উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: রান্নাঘরের এক কোণে নীল শিখায় জ্বলতে থাকা এলপিজি (LPG) সিলিন্ডার আমাদের কাছে আজ অতি সাধারণ এক বস্তু। কিন্তু এই সিলিন্ডারের জন্মের পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত রহস্য এবং এক নাছোড়বান্দা রসায়নবিদের গল্প। বিশ শতকের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক গাড়িচালকের পেট্রোল ট্যাঙ্ক থেকে রহস্যময়ভাবে জ্বালানি উধাও হওয়ার ঘটনা থেকেই শুরু হয়েছিল আজকের এই এলপিজি বিপ্লব (Discovery of LPG )।
ঘটনাটি ছিল খুবই সাধারণ—এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন যে তাঁর গাড়ির ট্যাঙ্কে পেট্রোল ভরার পর তা কোনো লিক ছাড়াই দ্রুত কমে যাচ্ছে। এই ধাঁধাটি সমাধানের ভার পড়ে তরুণ রসায়নবিদ ওয়াল্টার ও স্নেলিংয়ের (Walter O Snelling) ওপর। যেখানে অন্যরা এটিকে সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটি ভেবে এড়িয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে স্নেলিং শুরু করেন গভীরে অনুসন্ধান।
তিনি পরীক্ষা করে দেখলেন, পেট্রোল কেবল তরল নয়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে কিছু উদ্বায়ী গ্যাস। তিনি লক্ষ্য করলেন, এই গ্যাসগুলো খুব সহজেই বাতাসে মিশে উধাও হয়ে যাচ্ছে। নিজের ছোট ল্যাবরেটরিতে গবেষণার মাধ্যমে তিনি আবিষ্কার করেন প্রোপেন ও বিউটেন নামের দুটি অত্যন্ত দাহ্য গ্যাস। সেই সময় রিফাইনারিগুলো এই গ্যাসগুলোকে অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য হিসেবে গণ্য করত।
স্নেলিং দেখলেন, এই গ্যাসগুলোকে উচ্চ চাপে সংকুচিত করলে তা তরলে পরিণত হয় এবং শক্তিশালী ধাতব পাত্রে সংরক্ষণ করা যায়। পাত্রের মুখ খুললেই তা পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে পরিষ্কারভাবে জ্বলতে থাকে। জন্ম নেয় লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি। ফিলিপস পেট্রোলিয়াম কোম্পানির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পরবর্তীতে এই উদ্ভাবনটিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়।
শুরুতে এই গ্যাস শিল্পক্ষেত্রে এবং গ্রাম্য এলাকায় ব্যবহৃত হলেও, ধীরে ধীরে তা জায়গা করে নেয় রান্নাঘরে। কয়লা বা কাঠের ধোঁয়াময় উনুন থেকে মুক্তি পেতে এলপিজি হয়ে ওঠে এক আদর্শ সমাধান। ১৮৮০ সালে ওয়াশিংটনে জন্মানো এই নিভৃতচারী বিজ্ঞানী ১৯৬৫ সালে মারা যান। আজ কোটি কোটি মানুষের রান্নাঘরে তাঁর এই আবিষ্কার ব্যবহৃত হলেও, কজনই বা মনে রেখেছেন সেই ব্যক্তির নাম, যিনি কেবল একটি ‘উধাও হওয়া পেট্রোলের’ রহস্য তাড়া করে বদলে দিয়েছিলেন পৃথিবীর জ্বালানি চিত্র।

