- সৌগত ভট্টাচার্য
হেমন্ত শেষে হাইওয়ের ধারে হলদে-সবুজ ধানখেতের ম্যাজিক-রং প্রতিদিন একটু একটু করে বদলাতে শুরু করে। তারপর একদিন বিকেলে অঘ্রানের ধান কাটা মাঠের রং আর সূর্যের রং এক হয়ে যায়। মাঠের মাঝে ছাতার মতো বিরাট পাকুড় গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকে একটা চারচালা মন্দির।
শূন্য ধানখেত, মন্দির আর আকাশ- তিনজন দিগন্তরেখার সীমানায় এসে দাঁড়ায়। খুব পরিচিত এই শীত-ফ্রেমজুড়ে লেগে থাকে এক অদ্ভুত এক মায়া জড়ানো বিষণ্ণতার রং। অঘ্রানে সন্ধ্যা নামলে তিস্তা নদী থেকে বয়ে আসা বাতাসের গন্ধ পালটে যায়। এই গন্ধ শীতের নিজস্ব! মাঠঘাট পথ খাল বিল নিয়ে যে অসীম চরাচর, সে একটা হালকা কুয়াশা-রঙের আলোয়ান গায়ে জড়ায়। এই শীত-বিকেল যতটা শীতলতার, তারচেয়ে অনেক বেশি উষ্ণতাকাঙ্ক্ষী।
পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে। লেপাপোঁছা উঠোনে চালগুঁড়ো দিয়ে আঁকা নবান্নের আলপনার ওপর সন্ধ্যার হিম আর খানিকটা জ্যোৎস্না পড়ে। বিকেলের ধূসরতা কেটে গেলে নতুন চালের পিঠে পুলি পায়েসের গন্ধে ভরে যায় গৃহস্থের ঘরদোর। যুগ যুগ ধরে এত সামান্য উপকরণে বানানো পায়েস পিঠে পুলির স্বাদ প্রতি বছর শীতে নতুন করে বিস্মিত করে জিভের পুরোনো স্বাদকোরকদের! লোকাল বেকারির নরম সেলোফেন মোড়ানো কেকের গন্ধ মফসসল শহরে শীতকাল নিয়ে আসে। এইসব কাণ্ডকারখানা আমাদের পরিচিত আকাশতলেই ঘটে চলে আবহমান কাল ধরে… পৃথিবীকে বড় মায়াময় লাগে!
শীতের রাতগুলো নিঃশব্দে হিমের মতো নেমে আসে। হিমকে রাতের খুব কাছেরজন বলে মনে হয়। শীতের রাত নামার একটা সুর আছে, ছন্দ আছে, লয় আছে। দিনের আলোর কাছ থেকে কিছুটা সময় কেড়ে নেয় দীর্ঘ রাতগুলি। শীতল রাতে বহুদূর থেকে একটা আবছা গান ভেসে আসে। রাত বাড়লে কুয়াশারা জাদুকর হয়ে ওঠে। যত রাত বাড়ে গানের শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়, যেমন শোনা যায় দূর স্টেশন দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়ার শব্দ। দূরে কোনও জলসায় কিশোর কণ্ঠি গায়ক তার গলার কুয়াশার যাবতীয় পর্দা সরিয়ে গাইছেন, ‘ইয়ে সাম মস্তানি…।’ একটা সময় ছিল যখন রাত্রিবেলায় লেপের তলায় ঢুকলে ঘুমের আগে লালকমল নীলকমল আসত, তারপর ঘুম আসত। আজকাল তারা আর আসে না। এখন শীতের রাতে কিশোরকুমার, আরডি আসেন। অর্কেস্ট্রায় সেই গানের মাঝে যখন শুধুই গিটার বাজে, মনে হয় রোদেলা দুপুরে ধুনকর তার ধুনানির তার বাজিয়ে পাড়া দিয়ে চলে যাচ্ছে…
আরও অনেক কিছুর মতো লালকমল নীলকমল তার স্বপ্ন নিয়ে; ধুনকর তার ধুনানি নিয়ে শীতের দেশ ছেড়ে কোথায় যে চলে গেছে আর জানা হয়নি!
অনেক দূরে চলে গেছে… সেই স্টিম ইঞ্জিন টানা প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি। যেটা সকালবেলা সিগন্যালের অপেক্ষায় সবুজ মফসসল টাউন স্টেশনের আউটারে দাঁড়িয়ে অক্লান্ত হুইসল দিত, তার সাদা ধোঁয়া আর কুয়াশা মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। শীতের রোববার হাঁড়ি কড়াই বাসনপত্র সমেত পৌঁছে দিত আমবাড়ি ফালাকাটায়। সেখানে শীর্ণ এক নদীর পাড় ছিল স্বপ্নের পিকনিক স্পট। সন্ধেবেলায় সেই ট্রেনটিই যখন হুইসল বাজিয়ে জলপাইগুড়ি স্টেশনে ফিরত, স্টেশনের নরম হলুদ আলো তখন কুয়াশায় ঢেকে গেছে। যাত্রীদের নামিয়ে অঘ্রানের শিশিরভেজা ফাঁকা মাঠ, ঠান্ডা হাওয়ায় একা দাঁড়িয়ে থাকা চারচালার মন্দিরের পাশ দিয়ে ট্রেনটি আস্ত একটা শীতকালকে নিয়ে কোথায় যে চলে গেল…
মাঙ্কি টুপি পরে কাঠের গ্যালারিতে বসে দেখা সার্কাসের সেই জোকারটি, যে প্রবল ঠান্ডায় গায়ে ঢোলা একটা জামা পরে আছে, যে জামায় হরেক রঙের কাপড়ের তালি লাগানো… সার্কাসের বাজনা বাজছে… সে দর্শককে হাসিয়ে যাচ্ছে। খেলা শেষে সেই খর্বকায় জোকার সাদা কাকাতুয়াটাকে বুকের কাছে টেনে নিত। দুজনের সামান্য উষ্ণতা বিনিময় হত কি না কে জানে! সেই জোকার আর আমার শহরে আসে না…
শূন্য করে চলে যাওয়ার পরও মরশুমি পাতার মতো কত ফিরে আসার অপেক্ষা মুখ লুকিয়ে থাকে জীবনজুড়ে! সেই কোন হিম যুগ থেকে কাশ্মীরি শালওয়ালা, পাহাড়বাসী টুপি-সোয়েটারওয়ালা, উত্তর ভারত থেকে আসা কম্বলের দোকানি ফিরে আসে আমাদের শহরে। ঠিক যেমন শীত পড়লে তিস্তার পাড় বা শাপলা ভরা দোমোহনির ঝিলে আসে পরিযায়ী পাখিদের দল। গরম কাপড়ের পসরায় শহরের ফুটপাথ হয়ে ওঠে রঙিন। সে এক ওম মাখানো আত্মীয়তার গল্প! উষ্ণতার ফেরিওয়ালার গল্প!
আসা-যাওয়ার মধ্য শীতের সবজি বাজারগুলো হয়ে ওঠে যেন একেকটা আস্ত ফ্লাওয়ার শো। পালং শাক ফুলকপি পিঁয়াজকলি মটরশুঁটি বিট গাজর টমেটোর রং যেন এক বিস্ময় শিশুর ড্রয়িং খাতা! সরু বনকুলের ঠোঙায় কিছুটা বিটনুন আর একটা আস্ত বড়দিন লুকিয়ে থাকে! একটা ছুটি লুকিয়ে থাকে!
উল কাঁটা দিয়ে বোনা সোয়েটারের দুই ঘরের ভেতর কত যে রোদে পিঠ দেওয়া শীতের দুপুর, কত গান, কত গল্প গচ্ছিত থাকে — কে কার চোখে কমলালেবুর খোসার রস দিয়ে পালিয়েছিল সবুজ মাঠের দিকে; ছক্কা মেরে মাঠ পেরিয়ে যখন হালকা সবুজ বল হারিয়েছে পাশের বাড়ির ঝোপঝাড়ে, বল খুঁজতে টুপ করে কখন যে সন্ধে নেমে গেছে… সেই টেনিস বল যখন পরের দিন সকালে খুঁজে পাওয়া গেল দেখা গেল শীতকাল খুব ভোরবেলা তার গায়েও বিন্দু বিন্দু শিশিরের চিহ্ন রেখে গেছে। অন্ধকার নামলেই হলুদ বালবের আলোয় ব্যাডমিন্টনের শাটল কক ওড়ে পড়ার আকাশে। ঠিক কতটা ওপরে? যতটা ওপর থেকে হিম পড়ে? শাটল কক থেকে ছিঁড়ে যাওয়া একটা দুধসাদা পালক হিমের সঙ্গে ভাসতে ভাসতে নামে শীতকালের বুকে!
সব খেলা শেষ হলে শীতের রাতে চৌমাথার উঁচু আলোর স্তম্ভ বেয়ে কুয়াশা নেমে আসছে। কুয়াশায় অচেনা হয়ে যাওয়া শহরে দুই হাত দূরের মানুষকে চেনা দায়। কনকনে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় রাস্তার ধারে পড়ে থাকা সামান্য কাঠ কাগজ দিয়ে আগুন জ্বালিয়েছে একজন। আগুনের শিখা দেখে আরও কয়েকজন পথচারী বাইক আরোহী দাঁড়ায়। একটু একটু করে লোকসংখ্যা ও হাতের সংখ্যাও বাড়ে। আগুন ঘিরে উবু হয়ে বসে পড়েছে কয়েকজন। এমন কুয়াশাঘেরা শীতল রাতে সামাজিক রাজনৈতিক ধর্মীয় অর্থনৈতিক সব পরিচয় ছেড়ে, পথচলতি মানুষ রাস্তার ধারে জ্বলে থাকা আগুন, থুড়ি উষ্ণতার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। ঠিক যেমন করে মন্দিরের আরতি শেষে মানুষ প্রদীপের শিখার দিকে হাত বাড়ায় বেঁচে থাকাকে আরেকটু উষ্ণ করে তুলতে!
জঞ্জাল-পোড়া আগুনের শিখায় আগুন পোহানো পথচারীরদের মুখগুলো আলোকিত হয়ে ওঠে, ঠিক যেমন করে মসজিদ বা গির্জার মোমের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মুখমণ্ডল!
নবান্নের দেশে শীত-পার্বণ পালিত হয়…

