- ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
কাঠমান্ডু পরিক্রমায় প্রথমেই পশুপতিনাথ দর্শনে বেরিয়ে পড়ার রীতি। এই ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট থিকথিক করে পর্যটকে। সবসময়। মন্দিরের বিশাল চত্বর অজস্র মন্দিরে ছয়লাপ। কাঠের সূক্ষ্ম কারুকার্য আর প্যাগোডা স্টাইল বেশ অভিনব এবং স্বতন্ত্র। অনন্য এক মাত্রা মন্দির স্থাপত্যে। মূল মন্দিরে কালো পাথরের তৈরি শিবলিঙ্গ। কারও মতে লিচ্ছবিরাজ সুপুষ্পদেব এই প্রাচীন মন্দিরের নির্মাতা। সেখানে বিশাল লাইনে দর্শন এবং পুজো দেওয়া। দেশের অন্যান্য মন্দিরের মতোই সেই লাইন ক্রমশই দীর্ঘায়ত হয়। ডালা কিনে পান্ডার ফাঁদে না পড়লে ভালোভাবে কোনওটাই হবে না। তবুও দর্শন হল সে যাত্রায়।
মন্দিরের গায়ে বাগমতী নদীর তীরে শ্মশানে কারও না কারও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার চিতা জ্বলছে সর্বক্ষণ। মজে যাওয়া বাগমতী নদীর সেতু পেরোতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম দু’ধারে নেপালি মেয়েরা পুঁতির হার, চুড়ির পসরা সাজিয়ে বসে আছেন।
পশুপতিনাথে প্রণাম জানিয়ে আমাদের গন্তব্য তখন নেপালের অন্যতম সুপ্রাচীন গুহ্যেশ্বরী পীঠ। দেবী ভাগবত পুরাণের ‘গুহ্যকাল্যা মহাস্থানং নেপালে যৎ প্রতিষ্ঠিতম’ সতীমায়ের থান। পশুপতিনাথের খুব কাছেই নেপালের অন্যতম এই শক্তিপীঠ যেখানে দেবী গুহ্যেশ্বরী প্রতিষ্ঠিত। বাগমতী নদীর এপারে পশুপতিনাথ, ওপারে গুহ্যেশ্বরী। পুরুষ পশুপতিনাথের প্রকৃতিও বলা হয় গুহ্যেশ্বরীকে। দক্ষযজ্ঞের সময় সতীর দেহত্যাগের ফলে তাঁর জননাঙ্গ এখানে পতিত হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে রাজা প্রতাপমল্ল এই মন্দিরের নির্মাতা। দর্শন করতে গিয়ে দেখি আমাদের কামাখ্যা মন্দিরের মতো একটি পাথরের ওপর দিয়ে জলধারা বয়ে চলেছে মন্দিরের গর্ভগৃহে। দেবী এখানে স্বর্ণ ও রৌপ্য এই দুই স্তর দ্বারা আবৃত একটি কলসে পূজিতা। মূল মন্দিরটি একটি খোলা প্রাঙ্গণের কেন্দ্রে। এর চূড়ায় চারটি সোনালি সর্প। পীঠ নির্ণয়তন্ত্র মতে হিন্দুধর্মের ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম হল নেপালের এই মহামায়া গুহ্যেশ্বরী। সেখানেও দেবীর ভৈরব পশুপতিনাথের মাহাত্ম্য কীর্তিত আছে। শিবচরিত মতে, এখানে দেবীর দক্ষিণ জঙ্ঘা পতিত হয়েছিল। ‘নেপালে পড়িল জঙ্ঘা কপালী ভৈরব
দেবী তার মহামায়া সদা মহোৎসব।’ এই শক্তিপীঠের তীরেই উত্তরদিকে প্রবাহিণী বাগমতী নদী এবং সংলগ্ন আর্যঘাট মহাশ্মশান।
নব বজ্রযানী বৌদ্ধরা গুহ্যেশ্বরীকে বজ্রবারাহী রূপী পবিত্র বজ্রযোগিনী দেবী হিসেবে মনে করেন যার অবস্থান নেপালের স্তূপ ধারণকারী স্বয়ম্ভুনাথে, পৌরাণিক পদ্মের মূলে এবং যা নাকি কাঠমান্ডুর প্রাকৃতিক নাভিরজ্জু রূপে কথিত।
পড়শি দেশ নেপালের সঙ্গে আমাদের অনেক মিল। রাস্তায় এলোমেলো যানজট, বিস্তর গাড়ির ভিড় আর সেইসঙ্গে বিক্ষিপ্তভাবে মানুষজনের ভিড়। আবার মন্দির, থান এসব যাওয়ার পথও বেশ ছমছমে ও নির্জন। এককথায় সেই মন্দিরময়তায় আচ্ছন্ন হয়ে মানসিক প্রশান্তি আসে যা নির্মল নির্ঝরিণীর মতো সুবাতাস দেয়। সিঁদুর লেপা, জলে জলময় গুহ্যেশ্বরী থানে পুজো চড়িয়ে বিখ্যাত বুড়া নীলকান্ত মন্দির চত্বরে পা দিয়েই তেমন অনুভূতি হল।
এরপর নেপালের অন্যতম প্রাচীন বিষ্ণুমন্দির বুড়া নীলকান্ত দর্শন। শৈব-শাক্ত যুগ যুগ ধরে নেপালকে বাঁচিয়ে আসছে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে, এমনই বিশ্বাস মানুষের আর সবটাই গুহ্যেশ্বরী আর পশুপতিনাথের দয়ায় বলে সবাই মনে করেন। তাই প্রথমে ভেবেছিলাম এই বুড়া নীলকান্ত বুঝি নীলকণ্ঠ শিবের মন্দির হবে। তারপর দেখি নীলকান্ত অর্থাত নবদুর্বাদল শ্যাম তো নারায়ণের আরেক নাম। আর বুড়ার অর্থ বৃদ্ধ। সত্যিই তিনি প্রাচীন। কাঠমান্ডু উপত্যকার উত্তরদিকে শিবপুরী পাহাড়ের নীচে এই মন্দির। এখানে কুণ্ডের মধ্যে শায়িত নারায়ণের মূর্তিটি নেপালের অন্যতম বৃহত পাথরের স্থাপত্য। পাঁচ মিটার লম্বা একটিমাত্র ব্ল্যাক স্টোনের তৈরি অপরূপ বিষ্ণু মূর্তিটি ভেসে আছে ১৩ মিটার লম্বা একটি পুকুরের জলের মধ্যে। এটি যে কুণ্ডলীকৃত শেষনাগের ওপর বিষ্ণুর অনবদ্য অনন্ত শয্যা বর্ণিত তা বুঝতে অসুবিধে হয় না।
স্থানীয় জনশ্রুতি বলে বহুযুগ আগে এক কৃষক দম্পতি জমিতে হাল দিতে গিয়ে লাঙলের ফলায় রক্ত দেখে চমকে ওঠে। তারপরেই মাটি খুঁড়ে এই মূর্তি আবিষ্কৃত হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর রাজা বিষ্ণুগুপ্তের আমলে লিচ্ছবিরাজ ভীমার্জুন দেবের জন্য এই মূর্তি বর্তমানে যেভাবে, যে অবস্থায় রয়েছে। তবে অনন্তকাল ধরে জলের ওপরে বিষ্ণুর অনন্ত শয্যায় ভেসে থাকা নিয়ে প্রচুর গবেষণা চললেও মেনে নেওয়া হয় খুব স্বল্প ঘনত্বের সিলিকা বেসড লাভা স্টোন দিয়ে নির্মিত বলেই এমনভাবে জলের ওপরে ভাসমান তিনি। নেপালের ওপর দিয়ে অনেক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঢেউ আছড়ে পড়লেও এই রাজকীয় মূর্তিটি আজও অক্ষত এবং অটুট।
নারায়ণকে প্রণাম জানিয়ে গাড়িতে উঠে মনে পড়ল আষাঢ়ের শয়নী একাদশীর মাহাত্ম্য। এর নামই বিষ্ণুর মহাশয়ন। মানুষের বিশ্বাস মেঘরূপে ভগবান বিষ্ণু সর্বত্র বারিবর্ষণ করেন যা থেকেই অন্ন আর জীবের জীবন ধারণ। তা সে পুরাণের গল্পে ঋষি অঙ্গিরা আষাঢ় মাসের এই একাদশী ব্রত পালনের কথা যতই বলুন, এই ব্রতের প্রভাবে বৃষ্টি আর বৃষ্টির প্রভাবে আমাদের চাষাবাদ হোক আর না হোক নেপালের শৈব-শাক্ত-বৈষ্ণব ঐতিহ্যের কথা অনুরণিত হতে থাকল কেবলই। নারায়ণের ঘুম হয়তো ভাঙে চারমাস বাদে। সারাদেশ জুড়ে ভরাবর্ষায় বিষ্ণুর উপাসকেরা চাতুর্মাস্য ব্রত করেন। ততক্ষণ শরতের মেঘমুক্ত আকাশের অপেক্ষায়। দেবলোকের অকালবোধনে জাগরণ হয় নারায়ণ সহ সব দেবতার।



