TMC | ভাইপোরাজেই খতম তৃণমূল

শেষ আপডেট:

শুভঙ্কর চক্রবর্তী

‘ভাইপো’ বা ‘এবি’- এই দুটি শব্দ গত এক দশকে বাংলার আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে৷ তৃণমূলের (TMC) অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তো বটেই, বিরোধী রাজনৈতিক দল, রাজ্য প্রশাসন, পুলিশ সর্বত্র কার্যত ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন ভাইপো অর্থাৎ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)।গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি এমন হয়ে উঠেছিল যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন, অভিষেকই যেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, তিনিই যেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। ‘এবি অফিসের নির্দেশ’- এই একটি বাক্যে ২০১৬-র পর থেকে রাজ্যজুড়ে নিয়ম ভেঙে কী কী কাণ্ড হয়েছে তার অনেককিছুই এখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। কালীঘাটের বদলে ঘাসফুলের নার্সারি যবে থেকে ক্যামাক স্ট্রিটে স্থানান্তরিত হয়েছে তবে থেকেই তৃণমূলের শেষের শুরু। বাংলায় ভাইপোরাজ-ই তৃণমূলের পতনের অন্যতম কারণ।

রাজপথের ধুলোবালি মেখে মমতার রাজনৈতিক লড়াইয়ে তিল তিল করে গড়ে তোলা এক মহীরুহ’র নাম তৃণমূল কংগ্রেস। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম থেকে রাইটার্স- মাটি কামড়ে পড়ে থাকার যে জেদ মমতা দেখিয়েছিলেন, যে রাজনৈতিক আবেগ তৈরি করেছিলেন, অসীম ক্ষমতার লালসা, সীমাহীন ঔদ্ধত্য, লাগামহীন দুর্নীতি, জেলায় জেলায় তোলাবাজি সিন্ডিকেট তৈরি করে সেই আবেগ ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন অভিষেক। ২০১৬-র জয়ের পর মা-মাটি-মানুষ’এর ট্যাগলাইন মুছে সাধারণ মানুষের থেকে তৃণমূলকে শত যোজন দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন ভাইপো। যাবতীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে আইপ্যাককে নামিয়ে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ধাঁচে দল পরিচালনা শুরু করেছিলেন তিনি। তাই বঙ্গ রাজনীতিতে তৃণমূলের পতনকে শুধু রাজনৈতিক পালাবদল বলা যায় না। এই পরিবর্তনকে তৃণমূল নেতাদের আকাশছোঁয়া দম্ভ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং ভাইপোরাজ-এর তোলাবাজ সিন্ডিকেট থেকে নিষ্কৃতি বললে ভুল হবে না।

আইপ্যাক যখন থেকে তৃণমূলকে নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছে, তখন থেকেই গণ্ডগোলের শুরু। ঝাঁ চকচকে প্রচার, ছবি, ড্রোন, ক্যামেরার আড়ালে চাপা পড়েছে লক্ষ সমর্থকের অনুভূতি। রাজনীতির আঙিনায় কর্পোরেট ছোঁয়া নতুন কিছু নয়, কিন্তু যখন রণকৌশল নির্ধারণের ভার গ্রামের পাড়া বা শহরের গলির পালস বোঝা নেতার হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয় তখন বিপদ অনিবার্য। আইপ্যাকের নানা চটকদার উপায় আপাতভাবে সফল হলেও, সেগুলো ছিল স্থানীয় নেতৃত্বের গুরুত্বকে খর্ব করার এক পরিকল্পিত নীল নকশা। পাড়ার নেতার গুরুত্ব কমে যাওয়ায় তাঁরা ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। দলের ভেতর বাড়তে থাকে ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ কিছুটা আন্দাজ করতে পারলেও ভাইপো স্নেহে অন্ধ মমতা কার্যত হাত গুটিয়েই ছিলেন। যার ফলে ভরসা হারিয়ে ফেলেছিলেন অনেক পুরোনো তৃণমূল নেতা।

অভিষেক দলের নেতাদের ইভেন্ট ম্যানেজার বানিয়ে ফেলেছিলেন। মাঠের কর্মীরা বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁদের ঘাম ঝরানো তথ্যের চেয়ে আইপ্যাক কর্মীদের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বানানো সার্ভে রিপোর্ট ওপরতলার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। মমতা যে দরদ দিয়ে দলকে আগলে রেখেছিলেন, সেখানে ঢুকে পড়েছিল এক রুগ্ন যান্ত্রিকতা। রাজনীতির ব্যাকরণ বদলে দিয়ে অভিষেক প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, নির্বাচন জেতা মানে কেবলই ডেটা অ্যানালিসিস, জনগণের আবেগ বা স্পন্দন নয়। এই ধারণাটিই তৃণমূলের আদি ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। নির্বাচনে হারলে দায় নেতার, আর জিতলে কৃতিত্ব আইপ্যাকের- এই অসম দায়বণ্টন তৃণমূলের দলীয় শৃঙ্খলাকে ভেঙে দিয়েছে। মাঠের নেতা দায় নিচ্ছেন, কিন্তু সিদ্ধান্তে তাঁর ভূমিকা থাকছে না- এরফলে বিদ্রোহের ফল্গুধারা বইতে শুরু করেছিল।

যে সমস্ত পুরোনো, বর্ষীয়ান নেতা একসময় নিজেদের রক্ত দিয়ে দলের ভিত মজবুত করেছিলেন, যাঁদের ঘামে এই দলের জন্ম, তাঁদের অত্যন্ত সুকৌশলে এবং অপমানজনকভাবে সাইডলাইন করা শুরু করেন অভিষেক। পুরোনোদের সরিয়ে জেলায় জেলায় দলের সামনের সারিতে বসানো হয় একদল স্তাবক এবং সুবিধাবাদীকে, যাঁদের একমাত্র যোগ্যতা ছিল ভাইপোর প্রতি অন্ধ আনুগত্য। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এই নগ্ন খেলায় হেরে অভিমানে তৃণমূল ছেড়েছেন বা রাগে বিশ্বাসঘাতকতার রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন বহু নেতা, কর্মী। তা বুঝতেই পারেননি মমতা।

এর পাশাপাশি জেলায় জেলায় ডালপালা মেলেছিল এক ভয়ংকর সিন্ডিকেটরাজ। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র যখন একজন ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত, তখন জেলা স্তরের নেতাদেরও সেই ‘হাইকমান্ড’-এর অঙ্গুলিহেলনে চলতে বাধ্য করা হল। দল হারের পর রবীন্দ্রনাথ ঘোষের মতো পুরোনো তৃণমূল নেতারা ঘুরিয়ে একথা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, অভিষেকের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ মদতে গোটা রাজ্যজুড়ে গড়ে উঠেছে এক বিশাল তোলাবাজির নেটওয়ার্ক। বালি, কয়লা, সোনা থেকে গোরু পাচার বা নিয়োগ দুর্নীতি- প্রতিটি ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের রমরমা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়। দলের নাম ভাঙিয়ে এই সিন্ডিকেটগুলো কার্যত এক একটি সমান্তরাল প্রশাসন চালাতে শুরু করেছিল। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া বা দল এবং জনপ্রতিনিধি হিসাবে পদ পাওয়ার জন্যও যে লক্ষ লক্ষ টাকা দিতে হত তা খুল্লামখুল্লা স্বীকার করছেন অনেক তৃণমূল নেতাই। রাজ্য তৃণমূলের একাধিক নেতার বক্তব্য, এসবই চলত এবি অফিসের অঙ্গুলিহেলনে। পুলিশ, প্রশাসনও এবি অফিসের কথায় ওঠবস শুরু করেছিল। সবমিলিয়ে দল এবং সরকার উভয়ই অলিখিতভাবে চালাচ্ছিলেন অভিষেক।

কর্পোরেট মস্তিষ্ক দিয়ে বাংলার আবেগ মাপার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন অভিষেক। আইপ্যাকের ফর্মুলায় মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানো যে সম্ভব নয়, সেই চরম সত্যটি অহংকারে অন্ধ ভাইপো বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি নিজের যে একচ্ছত্র সাম্রাজ্য তৈরি করেছিলেন, তা ছিল আদতে একটি তাসের ঘর। মানুষ সব দেখছিল এবং নীরবে সহ্য করছিল। ২০২১-এর পর তৃণমূল হয়ে উঠেছিল কেবল ভাইপো এবং তাঁর পেয়াদাদের স্বার্থসিদ্ধির এক অন্ধকূপ। আর তাই, ব্যালট বাক্সে বাংলার মানুষ সেই সীমাহীন ঔদ্ধত্য, আইপ্যাকের কর্পোরেট অহংকার এবং সিন্ডিকেট দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজেদের রায় স্পষ্ট করে দিলেন। ভাইপোরাজের এই পতন কেবল একজন ব্যক্তির ক্ষমতাচ্যুতি নয়, এ হল মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এক আত্মঘাতী রাজনীতির চরম পরিণতি।

Shahini Bhadra
Shahini Bhadrahttps://uttarbangasambad.com/
Shahini Bhadra is working as Trainee Sub Editor. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Online. Shahini is involved in Copy Editing, Uploading in website.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

Abhishek Banerjee | ভোটের প্রচারের ‘উস্কানি’ ও অমিত শা-কে ‘হুমকি’-র অভিযোগ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দায়ের FIR!

উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: ২০২৬ সালের হাইভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচনের...

Swapna Barman | ‘বাড়ি জ্বালিয়ে দিল’! স্বপ্না বর্মনের ফেসবুক পোস্ট ঘিরে শোরগোল

উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি...

Suvendu Adhikari | স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় ‘সার্জারি’! দালালি ও রেফার-রাজ রুখতে কড়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু

উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: রাজ্যের সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার খোল...

Cooch Behar | শুভেন্দুর কনভয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় ‘অ্যাকশন’! কোচবিহারে গ্রেপ্তার ব্লক সভাপতি সহ ৩ তৃণমূল নেতা

শিবশংকর সূত্রধর,কোচবিহার: গত বছর খাগড়াবাড়িতে শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari)...