দেবদর্শন চন্দ, কোচবিহার: জন্মদিন হোক কিংবা বিয়েবাড়ি। যে কোনও অনুষ্ঠানে কিংবা পুজো এলেই সামাজিক কর্মসূচি হিসেবে পাড়ায় পাড়ায় রক্তদান শিবিরের কথা শোনা যায়। কিন্তু সত্তরের দশকে কোচবিহারে এমন আয়োজন সেভাবে হত না। সেসময় অবশ্য সাইকেল নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় রক্তদানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন কোচবিহারের (Cooch Behar) অরূপ গুহ। তাঁর একটাই মন্ত্র, ‘স্বেচ্ছায় রক্ত দিন, সুস্থ থাকুন চিরদিন।’ তিনি কোচবিহারের ন্যাসগ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তথা পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব। শতাধিকবার রক্তদান করেছেন অরূপ। শুধু নিজের জেলাতেই নয়, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এমনকি বর্ধমানেও তিনি রক্তদান করতে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
রক্তদানের এই পথ চলাটা শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। প্রথমবার কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে ট্রেনে পৌঁছে গিয়েছিলেন বর্ধমানে। কিন্তু কেন এই আগ্রহ? তাঁর উত্তর, ‘সেসময় কোচবিহারে ব্লাডব্যাংক না থাকায় হাসপাতাল চত্বরে প্রচুর দালাল থাকত। তাদের উপদ্রবে রক্ত পাওয়া দুষ্কর হয়ে যেত। কারণ অনেকেরই অর্থ ব্যয় করে রক্ত কেনার সামর্থ্য থাকে না। বিষয়টি কলেজে পড়াকালীনই বুঝে গিয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালে ব্লাড ব্যাংক তৈরি হয় কোচবিহারে। সেই থেকেই রক্তদানের পাশাপাশি সকলকে উৎসাহিত করতাম রক্ত দিতে।’ যখনই ডাক পেতেন, ছুটে যেতেন রক্তদানে। এখন অবশ্য বয়সের কারণে সেভাবে রক্ত দিতে না পারলেও, সকলকে উৎসাহ দেন তিনি।


৬৫ বছর বয়সেও সুযোগ পেলে ট্রেকিংয়ে চলে যান। মাঝেমধ্যেই সাইকেলে চেপে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় তাঁকে। ১৬২ বার রক্তদান করেছেন তিনি। ২০০৩ সালের এভারেস্ট দিবসের দিন ছিল তাঁর ১০০তম রক্তদান। পেশায় অবসরপ্রাপ্ত পুরকর্মী হলেও তাঁর মন পড়ে থাকে নদীতে, সামাজিক নানা কাজে। এখন রক্ত দিতে না পারলেও কারও প্রয়োজনে ডোনার জোগাড় করে দিতে এগিয়ে যান। ২০২৪ সালে কলকাতায় রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
অরূপের এই কৃতিত্বের সাক্ষী কোচবিহারের আপামর জনগণ। আজও জেলার হয়ে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে চলেছেন তিনি। ২০২৩ সালের ১৪ জুন শেষবার বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে এক প্রবীণকে রক্ত দিয়েছেন কোচবিহারের এই রক্তযোদ্ধা। অধ্যাপক সাগ্নিক চক্রবর্তী বলেন, ‘তিনি দীর্ঘদিন ধরেই এধরনের সামাজিক কাজে যুক্ত। আজও তিনি রক্তদানে তরুণ সমাজকে উৎসাহিত করে চলেছেন।’

