দুঃসময়ে আশা জোগান দুই মা

শেষ আপডেট:

  • আশিস ঘোষ

রাজিয়া পারভিন। পাকিস্তানের পাঞ্জাবের মুলতানের খানেওয়াল জেলার মিয়া চান্নু নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামের গৃহবধূ। আট সন্তানের মা। সে গ্রামে না আছে নির্ভরযোগ্য জলের ব্যবস্থা, না আছে বিদ্যুতের সরবরাহ। কিছু বছর আগেও কৃষিপ্রধান এই জেলায় উন্নয়ন বলতে কিছুই ছিল না। থাকার মধ্যে করাচি থেকে লাহোর যাওয়ার জিটি রোড।

সরোজ দেবী। এপারে হরিয়ানার পানিপথের খান্দরা গ্রামের আরেক গৃহবধূ। ছেলের দৌলতে ঝকঝকে বাড়িতে গাড়ি রয়েছে বাছাই করা। আছে পোষ্য গোল্ডেন রিট্রিভার। আছে কয়েকটা দামি বাইক। তারই মাঝখানে বেমানান এই তিন সন্তানের জননী, কপালে ছোট বিন্দি আর কানে অতি সাধারণ একজোড়া দুল ছাড়া আর কোনও দেখনদারি নেই।

এপার পঞ্জাব, ওপার পাঞ্জাবের এই দুই রমণীকে একই সুতোয় বেঁধে দিয়েছে প্যারিস অলিম্পিক। একজন জ্যাভলিন ছোড়ায় সোনাজয়ী আর্শাদ নাদিমের মা। অন্যজন পেটে ধরেছেন রুপোজয়ী নীরজ চোপড়াকে। কাঁটাতারের দুই পারের দুই মা। দেশ তাঁদের আলাদা। দুই দেশের মধ্যে আদৌ সদ্ভাব নেই। বরং পড়শি দুই দেশের সীমান্তে রয়েছে সঙিন উঁচিয়ে অষ্টপ্রহর পাহারা।

প্যারিসে দেশবাসীকে খানিকটা হতাশই করেছেন নীরজ৷ সোনা পাননি। এই মরশুমে সেরা পারফরমেন্স করেও ৯০ মিটারের স্বপ্ন ছুঁতে পারেননি নীরজ। জ্যাভলিন ছুড়েছেন ৮৯.৪৫ মিটার। আর আর্শাদ ছুড়েছেন রেকর্ডভাঙা ৯২.৯৭ মিটার। তাতে খুশির বাঁধ ভেঙেছে এপারে ওপারে। পাশাপাশি দুই দেশের দুই খেলোয়াড় ভিকট্রি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে, এমন দৃশ্য এর আগে দেখা যায়নি কখনও। যে গ্রামে কোনও খেলাধুলোর ব্যবস্থা নেই, একটা চলনসই জ্যাভলিনও যেখানে দুষ্প্রাপ্য, সেখান থেকে উঠে এসেছেন পাকিস্তানের একমাত্র পদকজয়ী আর্শাদ।

আর্শাদের জয়ের পর তাঁর মিয়া চান্নু গ্রামে বিখ্যাত খুশি বরফি দেদার বিলি হয়েছে। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়েছেন মা রাজিয়া পারভিন। বলেছেন, হম খুশ হ্যায়। নীরজ ভি তো মেরা বেটা। হম দোনোকে লিয়ে খুশ হ্যায়। দোয়া করি, নীরজ আরও ভালো করুক। কী আশ্চর্য,  এপারের আরেক মা সরোজ দেবীর গলাতেও একই সুর। ‘যে সোনা পেয়েছে সেও আমার ছেলে। যে রুপো পেয়েছে সেও।’ সরোজের কথায়, দুজনেই তো অ্যাথলিট। দুজনেই প্রচুর খেটেছে। আর্শাদও খুব ভালো। আমার কাছে নীরজ আর আর্শাদের মধ্যে কোনও ফারাক নেই। দুজনে খুব ভালো বন্ধু।

এখনকার ঘন কালো দুশমনির জমানায় দুই মায়ের মনের কথা চমকে দেয় বৈকি! চারিদিকে ঘৃণা আর বিদ্বেষের দমবন্ধ আবহাওয়ায় রাজিয়া পারভিন আর সরোজ দেবী একপশলা খোলা হাওয়া। এক সীমান্তে যখন সবসময় বৈরিতা আরেক সীমান্তে তখন চরম অস্থিরতা। এতদিনের বন্ধু দেশে এখন অবিশ্বাসের ঘন আঁধার। সেখান থেকে যেমন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার খবর আসছে, তেমনই আসছে পালটা প্রতিরোধের খবরও। বহু জেলায় সংখ্যাগুরুরা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন মন্দির, মঠ, হিন্দুদের ঘরবাড়ি। সেখানেও অন্ধকারের ওপিঠে আছে আলোর আভাসও। মতলবি রাজনীতির উনুনে যারা নিজেদের রুটি সেঁকছে তাদের অন্যদিকটা চোখেই পড়ে না। সবকিছুই তাদের কাছে ভোটের অঙ্কে। আর কিছু তারা বোঝে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনর্গল বিষ উগরে দেওয়া হচ্ছে চব্বিশ ঘণ্টা। উদ্বাস্তু আর শরণার্থীর বিবাদে তারা কষে চলেছে রাজনীতির লাভক্ষতি। অন্য কথা কানেই যায় না এইসব ধর্মকারবারিদের। রাজিয়া পারভিন আর সরোজ দেবীর মতো এখন কে বলবে, ও তো হামারা ভি বেটা হ্যায়।

রবীন্দ্রনাথ ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশো। তখনও মানুষের বিবেকের কিছুটা অবশিষ্ট ছিল। এখন, এই দুঃসময়ে কার কাছে আমাদের আর্জি জানাব?

Categories
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

জটিল অর্থনীতি, সহজ পাঠ মোদির 

অনিরুদ্ধ দাশগুপ্ত সোনার গয়না কেনা বা নিজের গাড়িতে চেপে প্রতিদিন অফিসে...

রং পালটে ক্ষমতার কাছে ফেরার মরিয়া চেষ্টা

দীপ সাহা শিকারির হাত থেকে বাঁচতে, কখনও বা সঙ্গিনীর নজরে...

তৃণমূলিকরণ ঠেকানো কি আদৌ সম্ভব শমীকের?

গৌতম সরকার গৈরিকীকরণ স্বাভাবিক। কিন্তু দুয়ারে বিপদ তৃণমূলিকরণের! বিজেপির জন্য...

স্বৈরতন্ত্রের পতন তো সর্বত্র এভাবেই হয়

রূপায়ণ ভট্টাচার্য সান্ধ্য জাগো বাংলার ৩ মে’র শিরোনাম : কাল...