Tuesday, July 16, 2024
Homeরংদার রোববারসেই পান্না সবুজ জল

সেই পান্না সবুজ জল

  • সেবন্তী ঘোষ

ভৌগোলিকভাবে তিস্তার কাছাকাছি মানুষ বলে কবে যে তিস্তা সৌন্দর্যে আলাদা করে মুগ্ধ হয়েছি মনে নেই। জ্ঞান হওয়া ইস্তক যেখানে আপনার ওঠাবসা, সেখানে একটি শিশির বিন্দুর দিকে কারই বা চোখ যায়? মহানন্দা পাড়ের বাসিন্দা আমরা। তাও আমরা শৈশবে একটিমাত্র সেতু পেরিয়ে তখনই ওপারে যেতাম, যখন কার্সিয়াং যাওয়ার দরকার পড়ত।

নদী বলতে হাতের কাছে ফুলেশ্বরী যাকে আমরা শৈশবে নর্দমা বলে চিনিনি। প্রথমবার তিস্তা আমার কাছে ভারী এক বিষণ্ণ গল্প হয়ে এসেছিল। জলপাইগুড়ি শহরে আমার পিসির বাড়ি। তিস্তার বন্যায় তাদের সবকিছু ধুয়েমুছে গেল। পুতুলখেলার শাড়ি হিসেবে বন্যায় নষ্ট হওয়া পিসির বেনারসির একটা পাড় দীর্ঘদিন ধরে আমার কাছে ছিল। সেই আটাত্তরের ভয়ংকরী তিস্তার গল্প পরে কবি শঙ্খ ঘোষের কাছে শুনি ও পড়ি।

ওই যে আমাদের শহর থেকে ডানদিকে ঠিকরে গেল রাস্তাটা, তারপর আকাশবাণী পেরোলেই শিলিগুড়ি ফ্লাওয়ার মিলের মতো বিক্ষিপ্ত কিছু কারখানা, তারপরেই আবছা হতে হতে ঘন জঙ্গল আর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ি চড়াই উতরাই ধরা। ডানদিকে গভীর খাদ ফেলে বাঁদিকে পাহাড়ের গা দিয়ে চুইয়ে আসা জল আর ঝাঁটা গাছ দেখতে দেখতে বাঘপুলে গিয়ে তিস্তা দেখে ফেলা। উপরে সে তখন বাধাহীন, ফলে দুরন্ত স্রোতে ফেনা তুলে পাথরে ধাক্কা মেরে বয়ে চলেছে। বাঘের মূর্তিটির পাশ দিয়ে একটি সরু রাস্তা তিস্তার দিকে নীচে নেমে গিয়েছে। বাড়িতে বন্ধুবান্ধব এলে আমরা সে রাস্তা দিয়ে বহুবার নীচে নেমেছি। নামলেই বিরাট বিরাট পাথরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তার অপার্থিব সৌন্দর্যে ধাঁধা লেগে যেত। পরবর্তীকালে দেবেশ রায়ের তিস্তা বাড়ির বৃত্তান্তে পড়া বাঘারু বর্মনদের দেখিনি বটে, কিন্তু নির্জন পাখিদের দূরে দূরে পাথরের উপর থেকে তীব্র স্বরে শিস দিয়ে পিছনের জঙ্গলে উড়ে যাওয়া দেখেছি।

পাহাড় থেকে নেমে আসা একটি স্রোতস্বিনী শুধু জলধারা মাত্র নয়, তার চারপাশ, আরণ্যক জীবন, প্রকৃতি তার জলজীব আর সমতলের দু’পাশে থাকা মানুষদের তার উপর নির্ভরতা নিয়েই তার চলমান রূপ। তিস্তাকে নিয়ে তার পাশে থাকা কত জনজাতিদের কত গান, তিস্তাপাড়ের মানুষদের কত গল্প কবিতা! বাইরে থেকে ঘুরতে আসা মানুষদের কাছে করোনেশন ব্রিজে নিয়ে গিয়ে তিস্তা দেখানো আর তাদের বিস্ময় মুগ্ধ দৃষ্টি, এই ছিল আমাদের গর্বের উপহার।

সেবকে ওই দুই পাহাড়ের মাঝখান থেকে বয়ে আসা তিস্তার পান্না সবুজ জল আর উৎসের দিকে জমে থাকা মেঘ, এই দৃশ্য বারবার দেখেও ফুরোত না। কিন্তু মেঘ মেঘের মতোই থাকল, পাহাড়ের উপর বাঁধের পর বাঁধ দিয়ে তিস্তাকে খাঁচার ম্রিয়মাণ বাঘ বানিয়ে দেওয়া হল। যতই পোষ মানাও, বনের জন্তুর মন থেকে বন মুছে দেওয়া যায় না যেমন, বেঁধে রাখা তিস্তাও ছাড়া পেলে কেমন ভয়ংকরী হয়ে ওঠে তা আমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।

সেবকের কাছে গুলমা স্টেশনের আগে পশ্বাশ্রয় বলে একটি স্টেশন ছিল। বাবার কাছে শোনা, নামটি আমার দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়েতে চাকরি করা ঠাকুরদার দেওয়া। সে পশুও নেই, চারদিকে ঘন জনবসতি নিয়ে স্টেশনটিও বেমালুম উবে গেছে। আমার কৈশোর অবধি তিস্তার উপরে কোনও বাঁধ ছিল না। মনে রাখা দরকার প্রকৃতি নিজেকে বদল করবেই। আজ যেখানে গভীর অরণ্য, হয়তো একদা তার তলায় ছিল হ্রদ। ওই জলাশয়ের প্রাণী ও গাছপালার সারে অরণ্যটি পুষ্ট হয়ে মাথা তুলেছে। খোদার ওপর খোদকারি না করে আমাদের এই বদলে যাওয়া প্রকৃতিকে বুঝতে হবে। আমাদের টিকে থাকার জন্য শান্ত রাখতে হবে তাকে।

উন্নয়ন বিষয়ে এক গল্প দিয়ে লেখাটি শেষ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের কুমিল্লায় কবি বন্ধু তারিক সুজাতের গ্রামের বাড়িতে অনেকে মিলে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখা গেল রাস্তা একেবারেই মুহূর্তে মুহূর্তে বাঁক নিয়ে সর্পিলগতিতে চলেছে। অথচ আশপাশে তেমন পরিমাণে জলাশয় বা টিলার বাধা নেই। কৌতূহলে জানা গেল, গ্রামে রাস্তা করার জন্যে জমির দরকার পড়ল। আর গ্রামবাসীরা জমি দিতে সম্মত হলেন কিন্তু প্রত্যেকের দাবি তাঁর বাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা যেতে হবে! এই হল প্রত্যেকের উন্নয়নের চাহিদা পূরণ করা।

ঠিক এভাবেই পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকার গ্রামে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষ যদি জলবিদ্যুৎ চাইতে থাকেন তাহলে প্রায় প্রতি বাঁকে বাঁকে বাঁধ দিতে হবে এবং আপনি শহরে বসে উন্নয়নের প্রতিটি সুবিধে পেয়ে ওই মানুষদের দাবিকে উপেক্ষা করার মতো বর্বরও হতে পারবেন না। ঠিক এই দ্বিধার সামনে থেকে সমাধান পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প পরিষেবাগুলি বিকাশের দিকে নজর দিলে মনে রাখতে হবে এই বিকাশ ভারতের মতো জনবহুল দেশে প্রয়োজনীয় বিশাল সংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না, তাই উন্নয়ন যে প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক পেশার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে তাতে লাগাম টানতেই হবে।

Solanki Paul
Solanki Paulhttps://uttarbangasambad.com/
Solanki Paul is working as Sub Editor based in Darjeeling district of West bengal since 2020. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad. She is involved in Copy Editing, Uploading in website and various social media platforms.
RELATED ARTICLES
- Advertisment -
- Advertisment -spot_img

LATEST POSTS

Sohini-Shovan-Wedding

Sohini-Shovan Wedding | সোহিনীর সঙ্গে সাত পাকে বাঁধা পড়লেন শোভন

0
উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: পরিবার-বন্ধুদের সাক্ষী রেখেই সাত পাকে বাঁধা পড়লেন সোহিনী সরকার ও শোভন গঙ্গোপাধ্যায় (Sohini-Shovan Wedding)। বাওয়ালি ফার্মহাউসে সেজে ওঠে বিয়ের আসর।...

কবিতা

0
১ ভদ্রলোক পিনাকেশ সরকার যেহেতু তুমিও ভদ্রলোক      তোমার কি এইসব তীব্র শোক  বিরহ নামক              ক্ষুব্ধ অন্তরীপে কিংবা দূর মেঘের সমীপে        চুপচাপ বসে থাকা সাজে? কাজে...

Vegetables Price | বেশি দামে সবজি বিক্রি বন্ধে কড়া নির্দেশ টাস্ক ফোর্সের

0
বালুরঘাট: বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জেলায় জেলায় বেড়েই চলেছে শাকসবজির দাম (Vegetables Price)। সবজির দামে লাগাম পরাতে টাস্ক ফোর্সকে (Task Force) নিয়মিত অভিযানের নির্দেশ...

King Cobra | মিষ্টির দোকান থেকে ৩০টি গোখরো উদ্ধার

0
কিশনগঞ্জ: মিষ্টির দোকান থেকে ৩০টি গোখরো উদ্ধার। সোমবার বিকেলে কিশনগঞ্জ জেলার বাঁশবাড়ি হাটের মহম্মদ কায়সারের মিষ্টির দোকানের ঘটনা। এদিন বিকেলে মিষ্টির দোকানের এক কোনায়...
marriage

Child Marriage | নাবালিকা বিয়ে বন্ধে হানা, উধাও যুগল

0
দিলীপকুমার তালুকদার, বুনিয়াদপুর: বিয়ে করার উদ্দেশ্যে এক নাবালিকাকে (Child Marriage) পালিয়ে নিয়ে এনে বংশীহারীর আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছিল এক তরুণ। কিন্তু পুলিশের আসার খবর পেয়েই...

Most Popular