প্রণব সূত্রধর, আলিপুরদুয়ার : শিশুকন্যা খুনে অভিযুক্ত মা পূজা দে ঘোষের পারিবারিক ইতিহাসও কম রহস্যজনক নয়। পূজার প্রথমপক্ষের স্বামী এবং পূজার মায়ের রহস্যমৃত্যু (আত্মহত্যা) হয়েছিল বলে পরিবারের লোকেরা জানাচ্ছেন। আরও জানা যাচ্ছে, সিজোফ্রেনিয়া জনিত মনোরোগ পূজার মায়েরও ছিল। বছর তেইশের পূজার মধ্যেও সেই রোগের প্রভাব পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ছোটবেলায় সেই রোগের বিষয়ে তেমন বোঝা না গেলেও লকডাউনের সময় এক জায়গায় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, খাবারে অনীহার মতো উপসর্গ দেখা দেয় পূজার। তারপরেই মনোরোগের বিষয়ে পরিবারের লোকজন জানতে পারেন। বিশেষ করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশা ছিল না বললেই চলে। স্বামীর সঙ্গে বাইকে বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করত মাঝে মাঝে। বাড়ির রান্না করলেও অন্যান্য কাজ করতে চাইত না। অবসরে মোবাইল ফোনে পূজা ব্যস্ত থাকত বলে জানান শ্বশুর। পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘শিশুকে জলে ফেলার বিষয়টি স্বীকার করেছে পূজা। আরও বিশদে জানতে তদন্ত চলছে।’
শিশুমৃত্যুর ঘটনার পর রবিবার দক্ষিণ চেচাখাতা ডিএস কলোনির গলিতে থমথমে পরিবেশ লক্ষ করা গিয়েছে। শিশুটির বাড়িতে শ্রাদ্ধের জন্য পুরোহিতের সঙ্গে কথা বলছিলেন তার বাবা জয়দীপ ঘোষ। জয়দীপ বলেন, ‘মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। কিছুদিন আগেই অন্নপ্রাশন দিয়েছি। আর এখন মেয়ের শ্রাদ্ধশান্তির কাজের প্রস্তুতি চলছে।’ জয়দীপ জানাচ্ছেন, বিয়ের পর কয়েকবার স্ত্রীর মানসিক পরিস্থিতি বদলে যেতে দেখেছেন তিনি। স্নান, খাওয়াদাওয়া না করে চুপচাপ বসে থাকা, পলকহীন চোখে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকা, এসব অস্বাভাবিকতা দেখে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল। তারপর আবার সুস্থ হয়ে ফিরেও আসেন স্ত্রী। কিন্তু সন্তান জন্মানোর প্রায় এক মাস পর থেকেই পরিস্থিতি বদলে যায়। মেয়ে চক্ষুশূল হয়ে ওঠে পূজার। তাকে জোরে আঘাত করতেও দেখেছেন পরিবারের লোকজন। প্রতিবেশী রূপা দত্ত বলেন, ‘বিয়ের পর রাস্তাঘাটে তেমন দেখা যায়নি পূজাকে। এমনকি শিশু খুনের ঘটনার পরেও ও নিজের কথাই বলে চলছিল।’
শিশুটিকে যে খাটে বিশ্রামের জন্য শেষবার রাখা হয়েছিল, সেখানে বসে ছিলেন ঠাকুরদা মলয় ঘোষ। রবিবার দুপুর পর্যন্ত কিছু খেতে পারেননি বলে জানালেন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নীলাদ্রি নাথ বলেন, ‘সিজোফ্রেনিয়া বা পোস্টপার্টাম সাইকোসিস রোগ থাকলে শিশুর প্রতি অনীহা জন্মাতে পারে। প্রসব পরবর্তী সময়ে হতে পারে মানসিক বিকার। যা থেকে নিজের সন্তানের ক্ষতি করে থাকতে পারেন রোগী। এমনকি আত্মহত্যা করতে পারে। তবে সঠিক চিকিৎসা হলে রোগী সুস্থ থাকেন।’

