১৯৪৬ সালের নির্বাচনে অবিভক্ত বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি উত্তরবঙ্গের তিনটি আসন ছাড়া আর কোথাও জিততে পারেনি।
নবেন্দু গুহ
১৯৪৬ সাল। ভারতবর্ষ তখনও ব্রিটিশদের অধীনে থাকলেও স্বাধীনতার দাবিতে দেশজুড়ে প্রবল আন্দোলন আছড়ে পড়ছিল। ইতিমধ্যেই এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, দেশকে দু’টুকরো করে পাকিস্তানের জন্ম দিয়ে সাহেবরা নিজেদের দেশে ফিরে যাবেন। এই অস্থির আবহে অবিভক্ত ভারতের প্রদেশগুলিতে আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশে একদিকে যেমন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ঢেউ, অন্যদিকে তেমনই মাথাচাড়া দিচ্ছিল সাম্প্রদায়িক মানসিকতা। ভারতীয়দের হিংসাত্মক আন্দোলনের পথ থেকে সরিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে চালিত করার উদ্দেশ্যেই ব্রিটিশরা ১৯৩৪ সালে রাজনৈতিক দলগুলিকে ক্ষমতা আস্বাদনের সুযোগ দেয়। বাংলার রাজনীতিতে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ প্রধান শক্তি হলেও, হিন্দু মহাসভার মতো সংগঠনগুলি মুসলিম লিগের সমকক্ষ হতে পারেনি। অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসের নেতৃত্বে ছিলেন মূলত হিন্দু নেতারাই।
বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে ১৯২০ সালে তাসখন্দে ও ১৯২৫ সালে কানপুরে গঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিআই। সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাসী বাংলার অনুশীলন বা যুগান্তরের মতো দলগুলি মনে করত, শান্তিপূর্ণ পথে ব্রিটিশ তাড়ানো অসম্ভব। ১৯৩৪ সালে নিষিদ্ধ হওয়ায় সিপিআই ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ওই নির্বাচনে কংগ্রেস সর্বাধিক ৫৪টি আসন পেলেও একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে সরকার গড়েছিল কৃষক প্রজা পার্টি (৩৬) এবং মুসলিম লিগ (৪০)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সমর্থন করে একে ‘জনযুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে ব্রিটেনকে সমর্থন করে এবং ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনেরও বিরোধিতা করে। প্রতিদানস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশজুড়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধে। নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের সশস্ত্র লড়াইয়ে ইংরেজ শাসকরা কার্যত বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। একইসঙ্গে দেশভাগের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বাংলা ও পঞ্জাবজুড়ে বীভৎস সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই রাজনৈতিক আবহে ১৯৪৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টি প্রথমবারের মতো আইনসভা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। সিপিআইয়ের সাফল্য নিয়ে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন, কিন্তু উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে তারা সবার অলক্ষ্যে সাংগঠনিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছিল। ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাঠ চুকিয়ে বামপন্থী গন্ধ গায়ে মেখে দেশে ফেরেন জ্যোতি বসু। দেশে ফিরে মামলা লড়তে তিনি একদিনও আদালতে যাননি।
দলের নির্দেশে জ্যোতি বসু উত্তরবঙ্গের দোমোহনিতে গিয়ে রেলকর্মীদের মধ্যে সংগঠন বিস্তারের দায়িত্ব নেন। সেখানে বাম সংগঠন জোরদার করে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে রেলকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট আসনে সিপিআই প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে তিনি কংগ্রেস প্রার্থী হরিপদ ভারতীকে পরাজিত করেন। অন্যদিকে, ১৯৪৩ সালে সুশীল চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দার্জিলিং পাহাড়ে দলের বিস্তার শুরু হয়। পাহাড়ে চা বাগান শ্রমিকদের আসনে দলের প্রার্থী হন ‘মায়লা বাজে’ নামে পরিচিত রতনলাল ব্রাহ্মণ। রবিনহুড চরিত্রের এই নেতা সাধারণ মানুষের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। অত্যাচারী ব্রিটিশ সাহেবদের তিনি প্রায়শই পালটা আঘাত করতেন। নির্বাচনে দাঁড়িয়ে তিনি কংগ্রেসের গাগা ডুবকাকে হারান। ওই নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।
কৃষকদের জন্য বরাদ্দ তৃতীয় আসনটিতে সিপিআই প্রার্থী ছিলেন কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা তেভাগা আন্দোলনের নেতা রূপনারায়ণ রায়। দিনাজপুর থেকে তিনি এই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। দেশভাগের পর তিনি প্রথমে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি, তারপর ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টি এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে অবিভক্ত বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি উত্তরবঙ্গের এই তিনটি আসন ছাড়া আর কোথাও জিততে পারেনি। মূলত ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের বিরোধিতা করার ফলে তাদের জনসমর্থন ব্যাপক হ্রাস পেয়েছিল, যার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছিল নির্বাচনি ফলাফলে। তা সত্ত্বেও উত্তরবঙ্গ থেকে প্রাপ্ত এই তিন আসনেই সেবারের মতো কমিউনিস্ট পার্টির মুখরক্ষা হয়েছিল। সেবারে কংগ্রেস ৮৬টি এবং মুসলিম লিগ ১১৪টি আসন পেয়েছিল।
(লেখক সাংবাদিক)



