জসিমুদ্দিন আহম্মদ, মালদা: প্রবাদপ্রতিম দাদা প্রবল জনপ্রিয় ছিলেন। ভাই–ও যে সবার খুবই কাছের ছিলেন তা আরও একবার স্পষ্ট হল।
তখন বেলা আড়াইটা। গঙ্গা পেরিয়ে আবু হাসেম খান চৌধুরীর (Abu Hasem Khan Choudhury) মরদেহ মালদার (Malda) মাটিতে ঢুকতেই কান্নার রোল উঠল। ১৬ মাইল মোড়ে রাস্তার দু’ধারে থিকথিকে ভিড়। চারিদিক থেকে মুহুর্মুহু স্লেগান, ‘ডালুদা অমর রহে!’ তাঁকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে সবার মধ্যে হুড়োহুড়ি। সুলতানগঞ্জ কলেজ মোড়, কালিয়াচক চৌরঙ্গি হয়ে কোতুয়ালির গড় সুজাগড়, সর্বত্রই একই দৃশ্য। অন্তিমযাত্রার কনভয় জেলা কংগ্রেস কার্যালয় হায়াত ভবন পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় নেয়। শুধু কংগ্রেস নেতা–কর্মী বা সমর্থকরাই নন, আবু হাসেমকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে বিরোধী দলের অনেককেও এদিন হায়াত ভবন ও কোতুয়ালিতে গনি পরিবারের বাড়িতে দেখা গিয়েছে।


আবু হাসেম খান দাদা এবিএ গনি খান চৌধুরীর আদর্শেই চলতেন। পরিবারের ছোট ছেলে আবু হাসেম ওরফে ‘ডালু’ গনি খানের হাত ধরেই রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন কালিয়াচক বিধানসভা কেন্দ্র থেকে লড়াই করে প্রথম বিধায়ক নির্বাচিত হন। তবে ২০০১ সালে সিপিএম প্রার্থী বিশ্বনাথ ঘোষের কাছে হেরে যান। ২০০৬ সালে গনি খানের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে মালদা লোকসভা কেন্দ্রে বাম নেতা শৈলেন সরকারকে হারিয়ে প্রথম সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি টানা সাংসদ ছিলেন। ইউপিএ–২ সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হন। তবে বার্ধক্যজনিত কারণে ২০২৪ সালে তিনি ছেলে ইশা খান চৌধুরীকে লোকসভায় দাঁড় করান। বছর দুয়েক ধরে আবু হাসেম বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। দুই মাস যাবৎ কলকাতার একটি নার্সিংহোমে ভর্তি ছিলেন। বুধবার রাত ৯.৫০ মিনিটে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আবু হাসেমকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে জেলা কংগ্রেস কার্যালয়কে সকাল থেকে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ ডালুবাবুর মরদেহ হায়াত ভবনে প্রবেশ করতেই হুলুস্থুল পড়ে যায়। বিএস রোড এলাকায় যানবাহন চলাচল স্তব্ধ হয়ে পড়ে। ডালুবাবুকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে জেলা তৃণমূল মুখপাত্র শুভময় বসু, স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলার উদয় চৌধুরী, জেলা বামফ্রন্টের আহ্বায়ক কৌশিক মিশ্র সহ অন্যান্য বাম নেতৃত্ব সেখানে উপস্থিত হন। এখানে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন পর্ব মিটতেই ডালুবাবুকে নিয়ে কোতুয়ালির বাড়ির দিকে সবাই রওনা হন। গনি খানের কবরের পাশেই ডালুবাবুর শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিল। ডালুবাবুকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে কোতুয়ালির বাড়ির বাইরে মঞ্চ গড়া হয়েছিল। সেখানে আগে থেকেই মালদা জেলা কংগ্রেসের নেতাদের পাশাপাশি রাজ্যের মন্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন, পুরাতন মালদা পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান সফিকুল ইসলাম, জেলা তৃণমূল সভাপতি আব্দুর রহিম বক্সী, পুরাতন মালদা ব্লক তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি সুদীপ্ত রায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
ডালুবাবুকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে সাবিনা কান্নায় ভেঙে পড়েন, ‘আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক ভেদাভেদ থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। আমি কোতুয়ালি পরিবারেরই একজন। ডালুবাবুর সঙ্গে যখনই দেখা হয়েছে উনি আমার ছেলেমেয়েদের খোঁজ নিতেন। আমি একজন প্রকৃত অভিভাবক হারালাম।’ ডালুবাবুকে শ্রদ্ধা জানাতে ইংরেজবাজারের তৃণমূল প্রার্থী আশিস কুণ্ডু এদিন সকালে মাঝপথে নিজের প্রচার কর্মসূচি বন্ধ করে দেন। পরে কোতুয়ালির বাড়িতে যান। ইংরেজবাজারের বাম প্রার্থী অম্বর মিত্রও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অম্বরের কথায়, ‘ডালুবাবু অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক ছিল।’
প্রিয় দাদার কবরের পাশে এদিন ভাইকে যখন সমাধিস্থ করা হচ্ছিল তখন অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। তাতে সমস্ত রাজনৈতিক ভেদাভেদ ধুয়েমুছে একাকার।

