বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬

বারো টাকা বাঁচাতে গিয়ে শেষমেশ ক্ষতি ৩৯০ টাকা

শেষ আপডেট:

মানিক সাহা

মিতব্যয়ী মানুষ পৃথিবীতে খুব বেশি নেই- এ কথা ঠিক। তবে অন্য গ্রহের কথা কে জানে? হয়তো মঙ্গল গ্রহে এমন কোনও সম্প্রদায় আছে, যারা ছাতা কিনে তালাবন্ধ বাক্সে রেখে দেয়- আমাদের পাড়ার নৃপেনবাবুর মতো! মিতব্যয়ী মানে কিন্তু কৃপণ নয়- এ নিয়ে বিভ্রান্তি চিরকালীন। কিন্তু অনেকেই মিতব্যয়ী নামের আড়ালে এমন সব কাণ্ড করেন যে কৃপণতাও লজ্জা পায়।

নৃপেনবাবু পেশায় শিক্ষক। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। শীত–গ্রীষ্ম–বর্ষা, তিন ঋতুতেই তাঁর হাতে দাদুর আমলের কাঠের ডাঁটিওয়ালা ছাতা, আর কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। কিন্তু এ ছাতা খুলতে নৃপেনবাবুর ভয়ই লাগে! পাড়ার অনেকেই বিস্ময়ে বলে- ‘নৃপেনবাবুর ছাতা আছে, কিন্তু সেই ছাতা খোলা অবস্থায় দেখা আর ঈশ্বর দর্শন সমান।’ ছাতাটি তিনি কখনও বগলে রাখেন। কখনও ছড়ির মতো হাতে রাখেন। কিন্তু মাথার উপর? ওহ! সে তো বেমানান বিলাসিতা।

একদিন ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। নৃপেনবাবু ছাতা হাতে দ্রুত পায়ে দৌড়াচ্ছেন। যেন বৃষ্টি নয়, ইলিশের দাম কমার খবর পেয়েছেন। আমি অবাক হয়ে বললাম,

– ‘জেঠু, ছাতা থাকতে ভিজছেন কেন?’ তিনি গাম্ভীর্য নিয়ে বললেন, ‘এই সামান্য বৃষ্টিতে ছাতা খুলব? ছাতা ভিজে নষ্ট হবে! আর বাড়ি তো কাছেই। ফালতু ছাতাটা ভেজানো ঠিক হবে না।’ রোদ উঠলেও একই দৃশ্য। প্রশ্ন করলে বলেন, ‘এত রোদে ছাতা খুললে রং নষ্ট হয়ে যাবে।’ লোকজন মাঝে মাঝে সন্দেহ করে- ছাতাটি আদৌ খোলে কি না?

একদিন সকালে সুধাংশুকাকু অফিসে যাবেন। হাতে ব্যাগ, চোখে বিশাল সানগ্লাস, মুখে একরাশ দৃঢ়তা। কারণ, আজ তিনি ঠিক করেছেন- এক টাকাও বেশি বাসভাড়া দেবেন না। পুরোনো বাসে ৮ টাকা ভাড়া, আর নতুন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসে ২০ টাকা। কাকাবাবু নতুন বাস দেখলেই দিক বদলান।

সেদিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন, হঠাৎ দূর থেকে ধুলোমাখা সেই পুরোনো বাসটাকে দেখলেন। তাঁর মুখে যেন বিজয়ের হাসি, ঠিক তখনই পাশে এক স্কুল ছাত্র জিজ্ঞেস করল- ‘কাকাবাবু, ওই বাসটা তো আজকাল খুব কম আসে। ধরতে পারবেন তো?’ কাকাবাবু বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘ধরবই! ওটাই তো আমার ওপর দয়া করে আসে মাঝে মাঝে। অতিরিক্ত ভাড়া দেব? ছিঃ!’ কিন্তু বাসটা যেন কাকাবাবুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। আগে পেছনে ধুলো তুলে থেমে গেল, যাত্রী নামছে, উঠছে… কাকাবাবু ছোটাছুটি করে এসে প্রায় ধরে ফেলেছেন- ঠিক তখনই বাসটা আবার চলতে শুরু করল।

এবার কাকাবাবু দৌড়াচ্ছেন, ব্যাগ দুলছে, সানগ্লাস নাকে কাত হয়ে গেছে। পাশে এক অটোওয়ালা ডাকল- ‘এ ভাই, উঠবেন? অফিস তো লেট হয়ে যাবে!’

কাকাবাবু হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, ‘না রে ভাই, ১২ টাকা ভাড়া বেশি নেবে। ও ৮ টাকার বাসটা আমি আজ ধরবই!’

শেষমেশ ৮ টাকার সেই বাসটা তিনি ধরলেন ঠিকই, কিন্তু জায়গা পেলেন একদম পেছনে, জানলার সিটের কাছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বুঝলেন জানলা আটকে আছে। গরম হাওয়াও আসছে না। কাকাবাবুর মুখ লাল, ঘাম ঝরছে। তারপরও নিজেকে বোঝাচ্ছেন- ‘না না, ঠিকই করেছি। ভাড়া বেঁচেছে তো!’

এদিকে, বাসের সবাই ওঁর হাঁফানো দেখে হেসে মরছে। শেষমেশ কাকাবাবু অফিসে পৌঁছে বলেন, ‘একটু গরম লেগেছে ঠিকই, কিন্তু বাঁচালাম ১২ টাকা! কী বলো?’

অফিসের সবাই তখন চাপা হাসি লুকোতে ব্যস্ত। বাড়ি ফিরে হিসেব করতে গিয়ে দেখলেন তিনি সাশ্রয়ের বদলে খরচ বেশি করে ফেলেছেন। কারণ বাসের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে সানগ্লাস ভেঙেছে, দাম ছিল তিনশো টাকা; পা হালকা মচকে গেছে, মলমের দাম নব্বই। বারো টাকা বাঁচাতে গিয়ে শেষমেশ ক্ষতি হয়েছে তিনশো নব্বই টাকা।

এবার আসি পরান মণ্ডলের কথায়। তিনি পাড়ার ধনকুবের, পাটের ব্যবসা করেন। কিন্তু টাকার প্রতি তাঁর প্রেম এত গভীর যে মনে হয় টাকাগুলোকে তিনি নিজের ছেলেমেয়ের মতোই লালন করেন। স্বাস্থ্য সচেতনতার আড়ালে তিনি যা করেন, তা দেখে মানুষ তাঁকে ডাকেন- ‘কিপটে মণ্ডল’। অতিথি এলে সবাই ভাবে চা-জলখাবার পাওয়া যাবে। কিন্তু পরান মণ্ডল এক্ষেত্রে অন্য গ্রহের বাসিন্দা। অতিথি ঢুকতেই জিজ্ঞেস করবেন, ‘চা খাবেন? তবে এখন মানুষ আর তেমন চা খায় না, তাই না?’ তারপর জিজ্ঞেস করবেন, ‘কখন ভাত খেয়েছেন? ভাত খাওয়ার পর চা? ওঃ, ওটা তো হজম নষ্ট করে!’

এরপর তাঁর বিজ্ঞানসম্মত বক্তব্য- ১. চা পান অ-ভারতীয়, শাস্ত্রে নিষিদ্ধ। ২. সকালে খালি পেটে চা = বিষ। ৩. দুধ-চিনি দেওয়া চা = পরিপাকের শত্রু।

এত যুক্তির পরও যদি কেউ চা চাইতে সাহস করে, তবে তিনি ভৃত্য পাঁচুকে ডাকবেন– ‘একটা লিকার চা বানিয়ে আনো; দুধ, চিনি, গ্যাস একটাও নষ্ট করবে না।’

অতিথি স্বাভাবিকভাবেই বলবে- ‘না না, থাক! চা খাব না।’

এটাই তো মণ্ডলবাবুর আসল লক্ষ্য।

একদিন তাঁর একমাত্র মেয়েকে দেখতে এল পাত্রপক্ষ। ঘটক তাদের কাছে পরান মণ্ডলের সম্পত্তির এমন বর্ণনা দিয়েছিল যে তারা ভাবছিল- ‘এ বাড়িতে ঢুকলে হয়তো মেঝে থেকে সোনা বেরোবে!’ কিন্তু ভিতরে ঢুকেই প্রথম ধাক্কা- মণ্ডলবাবুর চা–দর্শন। এল চারটি সাদা পেয়ালা- দুধ–চিনি–ছাড়া লিকার চা।

পাশে আটটা বিস্কুট- ঠিক আটটা, একটাও কম না বেশি না। এত হিসেব দেখে পাত্রপক্ষের মুখের হাসি শুকিয়ে তুলসীপাতার মতো কুঁচকে গেল। মেয়েকে দেখা হল, ভালোই লাগল। কিন্তু মিষ্টি? না! মিষ্টি তো অপচয়! ফলে মিষ্টিমুখ না করেই পাত্রপক্ষ বিদায় নিল। ঘটকমশাই তো রীতিমতো বিস্ফোরিত-

 ‘এত টাকা বুকে নিয়ে চিতায় উঠবেন নাকি! ছিঃ! আমার মানসম্মান শেষ!’ পরান মণ্ডল হেসে বললেন, ‘বিয়ে ঠিক হলে তখন মিষ্টি দেব। এখনই খাইয়ে দিলে আর পছন্দ না হলে তো সব খরচ বৃথা!’ ঘটকমশাই মাথায় হাত দিয়ে চলে গেলেন। বিয়ে সেদিন ঠিক হয়নি। তবে পরে মেয়ের বিয়ে হল বেশ ভালোভাবেই। পরান মণ্ডল অতিরিক্ত আড়ম্বর করেননি, কিন্তু শালীন, সুন্দর আয়োজন করেছিলেন। সবাই বুঝল, তিনি কৃপণ নন, কেবল অতিমাত্রায় হিসেবি। যে হিসেব সাধারণ মানুষ বোঝেন না।

জীবনের শেষ বয়সে পরান মণ্ডল তাঁর সঞ্চিত অর্থ থেকে এক কোটি টাকা দান করলেন একটি দাতব্য হাসপাতাল তৈরি করতে। হাসপাতাল তৈরি হল তাঁর মৃত্যুর পর। নাম দেওয়া হল- পরান মণ্ডল মেমোরিয়াল হাসপাতাল। পাড়ার মানুষ বলল, ‘যে মানুষ চা খাওয়াতে কাঁপতেন, তিনি এক কোটি টাকা দান করলেন!’ কেউ কেউ বলল, ‘টাকাগুলো এত বছর ধরে জমিয়ে তিনি সত্যিই ভালো করেছিলেন। এমন হিসেবি হওয়া ভালো’ কিন্তু সবার মনেই একটাই কথা- পরান মণ্ডল তাঁর সারাজীবনের হিসেবের শেষে সবচেয়ে বড় মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

প্রিয় সমস্ত খেলা ও আমাদের একাকিত্ব 

হিমি মিত্র রায় আমাদের দেশের নিজস্ব ঘরোয়া খেলা বলতে প্রথমেই...

গুলিডান্ডা, গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা… পাল্লা ভারী হারিয়ে যাওয়া দলের

অপরাজিতা কুণ্ডু মাদুরে বসে দুলে দুলে পড়া মুখস্থ করছিল...

শচীনের রেকর্ড ভেঙে দেন অখ্যাত ভাগচাষি

সন্দীপন নন্দী মাঘের হাড়কাঁপানো শীতে আগুনের ওম কার না...

লাল কেবিন ও রূপকথার ভোর

শুভময় সরকার ভোরবেলা বেরোনোর কারণ আর কিছুই নয়, জায়গাটার পুরোনো...