মানিক সাহা
মানুষের জীবন এক নিরন্তর দৌড়ের নাম। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই শুরু হয়ে যায় নিত্যদিনের ব্যস্ততা। কারও স্কুল–কলেজ, কারও অফিস–কাছারি, কারও রোজগারের নিরন্তর সাধনা—সব মিলিয়ে যেন দিনকে দিন মানুষের জীবন আরও দ্রুতগতির সুতোয় গাঁথা হয়ে যাচ্ছে। আধুনিক সভ্যতার গায়ে আমরা যত নতুন আলোর মালা পরাই, ততই বাড়ছে সময়ের অভাব, ক্লান্তির ভার। জীবিকার তাগিদে মানুষ আজ মেশিনের মতোই ছুটে চলেছে। অথচ এই ছুটে চলার মধ্যেই কখনো-কখনো মন চায় একটু থামতে—এক মুহূর্তের জন্য হলেও নিজেকে ফিরে পেতে, নিঃশ্বাস ফেলতে, ভিড়ের ভেতর নিজের অস্তিত্বটুকু খুঁজে নিতে।
জীবনের ব্যস্ততার এই চাপাকলের চাকা মানুষকে শুধু ঘোরায়ই না, ধীরে ধীরে ভিতর থেকে শুষে নেয় শক্তি, সৃজনশীলতা, আর মনে লুকিয়ে থাকা শান্তির বোধ। প্রতিদিনের দায়দায়িত্ব, প্রতিযোগিতা, সাফল্যের চাপ, প্রমাণ করার তাগিদ—সবকিছু মিলিয়ে মন কখনো-কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়ে। যেন এক অদৃশ্য ভার আমাদের কাঁধে সদা চেপে বসে আছে। প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মনে হয়—‘আর পারছি না। একটু বিশ্রাম চাই। একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা চাই।’
এই ‘ক্ষণিকের অবসর’-এর প্রয়োজনীয়তা আজ অতীতের যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি। কারণ আজকের মানুষ শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও অতিমাত্রায় ক্লান্ত। সোশ্যাল মিডিয়া, ব্যস্ত কর্মজীবন, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব—সবমিলিয়ে আমাদের মাথার ভেতর যেন সারাক্ষণ একটি অদৃশ্য কোলাহল বেজে চলে। কোনও কাজ না করলেও মনে হয় হয়তো কিছু একটা বাকি পড়ে আছে। এই অস্থিরতা মনকে চঞ্চল করে তোলে, ভাবনাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেয়, আর মানুষকে নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়।
অনির্বাণের কথাই ধরা যাক৷ বিরাট কর্পোরেট কোম্পানির বড় পদে চাকরি করে সে। বাড়ি থেকে প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে তার কাজের জায়গা। চরম ব্যস্ত মানুষ সে। কাজ থেকে মুহূর্তের জন্যও তার যেন অবকাশ নেই। মা -বাবা চেয়েছিল ছেলে প্রতিষ্ঠিত হবে- প্রচুর উপার্জন করবে। অনির্বাণ তা-ই করেছে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে নিজের অস্তিত্বকেই হারিয়ে ফেলেছে। মায়ের অসুস্থতাও তাকে তার কাজ থেকে সরতে দেয়নি। সরবে কী করে- হাতে নতুন প্রোজেক্ট, আর প্রোজেক্ট কমপ্লিট করতে পারলেই প্রোমোশন। অফিসের কিউবিকলের ছোট্ট পরিসর ছেড়ে নিজস্ব কেবিন পাবে সে। পদোন্নতির এই সুযোগ কি ছাড়া যায়! পদোন্নতি হল। কিন্তু ছাড়তে হল মাকে। চিরদিনের জন্য। ফ্লাইটের উইন্ডো সিটে বসে সে ভাবছিল তার ছোটবেলার কথা। তার মায়ের কথা। যে মায়ের কোনও অবসর ছিল না। কোনও ক্লান্তি ছিল না। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা তার ডিউটি। কেউ তার কাজের কথা ভাবেনি। কারণ মায়ের কাজ তো চাকরি নয়। বেতন পাওয়া যায় না। অথচ এই এক নারী না থাকলে একটি সংসার অচল। তার অস্তিত্ব পরিবারের সকলের কাছে নিরাপত্তার আভাস দিত। মায়ের কি কোনওদিন একটু সময়ের জন্য কাজ থেকে অবসর নিতে মন চায়নি! ক্ষণিকের অবসর- যে সময়ে সে নিজেকে নিয়ে ভাবতে পারবে। ফুল পাখি তারাদের কথা ভাবতে পারবে৷ ভাবতে পারবে একটা পাহাড়ি গ্রামের কথা যেখানে সূর্যোদয় অনেক অনেক সুন্দর। হয়তো ভাবে। কিন্তু সেই ভাবনার কোনও মূল্য নেই আমাদের কাছে। কারণ তাদের কাজের কোনও বেতন নেই।
অনির্বাণের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। এবার মায়ের চির অবসর। চির শান্তি। একটাই দুঃখ মাকে সে আর জীবিত দেখতে পারবে না। এখন গিয়ে দেখবে বরফে ঢাকা মাছের মতো একটা শরীর। তার মা। যখন বেঁচে ছিল তখন তার জন্য সময় ছিল না অনির্বাণের। এত কাজের চাপ। অনির্বাণ পালাতে চায়। হারিয়ে যেতে চায়। কেউ খুঁজে পাবে না। কেউ বলতে পারবে না- এটা করুন, ওটা করুন। এমন একটা অবসর সে নেবে যার কোনও নাম নেই৷ নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করবে সে। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল একটি পুরোনো কথা— ‘Rest is not idleness; it is the pause that makes music meaningful.’
জীবনকে যদি সত্যিই একটি সুরের মতো ধরা হয়, তবে সেই সুরের সৌন্দর্য আসে তাল-লয়ের ওঠা–নামায়। বিরতি ছাড়া কোনও সংগীতই সুন্দর হয় না। মানুষের জীবনও তো তেমনই। সবসময় দৌড়োতে থাকলে মন একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনির্বাণ বুঝল—গত কয়েক মাস ধরে সে শুধু দৌড়াচ্ছে, থামছে না; কাজ করছে, কিন্তু যাকে বেঁচে থাকা বলে সেরকমভাবে বাঁচছে না। তার মনে হল এবার একটু ছুটি নেওয়া দরকার। একটা হাফ রিটায়ারমেন্ট- ক্ষণিকের অবসর। আমাদের প্রত্যকের মধ্যে এমন এক অনির্বাণ বাস করে৷ সে কাজ করতে করতে ভুলে যায় যে জীবনেরও একটা মুখ আছে, যে মুখটা শুধু হাসে, কাঁদে না। সেই মুখটা দেখতে গেলে মাঝে মাঝে থামতে হয়। জীবন শুধু উপার্জনের হিসেব নয়। একটু সময় নিজের জন্যও রাখতে হয়। না হলে মানুষের ভেতরের আলো নিভে যায়।
আধুনিক মানুষের বড় সমস্যা হল সে নিজের জীবনকে জীবনের মতো করে বাঁচার সময় পায় না। সে শুধু দায়িত্ব পালন করে, লক্ষ্য পূরণ করে, আবার নতুন লক্ষ্য তৈরি করে। কিন্তু জীবনের মধ্যে যে আনন্দ আছে, শান্তি আছে, প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকার যে সৌন্দর্য আছে—সেগুলোর স্বাদ পেতে গেলে দরকার একটু বিরতি। এই বিরতি মানুষকে শেখায় কীভাবে নিজেকে বোঝা যায়, কীভাবে নিজের ভেতরের সত্তাকে স্পর্শ করা যায়।
আজকের সমাজে ‘বার্ন আউট’ শব্দটি খুব পরিচিত। অতিরিক্ত কাজ, অতিরিক্ত লক্ষ্য, আর বিশ্রামের অভাবে মানুষ ভিতর থেকে জ্বলে যায়। এই বার্ন আউট ঠেকাতে হলে মানুষের দরকার নিয়মিত বিরতি। কাজের মাঝেও কিছুটা সময় নিজের জন্য আলাদা রাখা খুব প্রয়োজন। প্রায়ই দেখা যায়, যারা নিয়মিত একটু একান্ত সময় পান, তারা আরও শান্ত, আরও স্থির, আর জীবনের প্রতি আরও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে পারেন।
ব্যস্ত জীবনে ক্ষণিকের অবসর তাই শুধু ইচ্ছার বিষয় নয়, জীবনের অপরিহার্য অংশ। এই বিরতিতে আমরা নিজেদের ভুল–ত্রুটি বিচার করতে পারি, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সাজাতে পারি, মনকে পরিষ্কার রাখতে পারি। যে ব্যক্তি নিজের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারে, নিজের অনুভূতিকে বুঝতে পারে, তার জীবন হয় আরও সুসংহত, আরও অর্থপূর্ণ।
জীবনের চাকা যত দ্রুতই ঘুরুক, মানুষের মন চায় একটু শান্তি, একটু থামা। জীবিকার তাগিদে আমরা যত পরিশ্রম করি, ততই দরকার কিছুটা বিশ্রাম, কিছুটা আত্মমগ্নতা। কারণ মানুষ শুধু কাজ করার জন্য বাঁচে না; মানুষ বাঁচার আনন্দ অনুভব করতেও বাঁচে। আর সেই আনন্দটুকু ধরে রাখতে হলে জীবনের ব্যস্ততার ভিড়ে নিয়মিত কিছু সময় আমাদের নিজেদের জন্য রাখতে হয়। আর এর জন্যই আমাদের নিতে হয় ‘ক্ষণিকের অবসর’।

