সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, প্যারিস: ‘তারক মেহতা কা উল্টা চশমা’-তে জেঠালাল গাড়ার জীবনে নানা সমস্যা। আর তা নিয়েই নানা হাস্যরস। আর সেই সিরিয়াল থেকেই নিজের জীবনের ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত খুঁজে নেন জীবনযুদ্ধে অনেক লড়াইয়ের পর জিতে যাওয়া এক তরুণ।
২০১২ সালে যখন সুশীল কুমার রুপো পেলেন লন্ডন অলিম্পিকে, সেদিনই হয়তো জন্ম হল আর এক কুস্তিগিরের। মাত্র ১০ বছর বয়সে আমন শেরাওয়াত নাড়া বাঁধেন ছত্রশালে এসে। সেখান থেকেই প্যারিসের লম্বা রাস্তা পার করেছেন গত ১২ বছরে। যে সময়ে তাঁর জীবনে বয়ে গেছে নানা ঝড়। যা সামাল দিয়েও তিনি আজ অলিম্পিক পদকজয়ীর তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছেন। হয়তো এখনই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার কোনও সময় নেই। কিন্তু খানিকটা বেনিয়ম তো এক-দুইদিন করাই যায়। তাই বাউট শেষে তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয়, এতদিন ফোন থেকে দূরে ছিলেন? কিছু খেতে পারেননি পছন্দের খাবার। তাহলে এখন কি ফোনের ব্যবহার করবেন? আর কি খেতে ইচ্ছা করছে? লাজুক হাসি ২১ বছরের তরুণের মুখে, ‘ফোন আমার চাই না। তবে কাজু কাতলি (কাজুর বরফি) খেতে ইচ্ছে করছে।’ পাশে বসা কোচের মুখেও তখন প্রশ্রয়ের হাসি। কুস্তির বাইরে আর কী ভালো লাগে? এবার যেন অন্দরের শিশুটাই বেরিয়ে আসে আমন শেরাওয়াতের ভিতর থেকে, ‘জেঠালালের কাণ্ডকারখানা দেখতে দারুণ লাগে। আমি তারক মেহতা কা উল্টা চশমাই দেখি খালি সময় পেলে।’


আমনের ব্রোঞ্জ পদক জয়ের ম্যাচ দেখতে এসেছিলেন পিটি ঊষা। তাঁর কাছে পরে নিয়ে যাওয়া হলে দুজনের ছবি নিতে হুড়োহুড়ি। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার পর পাশে দাঁড়িয়ে যখন ছবি তুলছেন তখনও বড় স্বাভাবিক মুখচোখ আমনের। যা দেখে ঊষার মতো মানুষও নিজের পদের গাম্ভীর্য ভুলে তাঁর নিজস্ব ভাঙাচোরা হিন্দিতে বলে ফেলেন, ‘থোরা তো হাস লে। আজ তো তেরা হি হাসনে কা দিন হ্যায়।’ পরে আমনকে এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তাঁর মন্তব্য, ‘হাসছি না বটে তবে ভিতরে ভিতরে খুবই খুশি। অন্দর সে হাস রাহা হুঁ।’ হয়তো জীবনযুদ্ধের লড়াইটাই তাঁর অন্দরের হাসি, উচ্ছ্বাস আর বাইরে প্রকাশ করতে দেয় না আমনকে। মাত্র ১২ বছর বয়সের মধ্যে পরপর প্রথমে মা এবং পরে বাবাকে হারানোর যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় তাঁকে। পরিবারের অন্যরা খেতিবাড়ি ভাগাভাগি করে নেয়। খুব অল্পই জমিজমা ও পয়সা থেকে গিয়েছিল আমনদের কাছে। তার আগেই অবশ্য সুশীলকে রুপো জিততে দেখে ওই ১০ বছরের ছেলেটা শপথ নিয়েছিল, দেশের হয়ে সেও একদিন পদক জিতবে কুস্তিতে। দৃঢ়তা এবং মানসিক জোর একজন মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, আমন যেন তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। ঝাজ্ঝরের বিরোহার গ্রামের এই তরুণকে তাঁর বাবা সমবীর শেরাওয়াত প্রথম নিয়ে যান ছত্রশালে। স্ত্রীর মৃত্যু ও আরও নানা পারিবারিক বিপর্যয়ের পরেও তিনি ছেলেকে কুস্তি থেকে সরিয়ে নিয়ে আসার কথা কখনও ভাবেননি। ঠিক একইভাবে তাঁর মৃত্যুর পরে আমনের ঠাকুরদা মাঙ্গেরামও একরোখা মনোভাব নিয়ে নাতিকে রেখে দেন ছত্রশালেই। যেখানে এই কুস্তিগিরের বিছানার পাশে লেখা থাকে, ‘এটা যদি সহজ কাজ হত তাহলে সবাই এটাই বেছে নিত।’ পারিবারিক এই স্বপ্নই বড় হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে আমনকে। তাই হয়তো আমনকে যখন প্রশ্ন করা হয় এবার কি তবে ছত্রশাল ছেড়ে বড় বাড়িতে চলে যাবেন? তখন তাঁর উত্তর, ‘কীসের বড় বাড়ি? কোথাও যাব না। ছত্রশালের ওই ছোট ঘরটাই আমার ভালো লাগে। ওখানেই থাকব।’
সুশীল, যোগেশ্বর দত্ত, বজরং পুনিয়া, রবি দাহিয়াদের মতো অলিম্পিক পদকজয়ীরা সকলেই উঠে এসেছেন ছত্রশাল থেকে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল আমনের নামটাও। এঁদের সবার সঙ্গে ট্রেনিং করেছেন, এঁদের সবার কাছ থেকে শিখেছেন তিনি। এমনকি টোকিও অলিম্পিকের রুপোজয়ী রবিকে হারিয়েই প্যারিসের টিকিট জোগাড় করেন ভারতের একমাত্র পুরুষ কুস্তি প্রতিযোগী এবং শেষপর্যন্ত তিনিই একমাত্র সফল। আর এখান থেকেই শপথ নিয়ে গেলেন ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে সোনা জেতার। শুধু তাই নয়, কথা দিলেন ২০৩২ অলিম্পিকেও পদক এনে দেবেন দেশকে। জেদই তাঁকে বিপর্যয়ের রাস্তায় ঠেলে ফেলে না দিয়ে সাফল্যের সরণি দেখিয়েছে। সেই জেদই হয়তো তাঁকে বিশ্বের সেরা করে তুলবে একদিন।

