের জানিয়ে রাখি, আপনারা সত্যিই ভাগ্যবান। আর যাঁরা এরপরেও জানতে চান তাঁদের জন্য পরাশরবাবু সম্পর্কে কয়েকটা তথ্য রইল।

এক, সত্তর ছুঁইছুঁই পরাশরবাবু সবসময় কঠিন সত্যি বলেন। অজস্র গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত, সত্য হল কঠিন, বিস্বাদ, বাজে এবং কষ্টদায়ক। অন্যদিকে মিথ্যা সবসময় সুন্দর, চমৎকার এবং অসাধারণ। দুই, তিনি কোনও কাজেই কারোর সাহায্য চান না। তিন, এই পয়েন্টটা সবচেয়ে জটিল এবং ভয়ংকর। পরাশরবাবু চেনা অচেনা যে কোনও মানুষকে অপচয় করতে দেখলে ছুটে আসেন। বাধা দেন এবং বেশ কিছুটা সময় ধরে বেঁধে বোঝান।

শুরুর অংশে ফিরি। সেই যে পরাশরবাবু আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। আমি পালাতে পারলাম না। পরাশরবাবু আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন, ‘তোমাকেই খুঁজছিলাম। গতকাল তোমার একটা লেখা পড়লাম কাগজে। বলা ভালো অনেক কষ্টে পড়তে হল। অনেকটা সময় নষ্ট হল।’ আমি বললাম, ‘আচ্ছা।’ পরাশরবাবু বললেন, ‘আচ্ছা মানে? যা বলছি মন দিয়ে শোনো। তোমার ভালো হবে। হাতে সময় না থাকলেও চলো বসি কোথাও। জরুরি কথা দাঁড়িয়ে হয় না।’ বাধ্য ছাত্রের মতো আমি তাঁর পিছুপিছু একটা প্রতীক্ষালয়ে গিয়ে বসলাম।

তিনি শুরু করলেন, ‘লেখা ছাপার ক্ষেত্রে তোমাকে মিতব্যয়ী হতে হবে। বুঝিয়ে বলি, আমায় আড়ালে সবাই কিপটে বলে। আমাদের  নাকি কৃপণের বংশ। তবে কথাটা মিথ্যে নয়। আমার বাবা ছিলেন কৃপণ। ঠাকুরদা ছিলেন মহাকৃপণ। বাবা অর্থ ব্যয় থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন।  শেষ বয়সে বাবা একদিন আমায় ডেকে বললেন, আমি সারাজীবন অজস্র ভুল করেছি পরাশর। খুব প্রয়োজনেও টাকা-কড়ি খরচ করিনি। অসুখ পুষে রেখেছি। সবসময় নিজের লাভের কথা ভেবেছি। অন্যদের দোষারোপ করেছি। অন্যের সাফল্যে ঈর্ষা করেছি। অন্যেরা কিপটে বলেছে। চুপচাপ সয়ে গেছি আর টাকা জমিয়েছি। এভাবেই চলতে চলতে আমি একসময় স্বার্থপর হয়ে গেলাম। বুঝলাম মানুষের দুঃখ কষ্ট আমায় আর টানছে না। এখন বুঝতে পারছি,  এভাবে কৃপণের মতো জীবন নষ্ট করার চেয়ে খরচ করে আনন্দ উপভোগ করলে ভালো করতাম। এইটুকু বলে বাবা থামলেন। বাবার চোখে জল টলমল করতে লাগল। আমি তাঁর চোখের জল মুছে দিলাম। বাবা আবার বলতে লাগলেন, আমি চাই তুই কৃপণ নয় মিতব্যয়ী মানুষ হয়ে ওঠ। দিনকাল যা আসছে তাতে মিতব্যয়ী না হলে টিকে থাকা মুশকিল হবে।

আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, বাবা মিতব্যয়ী মানে?  সেটা কি কৃপণের কয়েক ধাপ নীচের অবস্থা? বাবার ঝাপসা চোখেই হাসির ঝিলিক দেখলাম। বললেন, বুঝলি পরাশর, এই পৃথিবীতে কিছু মানুষ শান্তির প্রচার করেছে, কিছু মানুষ সত্যের প্রচার করেছে, আবার কিছু মানুষ ভালোবাসার কথা বলেছে। আমি চাই তুই মিতব্যয়ী হয়ে ওঠার প্রচার কর। পারবি না?

আমি তেমন কিছু না বুঝেই বাবাকে কথা দিলাম, পারব। এর পরের ঘটনা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় তবুও বলি, বাবা দিনকয়েক পরে সমস্ত মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন। রেখে গেলেন অনেক স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, টাকা। আমার একার জন্য তা অনেকটাই। যাইহোক, বাবার কথা মতো আমি মিতব্যয়ী হয়ে ওঠার কাজে লেগে পড়লাম। অল্পদিনেই বুঝতে পারলাম, কিপটে আর মিতব্যয়ী মানুষের মধ্যে যে পার্থক্য আছে তা অনেকেই মানেন না। এই যেমন তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তুমিও এই বিষয়ে কিছুই জানো না।’

আমি মিনমিন করে বললাম, ‘ঠিকই ধরেছেন।’

পরাশরবাবুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবং তিনি বলতে লাগলেন, ‘মিতব্যয়িতা মানে হল আয় বুঝে ব্যয় করা। দরকারের বেশি খরচ না করা। কখনও অপচয় না করা। মনে রাখবে এই মিতব্যয়ী মানুষেরা পরিবেশের বিরাট উপকার করে। কার্বন উৎপাদনে তাদের ভূমিকা থাকে না। এই মানুষেরা হেঁটে চলে, নয়তো সাইকেল চালায়। ভালো-মন্দ যাচাই করে নিতে পারে। সম্পদ অল্প হলেও তা কাজে লাগাতে জানে। সবচেয়ে বড় কথা মিতব্যায়িতা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। শুধু অর্থ সঞ্চয়ের জন্য নয়, এই মিতব্যয়িতা চর্চা একজন মানুষের সবদিকে করা উচিত। যেমন, সময় অপচয় না করে মিতব্যয়ী হওয়া। যেসব নেতারা বলতে শুরু করলে থামতে পারেন না। আশ্বাসের পর আশ্বাস দিয়ে যান। তাঁদের অবশ্যই মিতব্যয়ী হতে হবে।

ঘুষ দেওয়া ও খাওয়ার বিষয়ে মিতব্যয়ী হতে হবে। বলা ভালো, ধীরে ধীরে বাঙালির সর্বক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হয়ে উঠতে হবে। অল্পতে সন্তুষ্ট হবে। মনে রাখবে, যে জীবনে যত কম প্রত্যাশা, সেই জীবন ততই সুখী।’

সেদিন  ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় পরাশরবাবুর বক্তব্য শোনার পর বাড়ি ফিরলাম।  মানুষটা সম্পর্কে আমার ধারণা পালটে গেল। এই পৃথিবীতে সঠিক পরামর্শ দেবার মানুষ কমে আসছে। এতদিন চারদিকে শুধু কেরিয়ার গড়ার কথা শুনেছি। কেরিয়ার থেকে উপার্জন সংরক্ষণ করার কথা ভুলে যাই আমরা। বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে যা প্রয়োজন তার থেকে বেশি অপ্রয়োজনীয় জিনিসে ভরাই আমাদের ঘর।

 অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে আর বিজ্ঞাপন আসে না, বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে আমরা অনুষ্ঠান দেখি। লোভনীয় বিজ্ঞাপনের ফাঁদ, আর কথায় কথায় সহজ কিস্তিতে লোন দেবার জন্য মরিয়া সংস্থারা আমাদের ঘিরে ফেলেছে। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষেরাও ঋণের চক্করে পড়েছে। কিস্তির ফাঁদে নাজেহাল অবস্থা তাদের। আমরা ভুলে গেছি, ভবিষ্যৎ আমাদের অজানা। ভুলে গেছি, কোনও সম্পত্তি চিরস্থায়ী নয়। ভুলে গেছি, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় দরকার। শুধু পরিবারের জন্য নয়, অন্যকে সাহায্যের করতেও দরকার সঞ্চয়।

পরাশরবাবুর কাছে আমি আজকাল মাঝেমধ্যেই যাই। তাঁর কথা শুনি।  শুনতে ভালো লাগে। আত্রেয়ী নদীর পাড়ে একটা চমৎকার পার্ক হয়েছে। সেখানে মাঝেমধ্যে বসি আমরা। পরাশরবাবু তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেন। গত আড্ডায় শোনা তিনটি অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বলি-

এক, সমাজসেবক পল্টুবাবুর বাড়ি গিয়েছিলেন। যে কোনও অনুষ্ঠানে ঘণ্টাখানেকের বক্তৃতা তিনি অবলীলায় দিতে পারেন। আর সামান্য কয়েক মিনিট বলব বলার পরেও তিনি বলতেই থাকেন। পাড়ার অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তাঁর প্রতিভার জোরে মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে। সেই সমাজসেবক পল্টুবাবু ঘুম থেকে উঠে দেখলেন তাঁর বসার ঘরে অপেক্ষা করছেন পরাশরবাবু।

পল্টুবাবু ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলেন, কিছু বলবেন? পরাশরবাবু তাঁকে তিনদিনের মধ্যে মিতব্যয়ী হবার জন্য বোঝালেন প্রায় দু’ঘণ্টা। নয়তো  বলে এলেন, আবার যাবেন,  বারবার যাবেন।

দুই, আকাশ দত্তকে ধরেছিলেন রাস্তায়। এই ছেলের আছে কথায় কথায় তেল দেবার বিরাট প্রতিভা। এভাবেই এগিয়ে গেছে অফিসে। যত এগিয়েছে নিজের কাজ, দায়িত্বের কথা গেছে ভুলে। পরাশরবাবু তাকে বলেছেন, অনেক হয়েছে এবার একটু মিতব্যয়ী হও।

তিন, চায়ের দোকানে তুফান তুলে রাজা উজির মারেন অখিল চন্দ। কথায় কথায় ঢপের বন্যা বইয়ে দেন।  মিথ্যে কথাকে বারবার চেঁচিয়ে বলে সত্যি করান। সেই অখিলবাবুকে সাবধান করেছেন পরাশরবাবু, ‘ঢপে লাগাম দিন, এক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হলে আপনার পক্ষে ভালো।’

এইসব অভিজ্ঞতা শোনার  ফাঁকে দেখি, আমাদের কাছের একটা বেঞ্চে এসে বসেছে একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা। প্রেমিক বিস্তর বলে চলেছেন। বলছেন, ভবিষ্যৎ জীবনে তিনি কী কী করবেন।  জোর গলায় একটার পর একটা আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন। প্রেমিকা মন দিয়ে শুনছেন। পরাশরবাবু সেদিকে খেয়াল করে গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, ছেলেটিকে এক্ষুনি না থামালে পরবর্তীতে নিয়মিত দাম্পত্যকলহ হবে। মেয়েদের স্মৃতিশক্তি মারাত্মক।  আমি যাই, ছেলেটিকে কথাবার্তায় মিতব্যয়ীর হবার পাঠ দিয়ে আসি। এবার বুঝলেন! সাধে কী আর এই লেখার নাম রেখেছি, পরাশরবাবু হইতে সাবধান।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

More like this
Related

প্রিয় সমস্ত খেলা ও আমাদের একাকিত্ব 

হিমি মিত্র রায় আমাদের দেশের নিজস্ব ঘরোয়া খেলা বলতে প্রথমেই...

গুলিডান্ডা, গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা… পাল্লা ভারী হারিয়ে যাওয়া দলের

অপরাজিতা কুণ্ডু মাদুরে বসে দুলে দুলে পড়া মুখস্থ করছিল...

শচীনের রেকর্ড ভেঙে দেন অখ্যাত ভাগচাষি

সন্দীপন নন্দী মাঘের হাড়কাঁপানো শীতে আগুনের ওম কার না...

লাল কেবিন ও রূপকথার ভোর

শুভময় সরকার ভোরবেলা বেরোনোর কারণ আর কিছুই নয়, জায়গাটার পুরোনো...