পাঞ্চালি দে চক্রবর্তী
-ওগো, শুনছ? কী হল কথা কানে যাচ্ছে না?
ধুর! এই লোকটা যে কি করে না! প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই এই এক কাপ চা, জলখাবার নিয়ে বসে যাবে টিভির সামনে। ওই হয়েছে এক বিজ্ঞদের অনুষ্ঠান। দুনিয়ার যত পণ্ডিত-বিজ্ঞ ওই অনুষ্ঠানে হাজির হবে আর নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে দুনিয়ার মানুষের মাথা চিবিয়ে খাবে। আর ঠিক তেমনই হয়েছে আমার বাড়ির লোক। চায়ের সাথে-সাথে যেন এদের কথাগুলোকেও গলাধঃকরণ করছেন, কাল অফিসে গিয়ে ওই কায়দায় উনিও নিজের বীরত্ব দেখাবেন, রাগে গজগজ করতে থাকে সোমা।
-আরে কি গো? কানে তালা লেগে গেল নাকি তোমার! আরও জোরে চ্যাঁচায় সোমা।
হঠাৎ করে বৌয়ের এমন তীব্র হুংকার শুনে টিভির সাউন্ড খানিক আস্তে করে জানলার পর্দা তুলে অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করে অঘোর, ‘কী হয়েছে? অমন ষাঁড়ের মতো চ্যাঁচাচ্ছ কেন? পাড়ায় ডাকাত পড়ে গেল নাকি?’
-চ্যাঁচাব না মানে? কখন থেকে ডেকে চলেছি শিগগির এসো।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনুষ্ঠানের জ্ঞানগর্ভ আওয়াজকে মিউট করে দরজার বাইরে পা রাখতে গিয়ে সে দেখে সোমা নিজের জুতোর একপাটি আর তার একপাটি পরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সোনাবুড়ির মাকে চেঁচিয়ে ডাকছে।
-না! এদের নিয়ে আর পারা যায় না।
-আরে, আমি কি পাগল যে তোমার মতো দু’পায়ে দু’রঙা চটি পরে দৌড় লাগাব?
হঠাৎ নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় জিভ কেটে ফেলে সোমা। প্রচণ্ড উল্লাসের সাথে চেঁচিয়ে বলে, ‘আরে! পাড়ায় একটা সাইকেল চোর ধরা পড়েছে গো, সবাই মিলে তাকে ব্যাপক মারছে। তাই তো তোমাকে ডেকে যাচ্ছি কখন থেকে!’
‘অ্যাঁ…?? কোথায়?’- অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করে অঘোর।
‘ওই যে পচাদের বাড়ির উলটোপাশে লাইট পোস্টে বেঁধেছে ছেলেটাকে।’ সোমা উত্তেজিত হয়ে বলে।
পাড়ায় বরাবর ‘বড়দা’ বলে পরিচিত অঘোর মিত্র লুঙ্গিটাকে টাইট করে বেঁধে, ফুলশার্টের হাতাটাকে কনুইয়ের ওপরে গোটাতে গোটাতে হাঁটাদৌড় লাগালেন ঘটনাস্থলের দিকে। এমন ঘটনা– অথচ কেউ তাকে একবারও মোবাইলে খবর দিল না কেন?
ও হরি! সে নিজেই তো মোবাইলে চার্জ করতে বসিয়েছে মোবাইল সুইচ অফ করে। আসলে সন্ধ্যা ৭টার এই ‘তর্ক-বিতর্ক’ অনুষ্ঠানটা অঘোরের বড় পছন্দ, ওই সময়ে তাকে তো ফোনে পাওয়া সম্ভব নয়, অনুষ্ঠান শেষে মোবাইলটাকে সুইচ অন করে অঘোর। ওরে বাবা! এতগুলো মিসড কল! আবার হোয়াটসঅ্যাপে পুকিং-পুকিং করে আওয়াজ। বেশিরভাগেরই একই প্রশ্ন, ‘কি গুরু? ফোন তুলছ না কেন? কোথায় তুমি?’
তা হোক। সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে-ছুটতে অ্যাই-অ্যাই করতে করতে ঘটনাস্থলে গিয়ে উপস্থিত হয়। গিয়ে দেখে একটা ১৫-১৬ বছরের হাড়গিলে প্যাংলাটাইপ ছেলেকে পাড়ার কয়েকজন মাতব্বর ছেলে মিলে লাইটপোস্টে বেঁধে উদুম ক্যালানি দিচ্ছে। যেন সবারই এমন একটা ভাব– পেয়েছি এক পিস, এতদিন এই স্বপ্নটাই দেখছিলাম। টলিউড-বলিউডে দৌড়োবার সাহস না থাকলে কি হবে পাড়ার সবাই তো জানবে যে– আমরা ক্যালানি দিতে ওস্তাদ। পথচলতি মানুষ সবাই থমকে দাঁড়িয়েছে। রাস্তায় টোটো রিকশার প্যাঁ-পু আওয়াজ, সাইকেলের ক্রিং-ক্রিং। সবাই-সবাইকে ঠেলছে জায়গা ছেড়ে দাঁড়াবার জন্য। কিন্তু কে শোনে কার কথা! এত ভালো একটা ঢিসুম ঢিসুমের শুটিং কেউ মিস করতে চাইছে না।
‘আরে ও দিদি, একটু সরুন না।’ পেছন থেকে এক উৎসাহী দর্শকের অনুরোধ অপর এক উৎসাহী মহিলা দর্শককে। ‘কোথায় সরব! দেখছেন না ভিড়।’ বিরক্তি ঝড়ে পরে মহিলার গলায়। ‘ও দাদা একটু এগোন না…’ পেছন থেকে উৎসাহী জনতার চিৎকার শোনা যায়।
‘আরে ছাড় ওকে। ছেড়ে দে। আর মারিস না রে।’ একরাশ উৎকণ্ঠা মেশানো অনুরোধ ভেসে আসে মুক্তির মায়ের গলা থেকে।
‘আর করব না দাদা। ও মা গো… আমার ভুল হইসে। আমারে মাপ কইরা দ্যান।’ হাড়গিলে প্যাংলাটাইপ ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে। কী বললি? ভুল হয়ে গেছে? ঠাস-ঠাস-ঠাস-ঠাস, আবারও কয়েকটা কিল-ঘুসি আছড়ে পড়ে ছেলেটার গায়ে। ‘ও মা গো!’ বলে আর্ত চিৎকার করে ওঠে ছেলেটা।
‘আরে ওকে ছেড়ে দে। ওকে পুলিশে দে।’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে বুঁচকির বড়মা। বুঁচকির প্রেমিক লাড্ডু, আর তার তিন শাগরেদ ভোলা, বাপ্পা আর ছোটন মিলে ছেলেটাকে পেটাচ্ছে। লাড্ডুকে এভাবে মারতে দেখে গর্বে বুক ফুলে ওঠে বুঁচকির। ওর প্রেমিককে ওরকম হিরোর রূপে দেখতে পেয়ে নিজেকে পছন্দের নায়িকা মনে করে বেশ গর্ববোধ হয় তার। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুঁটির সাথে দিনকয়েক আগে কী নিয়ে যেন মনোমালিন্য হয়েছে তাদের। তাই কথা বন্ধ। পুঁটির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ভাবে– ‘দ্যাখ, আমার হিরো কেমন দিচ্ছে।’ কিল-ঘুসি পড়তেই থাকে ছেলেটার গায়ে। ছেলেটা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মাফ চাইছে। আবারও বুঁচকির বড়মা চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ওকে পুলিশে দে তোরা।’ ক্রমাগত মারতে মারতে ছেলেটার ঠোট ফেঁটে রক্ত পড়ছে। ছেলেটা আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। হাত দুটো পেছনে ল্যাম্পপোস্টে বাঁধা।
রাধামোহনবাবুর নাতি সূর্যশেখর ওরফে ভাদু সন্ধ্যাবেলা কম্পিউটার ক্লাস থেকে ফিরে বাড়ির উঠোনে সাইকেলে তালা না দিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। সেই সময় সাইকেল চোরটি নাকি এপাড়া দিয়েই যাচ্ছিল। হঠাৎ ওর ভাদুর সাইকেলটি নজরে আসে। ব্যাস, সে সাইকেল নিয়ে পালায়। আর অমনি ভাদুর দিদা সেটা দেখতে পেয়ে,‘ভাদু, কে যেন তোর সাইকেল নিয়ে পালালে… চোর চোর… ধর ধর…’ বলে চ্যাঁচাতে থাকে। মুহূর্তে পাড়ায় শোরগোল পড় যায় ‘চোর-চোর- চোর-চোর।’ যে যেখানে ছিল, হাতের কাজ ফেলে দিয়ে ছুটে আসে উৎসব পালন করতে।
সোমা অঘোরকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে রান্নাঘরে গ্যাসের সিলিন্ডারটা বন্ধ করতে যায়। গ্যাসে সে ভাত চাপিয়েছিল। উৎসব পালন করতে গিয়ে যদি তার ভাত পুড়ে যেত তাহলে আজ নিজের বাড়িতেই আরেকটা কেলেঙ্কারি ঘটে যেত। সোমার শ্বশুর রাঘবচরণ মিত্র বিপত্নীক, অশীতিপর বৃদ্ধ। ঠিক সময়ে বুড়োর খাওয়া চাই। না হলে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলবে। বাবু হয়ে বসে কোলের ওপর দু’হাত রেখে চোখটা আধবোজা করে রেখে খুতনিটা ক্রমাগত নাড়তে থাকে রাঘবচরণ। ছেলে-বৌমার চ্যাঁচামেচি শুনে আর সোমার ওরকম দৌড়াদৌড়ি দেখে সে ভাবে বোধহয় পাড়ায় দুর্গাঠাকুরের বিসর্জন হচ্ছে। আর সেই উপলক্ষ্যে মেলা বসেছে। বুঝতে পারে না যে কী হয়েছে। সোমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে বৌমা?’
‘পাড়ায় একটা সাইকেল চোর ধরা পড়েছে বাবা।’ একগাল হেসে জবাব দেয় সোমা।
-ও! তা তুমি, আমার জন্য একটু জিলিপি আনবে না?
জিলিপি! আকাশ থেকে পড়ে সোমা। সাইকেল চোর ধরা পড়াকে সে শুনেছে ঠাকুরের বিসর্জন চলছে। বুড়ো হাড় জ্বালিয়ে খেল। ঠিক করে কানে শোনে না। তার আবার খাওয়া চাই। পাশ থেকে সোনাই চেঁচিয়ে বলে, ‘পাড়ায় একটা চোর ধরা পড়েছে দাদু। সাইকেল চোরকে লাইটপোস্টে বেঁধে পেটানো হচ্ছে।’
ওদিকে ছেলেটাকে মারতে মারতে প্রায় ধরাশায়ী করে ফেলেছে লাড্ডু, বাপ্পা আর ভোলা। ওদের গায়ের জামা রাস্তায় পড়ে রয়েছে। তিনজনেই ফুল প্যান্টের ওপর স্যান্ডোগেঞ্জি গায়ে দাঁড়িয়ে দরদর করে ঘামছে। চোখেমুখে গর্ব।
এমন সময় অঘোরবাবু চেঁচিয়ে বলে, ‘অ্যাই সর। ছাড় ওকে। ছাড় বলছি।’
‘বড়দা, তুমি জানো না। আজ এই ছোকরা কি কাণ্ড করেছে।’ হাঁফাতে-হাঁফাতে চেঁচিয়ে বলে ছোটন।
-আমি সব শুনেছি, তুই ছাড় ওকে।
ছেলেটার হাতের বাঁধন খুলে রাস্তায় বসায় অঘোর মিত্র। তারপর বলে, ‘কী রে? সাইকেল চুরি করে কী করবি? জুয়া খেলবি নাকি?’ ছেলেটা হাতের কনুইতে মুখে ঢেকে রেখে হাউমাউ করে কেঁদে যাচ্ছিল। অনেকক্ষণ কাঁদার পর মুখ তুলে বলে, ‘আমার ছোট বোনটা হসপিটালে ভর্তি বাবু। ডাক্তার বইলছে ওরে আর বাঁচান যাইবো না। ও পাশের ব্যাডের কারে যেন হরলিক্স খাইতে দ্যাখসে। ছোটবেলা থিকা কোনওদিন ওসব ও খায় নাই। খালি নামই শুনসে। আজ ওর হঠাৎ খাওয়ার ইচ্ছা হইসে। তাই ও আমারে হরলিক্স কিনতে কইসে। কোথা থেকে দিমু কন? যে দোকানে কাজ করতাম। মালিকের দোকান বন্ধ করে দিসে। কাজ নাই। মাঠে কাজ করতাম। বৃষ্টির জন্য সেটাও বন্ধ, কোথা থেকে ওরে হরলিক্স কিনা দিমু কন বাবু? বোনডারে তো কোনওদিন কিসু দিতে পারি নাই।’ বলে ছেলেটা আবার হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করে।
‘তাই বলে (একটা অশ্রাব্য শব্দ উচ্চারণ করে) তুই সাইকেল চুরি করবি!’ বলে পা তুলে ছেলেটাকে মারতে যাবে, অমনি অঘোরবাবু ধাক্কা দিয়ে ‘যা সর এখান থেকে’ বলে লাড্ডুকে সরিয়ে দেয়। সকলকে অবাক করে দিয়ে ছেলেটাকে বাড়ির গেটের কাছে নিয়ে আসে অঘোর মিত্র। দৌড়ে নিজের প্যান্টের পকেট থেকে দুটো পাঁচশো টাকার নোট বের করে ছেলেটার হাত দিতেই ছেলেটা অঘোরবাবুর হাত দুটো ধরে আরও জোরে কাঁদতে থাকে।
ওদিকে সোনাইয়ের আরও জোরে জোরে পড়ার আওয়াজ পাওয়া যায়। ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।’

