অলীক পাখি (পর্ব ৮)

শেষ আপডেট:

  • বিপুল দাস

বারো

একটু একটু করে আমি বদলে যাচ্ছিলাম। স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহে কোথাও একটা নুড়ি আটকে রেখেছিল প্রবাহকে। দীপা আমার সেই ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছে। ছোট্ট পাথরটা একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। মার্বেল ভেদ করে কিছু শেকড়বাকড় বুকের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। আনন্দ যতই বলুক – দীপা ওকে ভীষণ ভালোবাসে, বাইরে গেলে বারে বারে ফোন করে খবর নেয়, তবু দীপা অগম্য নয়। মঞ্জুলাকে দেখে আমার রক্তের কোলাহল টের পেয়ে আমারই অবাক লাগছিল। আমি ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে পাথরের দোকানে চাকরি করছি দেখে আনন্দ বোধহয় খুশি হয়েছিল। আমার কিন্তু খারাপ লেগেছিল শান্তিগোপাল আনন্দকে ছেড়ে চলে গেছে দেখে। আনন্দকে তোমার কী দেখে পছন্দ হয়েছিল, বলো তো – একদিন জানতে চেয়েছিলাম দীপার কাছে। একটু বেশি মদ খাওয়া হয়েছিল সেদিন।

“ওর ওই হাসি, দাদা। কী বলব, একদম বাচ্চাদের মতো। আমার ভেতরে কী যেন হয়ে গিয়েছিল। ওরকম পবিত্র, নিষ্পাপ হাসি যে হাসতে পারে, তার জন্য আমি ঝাঁপ দিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল লোকটার মনেও কোনও পাপ নেই। আমাকে কোনও দিন ঠকাবে না।”

“শুধু ওর হাসি দেখেই ওকে ভালোবেসেছিলে? তোমাদের ভালো বুঝি না দীপা।”

“ও আপনি বুঝবেন না। চেহারা, টাকাপয়সা, ফ্যামিলি – কিচ্ছু নয়। এর বাইরে কিছু একটা এক্স-ফ্যাক্টর থাকে। সেটা সব সময় শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না। মেয়েদের ভেতরটা বড় রহস্যময় দাদা, আমি নিজেই বুঝতে পারি না।”

“আনন্দ তোমাকে খুব ভালোবাসে, তাই না? তুমিও।”

“মানুষটা খুব সরল। আমি ছাড়া অন্য কোনও মেয়ের কথা ভাবতেই পারে না। আমি তো অনার্স গ্র্যাজুয়েট, গানেও ডিপ্লোমা পেয়েছি। আর আপনার ভাইয়ের দৌড় তো আপনি ভালোই জানেন। আমাকে যদি শিক্ষিত বলেন, তবে এক শিক্ষিত আর এক মূর্খ একসঙ্গে দিব্যি সংসার করছি। কোনও দিন কারও কোনও কমপ্লেক্স তৈরি হয়নি। ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং, ভালো বন্ড তৈরি হয়ে গেছে। একে যদি ভালোবাসা বলেন তো ভালোবাসা।”

দীপার কথা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম। আশ্চর্য এই বন্ড। পুরুষে পুরুষে, নারীতে নারীতে, নারী আর পুরুষে এই বন্ড হতেই পারে। দুজন মানুষের ভাবনার তরঙ্গ মিলে গেলে এই বন্ড তৈরি হয়। কিন্তু তাদের ভেতরের এই বন্ডকে কি ভালোবাসা বলা যাবে। বলি না তো আমরা। আমার বাবার সঙ্গে ক্লাবে তাসের পার্টনার মৃগাঙ্ককাকুর খুব ভালো বন্ড ছিল, ভালোবাসাও ছিল নাকি। কী জানি, কাকে বলে নারীপুরুষের ভালোবাসা। সেখানে কি সম্পর্ক স্বার্থহীন। শরীরের কামনাবাসনাও কি তাদের একসঙ্গে থাকার একটা বড় কারণ নয়।

“দাদা, একটা কথা বলব? ও কিন্তু আজকাল একটু বেশি ড্রিংক্স নিচ্ছে। মাতলামি করে না, কিন্তু একটু টিপসি হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন বলে। আপনি বললে হয়তো কন্ট্রোল করবে।”

“কী বলে, কী বলে, কমরেড লেনিনের আহ্বান?”

উত্তেজনায় আমি প্রায় দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। শালা, শিল্পটা নিশ্চয় ঠিক বাঁচিয়ে রেখেছে। আমি জানতাম, যতই ব্যবসা বাড়াক, আসলে তো শান্তিগোপাল। আমাদের বাড়ির ভাত খেয়ে বড় হয়েছে।

“একটা কথা বলব দীপা?”

“বলুন দাদা, কী কথা।”

দীপার চোখের দিকে তাকালাম। একটা ত্রস্ত ভয়ের ছায়া, আবার সামান্য খুশির আলোও রয়েছে।

“অত দাদা দাদা কোরো না তো আমাকে। টনিদা বলতে পারো। দীপা, আমি না বদলে যাচ্ছি। এখন আর পৃথিবীটা অত নির্জন মনে হয় না। আমার বিজনবাসের পালা কমে আসছে।”

“ভালো তো। আমার তো অবাক লাগে আপনার মতো একজন ওয়াইজ, সেন্সিবল মানুষ রসকষহীন পাথর নিয়ে কীভাবে সময় কাটান। পৃথিবী নির্জন কেন হবে? আমরা সবাই আছি তো। আপনাকে আমার মাঝে মাঝে অদ্ভুত মানুষ মনে হয়।”

“কেমন মানুষ দীপা? আমাকে কী মনে হয় তোমার?”

“একসেন্ট্রিক টাইপের, স্ট্রেঞ্জ। ভেতরে সবসময় একটা অস্থিরতা আপনাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। কিছুতেই আপনার তৃপ্তি নেই। কেন বলুন তো? কী খুঁজে বেড়ান আপনি? আপনার ভাইয়ের কাছে শুনেছি মেয়েদের ব্যাপারে আপনার অ্যাপ্যাথি আছে। চিরকাল ওসব অ্যাভয়েড করেছেন। রাগ করবেন না, প্রথম প্রেমে কি কেউ দুঃখ দিয়েছিল?”

“না দীপা, সেসব কিছু নয়। তুমি, তুমি আমাকে পালটে দিচ্ছ। তোমার সঙ্গে কথা বলে আমি বুঝি আমাদের ভাবনায় একটা মিল রয়েছে। আমি, আমি আরও বদলে যেতে চাই দীপা। তুমি আমাকে আরও কাছে নাও দীপা।”

অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল দীপা। আমিও ওর চোখে চোখ রেখে তাকালাম। দেখলাম প্রথমে ওর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আমার এই সমর্পণ বোধহয় ওর জয়, তাই ভাবছে। তারপর আস্তে আস্তে চোখ সরিয়ে নিল।

“না দাদা, এ হয় না। আপনার ভাবনাও আমি বুঝি। আপনার এই ছটফট করে বেড়ানো আমার ভালো লাগে না। আপনি যা খুঁজে বেড়াচ্ছেন, যদি কাছে এসে দেখতে পান আমি সে নই, সে নহি — তখন খুব কষ্ট পাবেন। আমি আপনার ভাইকে কষ্ট দিতে পারব না। আমাকে কতটুকু চিনেছেন, বলুন? একদিন যদি দেখতে পান, যাকে ভেবেছিলেন মিষ্টি জলের দিঘি, আসলে সেটা মরীচিকা, তেষ্টা নিয়ে যেখানে ছুটে গেছেন, আসলে সেখানে কিছু নেই, তখন কী হবে বলুন। সইতে পারবেন তো? আপনাকে যতটুকু দিয়েছি, ততটুকুই পারব। তার বেশি নয় টনিদা। কষ্ট হয় আপনার জন্য। আমি হয়তো আপনাকে শান্ত করতে পারতাম। কিন্তু যদি এমন হয় যে, ভুল হয়ে গেছে আপনার, আমার – তখন পাগল হয়ে যাবেন। তার চেয়ে এই ভালো দাদা।”

                দীপা কি আনন্দর কথা ভেবে আমাকে ফিরিয়ে দিল? হেরে যেতে আমার ভালো লাগে না দীপা। হবি সেন্টারের জন্য দোকানটা ফাইনাল করে ফেলব এবার।

তেরো

                বিকেল তিনটে নাগাদ একটা ফোন এল তপন সামন্তর কাছে। মহিলা কণ্ঠ, অচেনা নম্বর, কিন্তু গলাটা চেনা-চেনা মনে হল তপনের। কথা বলার এই ভঙ্গি সে আগে শুনেছে। এখন মনে পড়ছে না।

“শুনুন, সেদিন কোর্টে যে চা খাইয়েছিলেন, অতি জঘন্য। প্রচণ্ড অ্যাসিড হয়েছিল। প্রায় এক বোতল অ্যান্টাসিড  খেতে হয়েছিল। এর পরে গেলে আমি সঙ্গে লিফ নিয়ে যাব, আপনি শুধু এককাপ গরমজলের ব্যবস্থা করে দেবেন।”

                মুহূর্তেই তপন মঞ্জুলা বিশ্বাসকে চিনতে পারল। এক সেকেন্ড লাগল তার হতচকিত ভাবটা কাটাতে। এর আগের দিন মঞ্জুলা তার নম্বর নিয়েছিল, কিন্তু তপন ওর নম্বর রাখেনি। তাই অচেনা নম্বর।

“হ্যাঁ, বলুন। দাঁড়ান, পাঁচ মিনিট বাদে আমি আপনাকে করছি। এটাই আপনার নম্বর তো?”

“দুটো কথা। এক – আমাকে ‘তুমি’ করে বলার কথা। দুই – আপনি কী করে ভাবলেন আমি অন্য কারও ফোন থেকে আপনার সঙ্গে কথা বলছি। এটা আমারই নম্বর।”

“সরি, এখন একটু ব্যস্ত আছি। রাখছি, ঠিক পাঁচ মিনিট বাদেই তোমাকে ফোন করছি।”

                ফোন কেটে আগে মঞ্জুলার নম্বর সেভ করল তপন। সেদিন মঞ্জুলা বলেছিল ওর কিছু বলার আছে। কোর্টে এত লোকের মাঝে নয়, অন্য কোথাও একটু সময় নিয়ে বলবে। মনে হচ্ছে সে ব্যাপারেই কথা বলতে চায়। একটা জরুরি ফোন সেরে মঞ্জুলাকে ফোন করল তপন।

“হ্যালো, বলো কী বলবে।”

“আপনার সঙ্গে বাইরে কোথাও একটু দেখা করতে চাই। আপনার মূল্যবান সময় থেকে একটু সময় কি দেওয়া যাবে?”

“অবশ্যই মূল্যবান। শোনো, জন্মের পর তোমার মুখে কি নিমফুলের মধু দিয়েছিল? নরম করে কথা বললে কি তোমার অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। আসলে তোমার রাগটা ঠিক কার ওপর বলো তো। সব কথায় খোঁচা। আমি কিন্তু ডিফেমেশনের চার্জ আনব।”

“আগে বলুন আগামী রবিবার আমার সঙ্গে ম্যাক্সিমাম ঘণ্টাদুয়েক সময় কাটালে আপনার আনুমানিক কত টাকা ক্ষতি হতে পারে। আমরা গরিব, কিন্তু মুহুরিকে ঠকাব না।”

“উফ, তোমার সঙ্গে কথা বলাই ঝকমারি। কোথায়, কখন?”

“আপনার মাঝেরডাঙা থেকে আমার বলরামপুর বেশি দূরে নয়। কিন্তু এদিকে নয়, আপনি কি বারাসতে আসতে পারবেন? হৃদয়পুরের ওদিকে। ভয় নেই, আপনাকে ইলোপ করব না। আসলে ওখানে আমার চেনা একজন থাকেন। ওঁর একটা বাগানবাড়ি, মানে সেই বাগানবাড়ি নয়, বেশ বাগানঘেরা বাড়ি আছে, আশ্রম টাইপের। অনেক ফুলের গাছ। ওখানে গেলে আশা করি আপনার ভালো লাগবে। চলে আসুন, আপনার সঙ্গে কথা বলে আমি একটু পাপমোচন করি।”

“ঠিক আছে। কখন যেতে হবে?”

“এই ধরুন, সাড়ে তিনটে থেকে চারটের ভেতর। অসুবিধে হবে?”

বাড়ি থেকে বেরিয়ে তপন দেখল নিজের অজান্তেই সে বেশ সাজগোজ করে বেরিয়েছে। নিত্যনৈমিত্তিক কাজের পোশাক নয়, একটা ঘন নীল জিন্সের ওপর সাদা শার্ট, তার ওপর একটা জ্যাকেট পরেছে। নাইকের জুতো। তপন টের পাচ্ছিল তার হাঁটাচলায় একটা এক্সট্রা মাইলেজ এসে গেছে। অটোম্যাটিক স্মার্টনেস এসে গেছে তার ভেতরে। কে জানে কোন গোপন কথা তাকে মঞ্জুলা বলবে।

                বেরোনোর মুখে সিধুর সঙ্গে দেখা হতে হঠাৎ লজ্জা পেয়েছিল তপন।  দাদা, বাইরে যাচ্ছিস – জিজ্ঞেস করলে কেমন যেন বোকার মতো বলেছিল – এই, একটু ঘুরে আসছি। কিছু বলবি?

“শিউলি আর ভুজঙ্গর ব্যাপারে তোর সঙ্গে কথা ছিল। তুই বাড়িতে ছিলি না, বাড়িতে আর কেউ জানে না, বোধহয় পুলিশের লোক, ভুজঙ্গ সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে এসেছিল। এবার মনে হচ্ছে প্রহারেণ ধনঞ্জয় করতে হবে। শনির মতো আমাদের কাঁধে চেপে আছে। পাড়ায় আমাদের ফ্যামিলির নামে বাজে কথা রটছে।”

“হুঁ, জানি। সবার সঙ্গে বসে একদিন কথা বলতে হবে।”

                ছোটভাই সিধুর চোখে তাকিয়ে কথা বলছিল না তপন। একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে – আমি আসি, বলে বেরিয়ে গেল। সিধু ভুরু কুঁচকে দাদাকে একবার দেখল। খুব স্মার্ট দেখাচ্ছে দাদাকে। মনেই হচ্ছে না তপন সামন্ত কোর্টের মুহুরি। ভালো লাগল সিধুর। ফ্যামিলির জন্য দাদার স্যাক্রিফাইসের কথা ভাবলে দাদাকে দেবতা মনে হয়। তার ডিসিশন নেওয়ার ক্ষমতা থাকলে দাদার জন্য মেয়ে দেখে বিয়ের উদ্যোগ নিত। চল্লিশ পেরোনো দাদা তার চেয়ে বারো বছরের বড়। চল্লিশ আজকাল এমন কিছু বয়স নয়। বন্ধুর মতো কোনও দিন মিশতে পারেনি দাদার সঙ্গে। কোনও দিন মুখ তুলে কথা বলার সাহস পায়নি। পারলে হয়তো বলত – দাদা, তুই বিয়ে কর। আমি বৌদি খুঁজে আনব।

                বারাসতে পৌঁছে একটা টোটো নিয়ে হৃদয়পুরে পৌঁছাল তপন। কে জানে কোথায় সেই আশ্রম। আঙুলের পাথরগুলো একবার দেখল। এবার একটা ফোন করা দরকার। নইলে পথের লোকজন বা দোকানে জিজ্ঞেস করতে করতে যেতে হবে। ফালতু সময় নষ্ট। তার চেয়ে মঞ্জুলাকে একটা ফোন করে নেওয়াই ভালো।

গেটের ওপরে আর্চের মতো হাফ-সার্কেল। মাধবীলতার ঝাড় দু’পাশ দিয়ে উঠেছে। ভেতরের লোহার ফ্রেম বোঝা যায় না। বাইরে একটা বোর্ডে লেখা ‘শান্তিকুঞ্জ’। মঞ্জুলা আজ শাড়ি পরে এসেছে। সাদা শাড়ি, ভেতরে সোনালি ফুল। চওড়া লাল পাড়। দুই ভুরুর ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট কালো টিপ। শান্তিকুঞ্জের সামনে টোটো দাঁড়ালে মঞ্জুলাকে দেখে তপনের বুকে মৃদু কাঁপন ধরল। কী সুন্দর দেখাচ্ছে মঞ্জুলাকে। কপালে যদি একটা বড় লাল টিপ পরত, আরও সুন্দর হয়ে উঠত মঞ্জুলা।

“চলুন, আগে তপোদার সঙ্গে দেখা করে আসি। তপোজ্যোতি রায়। ওই যে একতলা বাড়িটা, ওখানে তপোদার ঘর। পরে আপনাকে সব দেখাব। কত রকমের যে গাছ, নামই শুনিনি কোনও দিন। লোকটা একটু অন্য রকম। রাত জেগে বসে থাকে বেলিফুলের ফুটে ওঠা দেখবে বলে। ছোট্ট একটা পুকুর বানিয়ে সেখানে পদ্ম ফুটিয়েছে। আবার নীলমণি লতার সঙ্গে মালতীলতার বিয়ে দেয় ধুমধাম করে। একটু পাগলটাইপ আছে। কথা বললেই বুঝবেন। বেশ অন্যরকম। জানেন, হঠাৎ হঠাৎ মনে হয় লোকটা বুঝি এই ধুলোমাটির, লাভক্ষতির হিসেব-করা পৃথিবীর কেউ নয়। আমার এক দিদি, দীপাদি আমাকে এখানে একদিন নিয়ে এসেছিল। আমার ভেতরে সবসময় যে অস্থিরতা, জানি না আপনি বুঝতে পেরেছেন কি না, অন্যকে শুধু শুধু আঘাত করার একটা টেন্ডেন্সি কাজ করে। সেদিন আশ্চর্য একটা শান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। তখনই ঠিক করেছিলাম আপনাকে এখানে আসতে বলব।”

                তপন ভেবেছিল গুরুদেবের মতো চেহারা হবে লোকটার। ক্যালেন্ডারে যেমন মহাপুরুষদের ছবি থাকে, মাথার পেছনে একটা বলয়, সেখান থেকে জ্যোতি বেরোচ্ছে – সেরকম কোনও মানুষ হবে। দেখল, নিতান্তই সাদামাঠা লোক। পাজামা আর গেরুয়া পাঞ্জাবি পরে খুরপি দিয়ে একটা গাছের গোড়া পরিষ্কার করছে।

“এসো মঞ্জুমা, আজ বড় ভালো দেখাচ্ছে গো তোমাকে। তোমার মুখটাই মায়ের মতো। আজ একেবারে স্বয়ং মা ভবানী হয়ে এসেছ। ভবানী দয়ানী মহা বাক বাণী, সুর নর মুনিজন সকল বুধজ্ঞানী।”

                ভরাট গলায় ভৈরবীর সুর ছড়িয়ে পড়ল গাছের পাতায়, ফুলে, আশ্রমের বাতাসে। তপনের শরীর কেমন ঝামরে উঠল। দুপুর পার হয়ে দিন বিকেলের দিকে গড়িয়েছে, অথচ তপনের মনে হল এখন বুঝি ভোর হচ্ছে। পুব আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে।

“তপোদা, ইনি তপন সামন্ত। আমার খুবই পরিচিত। শান্তিকুঞ্জের কথা শুনে দেখতে চেয়েছিলেন। সঙ্গে নিয়ে এলাম।”

“আসুন ভাই, আসলে আমাদের পৈতৃক ভিটে। অনেকটা জায়গাজুড়ে ফলপাকুড়ের বাগান, ফুলের বাগান, চারভিতেই ঘর। একসময় লোকজনে গমগম করত। আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে গেল। প্রোমোটারের ঘোরাঘুরি শুরু হল। ভালো করে ঘেরা দিয়ে ওই একটা আশ্রমের মতো করে রেখেছি। দুখি মানুষজন আসে। তাঁদের সঙ্গে বসে একটু গল্পগাছা করি।”

                সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালে তপন লোকটা বেশ লম্বা, বাঙালিদের অ্যাভারেজ হাইট থেকে অন্তত চার-পাঁচ ইঞ্চি বেশি। মাথার চুল কাঁচাপাকা। মুখেও কাঁচাপাকা দাড়ি। উজ্জ্বল দুটো চোখ।

“যান ভাই, মঞ্জুমার সঙ্গে বাগান দেখে আসুন। গাছের নীচে বেঞ্চ পাতা আছে, ছায়ায় বসে গল্প করুন। ইচ্ছে হলে যাওয়ার সময় একবার আমার ঘরে আসবেন। এককাপ চা খেয়ে যাবেন।”

                ওরকম একজন লম্বাচওড়া, দাড়িগোঁফওয়ালা মানুষের কথাবার্তা এত মৃদু – অস্বাভাবিক লাগছিল তপনের। এইমাত্র ভরাট গলায় যখন গান গেয়ে উঠেছিল, গমগম করে উঠেছিল চারপাশ। কথা বলার ভঙ্গি একেবারে খাঁটি বৈষ্ণবের মতো। গলায় অবশ্য তুলসী কাঠের মালা বা নাকে রসকলি নেই। কে জানে আসলে কেমন মানুষ। এ লাইনে তো দু’নম্বরি মানুষের অভাব নেই। কোর্ট চত্বরে কত গেরুয়াধারীকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে দেখেছে সে, কত গলায় কণ্ঠিপরা মানুষকে মামলা করতে দেখেছে। বরং মঞ্জুলার এই তপোদা যদি হাঁকডাক করে কথা বলত, যেন মানানসই হত। গেরুয়াধারী সাধুকেও দেখেছে ধর্ষণের মামলার আসামির কাঠগড়ায়।

“আপনাকে তপনদা বলে ডাকলে আপত্তি আছে? আসলে আপনাকে ‘দাদা দাদা’ বলে ডাকতে আমার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। অবশ্য ভাশুরকে সাধারণত দাদা-ই ডাকা হয়। সে তো আর হচ্ছে না। ‘হতে-পারতেন-দাদা’ বলে তো আর ডাকা যায় না। চলুন, ওই বেঞ্চটায় গিয়ে বসি। বাই দা বাই, আপনাকে আজ কিন্তু খুব স্মার্ট দেখাচ্ছে। কোর্টে ওরকম বুড়োদের মতো পোশাক পরে থাকেন কেন?”

                তপনের বুকের ভেতরে ধড়ফড় করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আড়চোখে মঞ্জুলার দিকে তাকাল। ভাগ্যিস বুকের ভেতরের ধড়ফড়ানির শব্দ বাইরে থেকে শোনা যায় না। অনেক শব্দই বাইরে থেকে শোনা যায় না। বুকের ভেতরের নিঃশব্দ রক্তপাতের কোনও শব্দ হয় না। খুব করে চাওয়া কোনও জিনিস না পেলে তার জন্য কান্না বাইরে থেকে শোনা যায় না।

                কী বলবে মঞ্জুলা, কোন গোপন কথা বলার জন্য তাকে এখানে ডেকে এনেছে। মঞ্জুলার পক্ষে এই বিয়ে সম্ভব নয়। শুধু কি এই বিয়েতেই তার আপত্তি, নাকি সব বিয়েতেই। সে কি কুমারী থাকতে চায়। এই আশ্রমের সন্ন্যাসিনী হওয়ার মতলব নাকি। তার সঙ্গে কথা বলে তো মনে হয়েছিল ধর্মে তার বিশেষ মতি নেই। গ্রহণক্ষত্র নিয়ে তাকে বাঁকা কথাও শুনিয়েছিল। নাঃ, তার মুহুরিগিরি কোনও কাজ করছে না। কে জানে মেয়েটার কী মতিগতি।  (চলবে)

Sabyasachi Bhattacharya
Sabyasachi Bhattacharyahttps://uttarbangasambad.com/
Sabbyasachi Bhattacharjee Reporter based in Darjeeling district of West bengal. He Worked in Various media houses for the last 23 years, presently working in Uttarbanga Sambad as Sr Sub Editor.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

উত্তরের কবিমুখ

শিশির রায়নাথ কবিতা লেখা তাঁর শখ, অন্য আরও দশটা...

অণুগল্প

ডাকনাম তন্ময় কবিরাজ বিশাল বাড়ি। বাসিন্দা একজন। সুবিমল। চাকরি ছেড়ে সম্পত্তি...

কবির দাড়ি অথবা দাড়ির কবি

সুতপা সাহা সুকুমার রায় লিখেছিলেন, ‘গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ...

রবিকিরণ

নস্টালজিয়া পেরিয়ে ওটিটি’র রহস্যময় কবিগুরু গ্রন্থন সেনগুপ্ত তখন আমার বয়স বড়জোর...