দামিনী সাহা, আলিপুরদুয়ার: ‘বাবা শুধু তোমার একার প্রিয়জন নয়। বাবা দেশের কাজ করছে।’ মেয়েকে এভাবেই বুঝিয়েছেন অনামিকা কার্জি রায়। জন্মদিনে বাবাকে কাছে না পাওয়া পাঁচ বছরের ছোট্ট মন কি আর এত বুঝতে চায়? কিন্তু অনামিকাও নিরুপায়।
নিরুপায় ঝুনু দাসও। একা হাতেই সামলাচ্ছেন সংসার আর দুই সন্তানকে। তাঁর মেয়েও বাবাকে কাছে চায়, কিন্তু পায় না। ঝুনু বা অনামিকার চিন্তা তাঁদের স্বামীদের নিয়ে। ঝুনুর স্বামী ধনকুমার দাস ও অনামিকার স্বামী চিরঞ্জিৎ রায় এই মুহূর্তে পোস্টেড রয়েছেন কাশ্মীরের সন্ত্রাসপ্রবণ অঞ্চলে। আর এদিকে আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) শহরে দুরুদুরু বুকে বাড়িতে বসে অপেক্ষায় তাঁদের স্ত্রীরা।


অপেক্ষা খবরের। সেই খবর যে কোনও সময় দুঃসংবাদও যে হতে পারে, বিলক্ষণ জানেন অনামিকারা। ওদিকে যুদ্ধবিরতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা বলে শহরের দুটি পরিবারের বুকের কাঁপুনি থামেনি একটুও। সারাদিন বাড়িতে টিভি চলছে অনবরত। যেন যুদ্ধক্ষেত্রের কোনও আপডেট মিস না হয়। ফোনে কারও সঙ্গেই সেভাবে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
শহরের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে চিরঞ্জিৎ রায়ের বাড়ি। তিনি এখন কাশ্মীরে একটি অপারেশনাল হেডকোয়ার্টারে কর্মরত। তাঁর বৃদ্ধা মা শ্রবণশক্তিহীন, জানেনও না যে ছেলে এখন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। জানালে যদি উদ্বেগ বাড়ে, সামলাতে না পারেন, সেটাই আশঙ্কা। তারপরেও মায়ের মন তো, ছেলের প্রসঙ্গ উঠলেই চোখ ভিজে ওঠে।
চিরঞ্জিতের স্ত্রী অনামিকা দুই মেয়ের মা। এক হাতে সংসার, অন্য হাতে সন্তান পালন করার দায়িত্ব। শনিবার ছোট মেয়ের জন্মদিন ছিল। সে এবার পাঁচে পা দিল। জন্মদিনের আগে তার একটাই ইচ্ছা ছিল, ‘বাবা ফিরে এলেই জন্মদিন করব।’ এই কথাটা অনামিকার মনে গেঁথে আছে কাঁটার মতো। বললেন, ‘ওরা এত ছোট যে ওদের কিছু বোঝানোও যায় না।’
শহরেরই ৪ নম্বর ওয়ার্ডে বাড়ি ধনকুমারদের। মার্চ মাসে এক মাসের ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন। ছুটি কাটিয়ে গত ২০ এপ্রিল ফিরে যান পহলগামে। সেখানেই গত তিন বছর ধরে কর্মরত রয়েছেন তিনি। আর তাঁর কাজে যোগ দেওয়ার ঠিক দু’দিন পরই ঘটে যায় সেই সন্ত্রাসবাদী হামলা। তারপর থেকেই ধনকুমারের পরিবারের দিন কাটছে এক দমবন্ধ করা দুশ্চিন্তার মধ্যে। ঝুনু বলছিলেন, ‘আগে দিনে দুই-তিনবার ফোনে কথা হত ওর সঙ্গে। এখন এত ব্যস্ত যে কথা হয় একবার। তাও মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। কোনও কোনওদিন আবার ফোনও লাগে না। এদিকে আমরা উদ্বেগে আকুল হয়ে যাই যে কোনও গণ্ডগোল ঘটে গেল কি না।’
ঝুনু কাঁপা গলায় বললেন, ‘পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, রাতে ঘুম আসে না। ছোট মেয়ে জয়া বাবা ফোন করলে শুধু একটাই কথা বলে, তুমি ফিরে এসো। ও বুঝে উঠতে পারে না কী ঘটছে। শুধু বাবাকে মিস করে।’ একটু থেমে যোগ করলেন, ‘আমাদের পরিবারে অনেকেই সেনাবাহিনীতে রয়েছে। ভাই সুদীপ বিএসএফে, জম্মুতে কর্মরত।’
রবিবার ছিল মাতৃ দিবস। সেই উপলক্ষ্যে মানবিক মুখ নামের স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সেই অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেওয়া হয় ধনকুমার ও চিরঞ্জিতের স্ত্রী ঝুনু ও অনামিকাকে। সংগঠনের পক্ষ থেকে এদিন দুজনের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয়।
সেইসঙ্গে পুষ্পস্তবক ও একটি করে উপহারও দেওয়া হয়। সংগঠনের সম্পাদক রাতুল বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত সেনাদের সম্মান জানাই। কিন্তু তাঁদের পিছনে যে বাড়ির লোকজন সবকিছু ত্যাগ করে ভরসা জোগায়, সেকথা সবসময় মনে রাখি না। বিশেষ করে জওয়ানদের মা ও স্ত্রীদের কুর্নিশ জানানোর জন্যই আমাদের এই উদ্যোগ।’
ঝুনু ও অনামিকা স্বামীদের নিরাপত্তার জন্য নিরন্তর প্রার্থনা বুকে নিয়েই আগলে রাখেন সন্তানদের, সামলান সংসার।

