বাংলামাধ্যমের পড়ুয়া বনাম ইংরেজি ভীতি

শেষ আপডেট:

জাকির হোসেন
(সহ শিক্ষক, চ্যাংরাবান্ধা উচ্চবিদ্যালয়, কোচবিহার)

‘মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ স্বরূপ, এই কথা অন্য ভাষাভাষী মানুষকে যতটা প্রভাবিত করেছে, বোধকরি তার থেকে হাজারগুণ বেশি প্রভাব ফেলেছে আমাদের অর্থাৎ বাঙালিদের ওপর। বাংলামাধ্যম বিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসাবে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি, একটা বড় অংশের বাংলাভাষীর ‘জানেন দাদা আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না’ জাতীয় মানসিক অবস্থান। যখন দেখি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ইংরেজিমাধ্যমে সন্তানকে ভর্তি করাতে ব্যতিব্যস্ত, তার কারণ খুঁজতে গিয়ে উঠে আসে বেশ কয়েকটি দিক। এরমধ্যে অন্যতম, ইংরেজি ভাষায় উচ্চশিক্ষার প্রভূত সুযোগ, বিশ্বের কর্মবাজারে নিজেদের যোগ্য হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা, অত্যাধুনিক বিশ্ব সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ইত্যাদি।

তর্কের খাতিরে যদি আমরা অন্য দিকগুলো বাদও দিই, তবু বোধহয় একথা কেউ অস্বীকার করবেন না যে, একটি ছাত্র বা ছাত্রী ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারলে তার কাজের পরিধি অনেকটা বেড়ে যায়। বাংলামাধ্যমের অতি বড় সমর্থক হয়েও দেখেছি সহজে এখানকার অধিকাংশ পড়ুয়ার ইংরেজি ভাষার ওপর দখল আসে না। এক্ষেত্রে মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায়, আত্মবিশ্বাসের অভাব। বাংলামাধ্যমে পড়াশোনা করেও কীভাবে ওই ভাষায় নিজের আত্মবিশ্বাসের ভিত মজবুত করা যায়, তা নিয়ে এই প্রতিবেদন।

যে কোনও শিক্ষাই একটি সামগ্রিক প্রচেষ্টার ফসল। ইংরেজি ভাষা শেখা বা এই ভাষা ব্যবহারে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার পথে বাবা-মা, শিক্ষক, বন্ধু, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, সমাজ- সকলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ, কিছু ক্ষেত্রে পরোক্ষ।

পড়ুয়াদের দায়িত্ব:

বাংলামাধ্যমে বেশিরভাগ পড়ুয়ার ইংরেজির প্রতি প্রচণ্ড ভীতি থাকে। এর কারণ অনেক। ব্যাকরণে দুর্বলতা, শব্দভাণ্ডারের (ভোকাবুলারি) দৈন্যদশা, প্রথমেই নির্ভুল ইংরেজি বলার চেষ্টা এবং সেটা সম্ভব না হলে হাল ছেড়ে দেওয়া ইত্যাদি। পড়ুয়াদের মাথায় এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে রয়েছে যে, গ্রামারের সঠিক প্রয়োগ না জানলে ইংরেজি বলা সম্ভব নয়। অথচ আমরা যদি দেখি একজন ইংরেজিমাধ্যমের পড়ুয়া যখন অনর্গল ইংরেজি বলে, সে কিন্তু সবসময় নির্ভুল ব্যাকরণের তোয়াক্কা করে না। অথচ আত্মবিশ্বাস থাকে ভরপুর। অর্থাৎ, বেশি ব্যাকরণ নির্ভরশীলতা ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমার মতে, ইংরেজি গ্রামার শেখার চেষ্টা অত্যন্ত জরুরি। তবে ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে আবশ্যিক নয়।

এছাড়া তোমাদের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে হবে। কীভাবে আয়ত্ত করবে? বই পড়ার সময় নতুন শব্দ চোখে পড়লেই তা অর্থ সহ আলাদা করে নোট করতে হবে। শিখে নিতে হবে তৎক্ষণাৎ। রোজ অন্তত ১০ থেকে ১৫টি নতুন শব্দ শেখো। ইংরেজি সংবাদপত্র সম্ভব হলে পড়ো, টিভি কিংবা ইউটিউবে ইংরেজি খবর মাঝেমধ্যে শুনতে পারো। সবশেষে তোমাদের জন্য একটাই পরামর্শ, যখন যেখানে থাকবে, বিশেষত ইংরেজি ক্লাসে ইংরেজিতে কথা বলা অভ্যেস করতে হবে। সেটা শিক্ষক-শিক্ষিকার সঙ্গেই হোক বা বন্ধুদের সঙ্গে।

বিদ্যালয়ে খোলা মনে ইংরেজিতে কথা বলার একটা পরিবেশ তৈরি করতে পারলে পড়ুয়াদের সুবিধা হয়। প্রথম প্রথম ভুল হবে, সেটা শুধরে দেবেন শিক্ষকরা। একসময় ওদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জন্মাবে। কেটে যাবে ভীতি।

শিক্ষক-শিক্ষিকা হিসেবে করণীয়:

যারা সরকারি বাংলামাধ্যম বিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়াই, সকলের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা রেখে বলছি, একবার ভাবুন তো আপনার বিষয় বাদে অঙ্ক-বাংলা-ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞানের শিক্ষকরা তো বাংলাতেই পড়ান। তাঁদের ইংরেজিতে কথা বলার প্রয়োজন পড়ে না। অথচ ইংরেজি পড়াতে গিয়েও আমরা অনেক সময় বাংলা ভাষাকেই মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লেকচার মেথড-এ পড়াই, একবার ইংরেজিতে পড়ে পুরো ব্যাখ্যা বাংলাতেই করি। প্রশ্ন করছি বাংলায়। এতে পড়ুয়াদের ইংরেজি শেখার সুযোগ কিন্তু কমে যায়। অন্যদিকে, ক্লাসে কোনও ছাত্র ইংরেজি বলতে গিয়ে যদি ভুল কিছু বলে ফেলে, তাকে তাচ্ছিল্য করা হয় অনেক সময়।

এই পদ্ধতিতে পাঠদান চলতে থাকলে পড়ুয়াদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন প্রায় অসম্ভব। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে পড়ুয়ারা ইংরেজিকে ভয় পাবে না। বাকি বিষয়গুলির মতোই স্বাভাবিকভাবে ভাষা শিখবে। ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষিকারা যদি বেশিরভাগ সময় ইংরেজিতে কথা বলেন, ছাত্রছাত্রীদেরও ওই ভাষায় উত্তর দিতে উৎসাহ দেন, তাহলে ভাষা নিয়ে ভীতি কাটবে।

পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ভূমিকা:

পড়ুয়ারা ক্লাসের বাইরেও দীর্ঘসময় বিদ্যালয়ে থাকে। আমি লক্ষ করেছি, পড়ুয়ারা নিজেদের মধ্যে অন্য সময় ইংরেজিতে কথা বলা তো দূরের কথা, শুদ্ধ বাংলাতেও ভাবের আদানপ্রদান করে না। বাড়িতে যে ভাষায় কথা হয়, সেটাই তারা বলে বিদ্যালয়ে। বাবা-মা লক্ষ রাখবেন, বাড়িতেও যেন ছেলেমেয়েরা দিনের কিছু সময় ভাই-বোন বা দাদা-দিদির সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলে। এতে উভয়ের উপকার হবে।

পরিশেষে একটা কথা বলতেই হয়, একটি ছেলে বা মেয়েকে ইংরেজিতে সবসময় কথা বলতে হবে, এটা আবশ্যক নয়। যে কোনও ভাষায় সে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। তবে যে অভিভাবক বা শিক্ষক-শিক্ষিকা মনে করি, আমাদের সন্তান বা পড়ুয়াকে মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজিতেও সমান পারদর্শী বানাব, তাঁদের একটু বাড়তি দায়িত্ব তো নিতেই হবে।

Sourav Roy
Sourav Royhttps://uttarbangasambad.com
Sourav Roy is a seasoned Journalist with over a decade of experience in the media industry since 2013. Currently based in Siliguri, he serves as the Head of Digital Operations at Uttarbanga Sambad, where he has been leading digital initiatives since March 2019. With a proven track record in leading media houses, Sourav specializes in digital news management and regional journalism in West Bengal.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

মহাকাশ রহস্য ও ম্যাজিক শো

মালদা কলেজের আইকার্ড সেন্টার এবং ফিজিক্স বিভাগের ব্যবস্থাপনায় একটি...

পায়ে পায়ে ৭৫-এ ত্রিমোহিনী প্রতাপচন্দ্র উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়

  বিধান ঘোষ দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হিলি থানার অন্তর্গত ধলপাড়া-৩...

শৈশব রঙিন হোক আপনার সংস্পর্শে

আজ শিশু দিবস। সময় বদলেছে, বদলেছে আচার-আচরণ। শিশুদের বড়...

২৫ বছর পূর্তিতে দুশ্চিন্তা শিক্ষক সংকটে

কৌশিক দাস জলপাইগুড়ি জেলার ক্রান্তি ব্লকের লাটাগুড়িতে একটি উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের...