- বিপুল দাস
বেশ ভালো একটা পারফিউম মেখেছে দীপা। হালকা একটা অচেনা ফুলের গন্ধ আসছে ওর শরীর
থেকে। ওকে একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল। এই প্রথম আমার কোনও মেয়েকে ভালো লাগছে। কিন্তু দীপার অস্তিত্বের চারপাশে কিছু একটা আছে, বিখ্যাত দাঁতের মাজনের সুরক্ষা বলয়ের মতো, মনে হয়
ছুঁয়ে দিলে সোনার প্রতিমা মুহূর্তেই সিসার হয়ে যাবে। আনমনেই নিজের হাতের দিকে তাকালাম। মনে হল বড় নোংরা এই হাত।
আমার হাঁটুর ওপর হাত রাখল দীপা। মনে হল লক্ষ ভোল্টের বিদ্যুৎপ্রবাহ নেমে এল আমার
শরীরজুড়ে। পরিপূর্ণভাবে ওর আয়ত দুটো চোখের দিকে তাকালাম। দীপার ঠোঁটের কোণ ভেঙে গড়িয়ে নামছে প্রায় অদৃশ্য হাসির রেখা। রহস্যময় ওই রেখা আমাকে জাটিঙ্গার পাখির মতো ডাক দিল আগুনের দিকে। আমি ওকে আমার দিকে সামান্য টেনে নিলাম। দীপা চোখ বন্ধ করল। আমি চুমু এঁকে দিলাম ওর চোখের পাতায়। ভেতর ঘর থেকে আনন্দর নাক ডাকার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আমার শরীরজুড়ে তুমুল একটা স্রোত ভয়ংকর ঘূর্ণি নিয়ে উঠে আসছে। পুরুষ বড় অসহায় এই নাচার শরীরের কাছে। আনন্দ, বেশি বড় বড় কথা বলিস না। সতীসাবিত্রী নয় তোর আদরের বৌ। আমি এখন ইচ্ছে করলে ওকে আমার বুকে নিয়ে পিষে ফেলতে পারি, আদর করতে পারি, শরীর ছুঁতে পারি ইচ্ছেমতো। আমার চোখের দিকে
তাকিয়ে দীপা বোধহয় কিছু টের পেল। আমার গরম নিঃশ্বাস ওর গায়ে লাগছিল বোধহয়। আমার ইচ্ছেগুলো হয়তো চোখের ভাষায় ফুটে উঠেছে। হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
“ বসুন, আমি খাবারটা রেডি করি। রাত হয়ে যাচ্ছে”।
“ আনন্দকে ডাকো, আমাকে খুব অল্প ভাত দিও। খেতে পারব না”।
কী যেন বলতে গিয়েও সামলে নিল দীপা। একটু হেসে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। দীপার সঙ্গে একটা মৃদু ফুলের গন্ধ রান্নাঘরের দিকে চলে গেল, রান্নাঘরের দরজা খুললে মাংসের গন্ধ এল। নিশ্চয়
মাঝরাস্তায় দু’রকমের গন্ধ দুটো স্রোত হয়ে জড়াজড়ি করে শঙ্খ লেগেছে। সাপের মতো।
আট
ছোটভাইয়ের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়েছিল তপন সামন্ত। পথের মাঝেই তার সঙ্গে মঞ্জুলার দেখা হয়েছিল। মিথ্যে বলে তপনকে হাঁকিয়ে দিয়েছিল মঞ্জুলা। বাড়িতে ফিরে তপন ভেবেছিল কিছু
বানিয়ে বলবে। কিন্তু সে উপায় রইল না। সে ফিরে আসার একটু আগেই সন্ধে নাগাদ ও বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল- ছেলের দাদার আসার কথা ছিল, এল না কেন। কোনও বিপদ আপদ হয়নি তো। বাড়ির সবাই
শুনে চিন্তায় পড়েছিল। বাধ্য হয়ে তপনকে মিথ্যে বলতে হয়েছিল। টোটো থেকে বলরামপুরে নামার পর
তার শরীর হঠাৎ কেমন খারাপ লাগছিল। তখনই ফিরে এসেছে।
রাতে তপনের ঘুম ভালো হল না। আজ সারাদিন যা ঘটেছে, বারেবারে সেগুলোই তার চিন্তায় ঘুরেফিরে আসছিল। এভাবে মিথ্যে বলে একটা মেয়ে তপন সামন্তকে ফিরিয়ে দেবে- কিছুতেই সে মেনে
নিতে পারছিল না। আচ্ছা, সে তো বুঝতেই পেরেছিল মিথ্যে বলছে মঞ্জুলা নামের মেয়েটা। সে যদি ওদের বাড়ি যাবার জন্য জোর করত, কী করত মঞ্জুলা। অবশ্য মেয়েটা মিথ্যে কিছু বলেনি। যে জন্য গেছে
বলরামপুরে, মেয়ে দেখা– সেও তো হলই। দেখা হল, কথাবার্তাও হল। তবে আর বাড়ি গিয়ে শুধু শুধু মিষ্টি খাওয়ার কী দরকার। ওদের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে কথা বাড়ির অন্য লোকও করতে পারবে ফোনে।
তার তো শুধু চোখে দেখে মতামত জানানোর কথা। কিন্তু মুশকিল হয়ে গেল এখন সে আর বলতে পারবে
না– মেয়ে দেখেছি। আমার পছন্দ হয়েছে।
সারারাত প্রায় জেগেই কাটাল তপন। ভোরের পাখির ডাক শোনার পর কখন যেন চোখ বুজে এসেছিল। ঘুম ভাঙল যখন, বেলা দশটা। কে যেন এসে মাথার দিকের জানলা খুলে দিয়ে গেছে। একফালি
রোদ তার বিছানার ওপর এসে পড়েছে। ভোরের দিকে হালকা ঠান্ডার জন্য পায়ের কাছে একটা চাদর থাকে। কাল রাতে সেটা টেনে গায়ে দিতেও ইচ্ছে করেনি। শীত টের পাচ্ছিল না। এবার উঠতে হবে। নানা
রকম সাংসারিক কাজকর্মের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বেশি শরীর খারাপ না হলে এত বেলা পর্যন্ত সে শুয়ে থাকেনি কোনও দিন।
বালিশ থেকে মাথাটা ওপরে তুলতেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দুলে উঠল। সেই কবে সিগারেটের ভেতরে গাঁজা ভরে তাকে খাইয়েছিল শশাঙ্ক, সিগারেট শেষ করার পর দুম করে মাটিতে শুয়ে পড়েছিল। মাথার
ওপর আকাশ ঘুরে যাচ্ছে। সে নাগরদোলায় চড়ে একবার আকাশে উঠে যাচ্ছে, আবার সাঁই করে পাতালে নেমে যাচ্ছে। আর কী অস্বস্তি। মনে হচ্ছে বমি হলে বুঝি এই কষ্টটা কমে যাবে। তার মনে হচ্ছিল
এখনই সে মরে যাবে বোধহয়। শশাঙ্ককে সে ক্রমাগত বলে যাচ্ছিল তাকে ডাক্তার দেখানোর কথা।
আসলে তার ঠোঁট নড়ে যাচ্ছিল। কোনও শব্দ বেরোচ্ছিল না। মনে হচ্ছে বুঝি বমি হবে, কিন্তু হচ্ছে না।
প্রাইমারি স্কুলের মাঠের নারকেল গাছ, লিচু গাছ আর তপন– সবসুদ্ধ ভীষণ দোল খাচ্ছে। পরে প্রতিজ্ঞা করেছিল জীবনেও আর এই নেশা করবে না।
বালিশ থেকে মাথা তুলতে গিয়ে ঠিক সেই রকম মনে হল তপনের। ধপ করে মাথাটা আবার বালিশে পড়ল। হাতটা কোনও মতে কপালে ছুঁইয়ে দেখল বেশ গরম। জ্বর এসেছে তার, প্রচণ্ড জ্বর।
কাল টোটোয় ঠান্ডা বাতাস লেগেছে তার। একটা হালকা গরম কিছু পরা উচিত ছিল। তার তো একটু বাতাস লাগলেই ঠান্ডা লাগার ধাত। গলাব্যথা হবে, তারপর হাই টেম্পারেচার। তারপর অবধারিতভাবে
অ্যান্টিবায়োটিক। শীত পড়ার মুখে, আর শীত চলে যাওয়ার সময় মানুষ একটু অসাবধান থাকে। তখনই বেশি করে ঠান্ডা লেগে যায়। ভরা শীতে কাঁথাকম্বলে, চাদরেসোয়েটারে শীতকে বাঁধন দেওয়া থাকে।
“ দাদা, উঠেছিস? চা দেব এখন? এ কী রে, তোর চোখ তো জবাফুলের মতো লাল হয়ে রয়েছে। নিশ্চয় জ্বর বাধিয়েছিস আবার। দেখি তোর কপাল। কাল সোয়েটার ছাড়া বেরোতে মা বারণ করেছিল। চোরা ঠান্ডায় জ্বর বাধিয়েছিস। এখন সিজন চেঞ্জের সময়, একটু অসাবধান হলেই ঠান্ডা বসে যায়”।
“চায়ে একটু আদা দিস। কাল মনে হয় ঠান্ডা লেগেছে”।
ঘড়ঘড় করে বলল তপন। থার্মোমিটারের কথা বলতে গিয়েও বলল না। বুঝতেই পারছে জ্বর এখন ভালোই। একশো দুই-তিন দেখলে বাড়িসুদ্ধ সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। এমনিতেই কাল বলরামপুর
থেকে ফিরে মিথ্যে বলেছে হঠাৎ শরীর অসুস্থ হওয়ার কথা।
“সিধু কোথায় রে লিলি? স্কুলে বেরিয়ে গেছে? যা, চা-টা নিয়ে আয়। আমার টেবিলের ওপরে দ্যাখ একটা প্লাস্টিকের বাক্স আছে, দে তো ওটা”।
“ছোড়দার আজ স্কুল ছুটি। বাদলদার সঙ্গে মাছ ধরতে বেরোবে, রেডি হচ্ছে। তুই বেশি কথা বলিস না,
আমি চা এনে দিচ্ছি”।
লিলি বেরিয়ে যেতে তপন ভাবল- শিউলি আর লিলি, তাদের দু’ভাইয়ের পরে পরপর দু’বোন ওরা।
একদম আলাদা হয়েছে দু’বোনের স্বভাব। নিজেরটা ছাড়া শিউলি আর কিছু বোঝে না। নিজের ইচ্ছেয় ভুজঙ্গকে বিয়ে করেছিল। বাসে কলেজে আসা-যাওয়া করতে করতে কনডাক্টর ভুজঙ্গর প্রেমে পড়েছিল। জেদ ধরে বসেছিল। শেষে বলেছিল বাড়ি থেকে বিয়ে না দিলে ওরা পালিয়ে বিয়ে করবে। বিয়ের পর তপন দেখল ভুজঙ্গ প্রায় ঘরজামাই হয়ে গেছে। এ সংসারে দুজন এক্সট্রা লোকের খাওয়া কোনও বড় ব্যাপার নয়। তপনের বিরক্তি বাড়ছিল অন্য জায়গায়। কোনও পণ না নিয়ে এ বাড়ির মেয়েকে সে বিয়ে করেছে, থোক নেয়নি, এখন খুচরো হিসেবে মাঝে মাঝে কিছু কি তার ন্যায্যত প্রাপ্য নয়। নিজের মুখে নয়, শিউলিকে দিয়ে বলাত। শিউলিও বাতাসকে শোনাত “দাদা আমার দু’হাত ভরে রোজগার করে।
বোনজামাইকে কেন দেখবে না। মিনিমাগনায় বোনের বিয়ে হয়ে গেল, সেটাও তো দেখতে হবে”। এটুকু পর্যন্ত তপন মেনে নিয়েছিল। কিন্তু ভুজঙ্গ সম্পর্কে অন্য খবরও তার কানে আসছিল। তারপর
যেদিন তার দামি ঘড়ি বাড়ি থেকেই হারিয়ে গেল, তপনের বুঝতে অসুবিধা হল না শোনা কথা মিথ্যে নয়।
ভুজঙ্গ সত্যিই ভুজঙ্গ, এ বাড়ির দুধকলা চুষে খাবে, আর এখানেই দংশন করবে।
শিউলি ঠারেঠোরে শোনাবে লিলিকে বাড়িসুদ্ধ সবাই যেভাবে প্রশ্রয় দেয়, যেমন পোশাকআশাক পরে– শিউলি ভাবতেও পারে না। লিলি যেসব সাজগোজের জিনিস ব্যবহার করে, শিউলি কোনও দিন
সেসবের নামও শোনেনি। তপন বুঝতে পারে গোপন একটা ঈর্ষা শিউলির ভেতরে সব সময় জ্বলে। অসম্ভব হিংসে করে বোনকে। তপনের শরীর খারাপ হলে শিউলির কৃত্রিম আহাউহু তপন বুঝতে পারে।
অথচ লিলি নিঃশব্দে তার কর্তব্য করে যায়।
চা নিয়ে ঘরে ঢুকল লিলি। তপনের মাথার পাশে টেবিলে রাখল।
“বড়দা, একটা কথা বলব ? আমার মুখে হয়তো মানায় না। কিন্তু তোকে জানিয়ে রাখা দরকার”।
“বল, কী কথা”।
“জামাইবাবু টাকার জন্য দিদির গায়ে হাত তোলে। ক’দিন আগেই এত জোরে হাত মুচড়ে ধরেছে, কাঁধের জয়েন্টে অসম্ভব ব্যথা হয়েছে। আরও একটা কথা, দিদি কিন্তু বাদলদার সঙ্গে খুব এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। আমার বন্ধুরা ওদের একসঙ্গে নৌকোতে দেখেছে”।
অনেকক্ষণ চুপ করে রইল তপন। সাবধানে ঘাড় ঘুরিয়ে জানলার দিকে তাকাল। বিছানার ওপর থেকে আলোর চৌকো ছাপ সরে গিয়ে দেওয়ালে পড়েছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল বেলা এগারোটা।
“বড়দা, চা কিন্তু ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ওষুধটা খেয়ে নে। আর, দিদিকে কিন্তু কিছু বলিস না। ভীষণ খিটখিট করে আমার সঙ্গে। আমার জন্য কেন প্রাইভেট টিউটর রাখা হয়েছে, সেটাও দিদির পছন্দ নয়।
তার সময়ে নাকি সব সস্তার জিনিস কেনা হত। এত হিংসা করে আমাকে। তুই আমার জন্য যে ম্যাক্সিটা এনেছিস, সেটা মিষ্টি কথা বলে নিয়ে নিয়েছে”।
লিলির কথাগুলো সে যেন অনেকদূর থেকে শুনতে পাচ্ছিল। তপন জানে এখনই ঘরে গিয়ে তার শরীর খারাপের কথা লিলি মাকে বলবে। মা ছুটে আসবে। সবচেয়ে বিরক্তির ব্যাপার, শিউলি এখন এখানে রয়েছে। ভাইফোঁটায় এসেছে, কবে যাবে– কে জানে। বাড়ির মেয়েকে তো আর জোর করে বাপের বাড়ি থেকে ঠেলে পাঠানো যায় না। তপনের জ্বর হয়েছে শুনলে এখনই এসে আদিখ্যেতা শুরু করবে। দাদাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, সেটা প্রমাণ করার জন্য হয়তো জোর করেই তার মাথায় জল ঢালতে শুরু করবে।
সাবধানে বিছানায় উঠে বসল তপন। আবার যদি চক্কর দেয়, টাল সামলাতে না পারলে পড়েটড়েও যেতে পারে। তখন আর এক কেলেঙ্কারি হবে। লিলি একগ্লাস জলও রেখেছে ওষুধ খাওয়ার কথা ভেবে।
কাপ নিয়ে এক চুমুক দিয়ে দেখল একদম ঠান্ডা হয়নি। বেশ ভালো লাগল আদা-চায়ের স্বাদ। গলায় আরাম লাগল। জ্বর, গলাব্যথা তিন-চারদিন থাকবে। তারপরও দু’দিন শরীর দুর্বল থাকবে। জ্বর
কমলেই অবশ্য তপন কোর্টে বেরোবে। একদিন না যাওয়া মানে অনেক টাকা লস।
লিলি যে কথাগুলো বলে গেল, সেসব কথা উড়োউড়ো তার কানেও এসেছে। কী দেখে যে শিউলির ওকে পছন্দ হল– কে জানে। ওর বাস-কনডাক্টরি নয়, স্বভাবটাই ভালো নয় ভুজঙ্গর। শুধুমাত্র
সুন্দর চেহারা দেখে শিউলি আর কিছু খোঁজখবর না নিয়ে গাড্ডায় পা দিল। ভুজঙ্গর উঞ্ছবৃত্তির কথা
ভাবলেই ঘেন্না হয় তপনের। তার ওপর হাতটানের স্বভাব। তার নেশাভাঙের খরচ ঘুরিয়ে তপনকেই দিতে হয়। তা সত্ত্বেও ছেলেটা কোন সাহসে শিউলির গায়ে হাত তোলে। কে জানে, কোনওদিন দলবল নিয়ে এ বাড়িতেই না ডাকাতি করে। ঘরদুয়ারের সুলুক তো সব তার জানা-ই হয়ে গেছে। বেশি বাড়াবাড়ির আগে ভুজঙ্গর একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
সন্ধেবেলায় গায়ে চাদর, গলায় মাফলার পেঁচিয়ে খাটে আধশোয়া হয়ে টিভি দেখছিল তপন। লিলি আদা-চা দিয়ে গেছে। মা এসেছিল একবাটি গরম চিঁড়েভাজা নিয়ে। তপন যেমন পছন্দ করে– সামান্য
আদাকুচি, পেঁয়াজকুচি আর বাদাম দিয়ে মাখা। মা একটু ইতস্তত করছিল।
“তপু, সামনের মঙ্গলবারে তোর বাবার ডায়ালিসিস করার তারিখ”।
“মানে পরশুদিন ?”
“হুঁ, প্রত্যেকবার গুচ্ছের টাকা খরচ হয় তোর। ভগবান জানেন আর কতকাল। বুঝতে পারছি না এবার কে নিয়ে যাবে তোর বাবাকে। তোর শরীর ভালো নেই। সিধুর নতুন চাকরি, এখন আর আগের মতো সব কাজের কথা তাকে বলাও যায় না। কী যে করি। কোথা থেকে যে এই কাল-অসুখ তোর বাবার শরীরে এল”।
“এখন আফসোস করে কী আর হবে। শরীরের ওপর বাবা যখন অত্যাচার করেছে, তখন সামলাতে পারোনি? তাও তো এখনও বেঁচে আছে। শরীরে জল হয়ে ফুলে উঠল, চোখেমুখে হলদে আভা। আমি যা ভেবেছি, ডাক্তারবাবুও তাই বলেছে। কিডনির বারোটা বেজে গেছে। দুটোই খুঁতো হয়ে গেছে। এখন ওই ডায়ালিসিসের ওপরেই… এক কাজ করো, তোমার জামাইকে বলো না একবার শ্বশুরমশাইকে নিয়ে ডায়ালিসিস করিয়ে আনতে। সেও তো তোমার আর এক ছেলে। একটু কর্তব্য করুক। আর শোনো, শিউলিকে বলে দিও ওর বর যেন বেশি বাড়াবাড়ি না করে। আমি কিন্তু জামাইফামাই মানব না। ওর ব্যবস্থা করতে কিন্তু আমার একদিন লাগবে। বাকি জীবন ঘানি ঘোরাতে হবে”।
“আমি কী করব, বল। আমার হয়েছে শতেক খোয়ার। তোর বাবা আমার কথা কোনও দিন কানে নেয়নি।
এখন তার লেজের ঝাপট কমেছে। কিছু বলতে পারি না, মুখের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে।
কষ্টও হয়। মেয়ের কথা আর কী বলব। সাধ করে পায়ে কুড়ুল মেরেছে। এখন লেংচে লেংচে হাঁটছে”।
“আর কী হবে। তুমি জান ভুজঙ্গ তোমার মেয়ের গায়ে হাত তোলে। টাকার জন্য চাপ দেয়। শিউলি এসে আমার সামনে ভিখারির মতো হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে। সবার সব খাই মেটানোর জন্য আছে তপন সামন্ত। ভালো কথা, বলরামপুর থেকে আর কোনও যোগাযোগ করেছিল ওরা?”
“না, কাল সন্ধেবেলা একবার খোঁজ নিয়েছিল তুই যাসনি বলে। মেয়েপক্ষের তো একটু বেশি চাড় থাকবেই। ওরা ভেবেছিল তোর মত পেলেই জোগাড়যন্ত্র শুরু করবে। সিধুর মতো ছেলেকে হাতছাড়া করতে চাইবে না। সুস্থ হলে না হয় আর একদিন যাস। তোর অপছন্দ হবে না”।
টিভি বন্ধ করে দিল তপন। কথা বলতে আর ইচ্ছে করছে না। মেয়ের কথা উঠতেই কাল বিকেলের ঘটনা আবার মনে পড়ল। মঞ্জুলার চেহারাটা। মঞ্জুলার কি কোনও গোপন প্রেমিক আছে।
এই বিয়ে তাই কায়দা করে ভেঙে দিতে চাইছে। আশ্চর্য ব্যাপার! নিজের বিয়েতে নিজেই ভাংচি দিচ্ছে।
বাপরে, তুখোড় মেয়ে বটে। হবু ভাশুরের সঙ্গে কী স্মার্টলি কথা বলল। ‘দেখুন আমার কপালে হাত দিয়ে’
বলে কী রকম বিপজ্জনকভাবে এগিয়ে এসেছিল। ‘দেখি’ বলে সত্যি যদি তপন কপালে হাত ছোঁয়াত, কী করত মঞ্জুলা। মেয়েটা যদি না চায়, এই বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আর এগোন উচিত নয়। হয়তো বাড়ির
চাপে বিয়ে হল, কিন্তু পরে সিধুর সঙ্গে যদি অ্যাডজাস্টমেন্ট না হয়, তার জন্য তপনই দায়ী থাকবে।
মঞ্জুলা, সিধু– দুজনের কাছেই সে অপরাধী হয়ে থাকবে চিরদিন। তার জনই একটা ভুল বিয়ে হয়েছে।
“লিলি, মাকে একবার ডেকে দে তো”।
নয়
ঠিক পনেরো দিন বাদে তপন আবার বলরামপুর রওনা হল। ওদের বাড়িতে খবর দেওয়া হল।
সেদিনের মতই টোটোতে পৌঁছাল তপন। এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা সাদা স্কুটি খুঁছিল তপন। দেখল না কোথাও। প্রায় তখনই কোথা থেকে যেন উড়েই এল মঞ্জুলা। আজ একটা হলুদ শাড়ি পরেছে। ম্যাচিং ব্লাউজ। তপনের মনে হল একটা প্রজাপতি দূরের কোনও ফুলবাগান থেকে উড়তে উড়তে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তপন দেখল এই শীতেও মেয়েটার নাকের পাশে একবিন্দু ঘাম লেগে আছে।
“আপনি আজ আবার এসেছেন? আচ্ছা, আপনি কি বিশ্বাস করেন আপনার হাতের এই পাথরগুলো দিয়ে মানুষের সব দুর্ভাগ্য কেটে যায়?”
বাস্তবিক হতচকিত হয়ে গেল তপন। আজ মেয়েটা আক্রমণের সেকেন্ড ফ্রন্ট খুলেছে।
হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উত্তর দেবার জন্য কয়েক সেকেন্ড সময় বেশি লাগল তপনের।
“হ্যাঁ, আজ আবার আসতে হল। আপনার বাড়ির লোকের সঙ্গে কিছু কথা আছে আমার। তিনজন কোভিড আর একজন ডেঙ্গির পেশেন্ট নিশ্চয় কিছুটা সুস্থ হয়েছেন। মিনিট পাঁচেক হয়তো বসব। একটা-দুটো কথা বলেই চলে আসব। আর হ্যাঁ, এসব রত্নপাথরে নিশ্চয় কাজ হয়। আকাশের গ্রহনক্ষত্রের কতটুকু জানেন আপনি। কত প্রাচীন শাস্ত্র, সব কি ফালতু। এই যে দেখুন, গুরুদেবের শোধন করে
দেওয়া এই গোমেদ ধারণ করার পর আমি যা উপকার পেয়েছি …”
“আপনি কি মুহুরিগিরির সঙ্গে পাথরের ব্যবসাও করেন? আমাকে মুরগি ভাবলে ভুল করছেন। শুনুন, রাহুকেতু নামে কোনও গ্রহ নেই। কাল্পনিক দুটো বৃত্তের ছেদবিন্দু। আপনার অবশ্য জানার কথা নয়
যে, মহাবিশ্ব ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ছে। তো সেই কত বছর আগে, যখন এসব শাস্ত্রফাস্ত্র লেখা হয়েছিল, তখন নক্ষত্রগুলো যে পজিশনে ছিল, এখন নিশ্চয় সরে গেছে। আপনাদের শাস্ত্র কি রিভাইজড হয়েছে? নাকি সেই পুরোনো হিসেবেই চলছে? আর শুনুন, গিরিজা বিশ্বাসের বাড়ি কেন যাবেন? ওই যে দেখুন সৌভাগ্য সুইটস, কাজু-বরফিটা হেভি বানায়। চলুন দুটো খেয়ে দেখবেন। আপনাকে
প্রথমে দেখে তো আমি ভেবেছিলাম উত্তরমেরু থেকে কোনও মেরুভল্লুক এসে পড়েছে। সত্যি বলতে কি সাদা মাঙ্কিক্যাপ আমি জীবনে এই প্রথম দেখলাম। কিছু মনে করবেন না। জাস্ট জোক করলাম।
(চলবে)



