- রন্তিদেব সেনগুপ্ত
কলকাতার নেতাজিনগরের বাসিন্দা সাঁইত্রিশ বছর বয়সি দেবাশিস সেনগুপ্ত গত বৃহস্পতিবার আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর পরিবারের বক্তব্য, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ চালু হওয়ার পর দেবাশিস আতঙ্কে ভুগছিলেন। দেবাশিস তাঁর পরিবারের সদস্যদের বলেছিলেন, নাগরিকত্ব আবেদন করার জন্য যেসব কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে তা জোগাড় করা অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে এই দেশে থাকার অধিকার যদি তাঁরা হারান, তাহলে কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন? ভোটের মুখে সিএএ চালু করে যারা কিস্তিমাতের স্বপ্ন দেখেছে, সেই বিজেপি অবশ্য এই তরুণের আতঙ্ককে আমল দিতে নারাজ। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘যে কোনও কারণে আত্মঘাতী হতে পারে। এর সঙ্গে সিএএ’র কোনও সম্পর্ক নেই।’
বিজেপি নেতারা যা-ই বলুন না কেন, একথা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না যে, সিএএ নিয়ে প্রাথমিক উচ্ছ্বাস থিতিয়ে আসার পর মতুয়াদের একটি অংশের ভিতর এখন সিএএ-কে কেন্দ্র করেই আশঙ্কা ছড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার এই তরুণের আত্মঘাতী হওয়ার দু’দিন আগে, গত মঙ্গলবার একটি অনুষ্ঠানে উত্তর চব্বিশ পরগনার অশোকনগরের তিনজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। এঁরা তিনজনই পেশায় স্কুল শিক্ষক। এঁদের অনুরোধেই এঁদের নাম প্রকাশ করছি না। ধরে নেওয়া যাক এঁদের নাম অমল, বিমল এবং কমল। তিনজনই আলোচনার সময় বলেছিলেন, ‘সিএএ নিয়ে প্রথমে একটু উৎসাহিতই হয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি যা বলা হয়েছিল বিষয়টা আসলে তা নয়। এখন যে সব কাগজপত্র দেখাতে হবে বলা হচ্ছে, সে সব কাগজপত্র অনেকেরই নেই। যদি সে সব কাগজ দেখাতে না পারি তাহলে আমরা তো নাগরিকত্ব পাব না। সেক্ষেত্রে আমরা তো এ দেশে বেআইনি বসবাসকারী হয়ে যাব।’ এই তিনজনই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁরা নতুন করে নাগরিকত্বের আবেদন করবেন না। তাঁরা বলছেন, ‘আমাদের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সবই আছে। আমরা এদেশের নাগরিক বলেই নিজেদের মনে করছি।’
এর আগে গত শনিবার মতুয়া গড় বলে পরিচিত গাইঘাটা এবং বনগাঁয় মতুয়াদেরই একটি অংশ পথ অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। তারা মনে করছে, বিজেপি তাদের প্রতারণা করেছে। এদের বক্তব্য, ২০১৯ -এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দেবে। কিন্তু এখন সে কথা বলা হচ্ছে না। এখন বলা হচ্ছে যে দেশ থেকে আমরা এসেছি, সেখানকার স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট, জন্মের শংসাপত্র, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বাড়ি ভাড়ার রসিদ এরকম যে কোনও একটি প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। আমরা তো এক কাপড়ে দেশ ছেড়ে চলে এসেছিলাম। এখন এসব কাগজপত্র কোথায় পাব। এরপর প্রমাণ দিতে হবে যে যিনি আবেদন করছেন তিনি অত্যাচারিত হয়ে চলে এসেছেন। এসব প্রমাণে প্রশাসন সন্তুষ্ট হলে তবেই নাগরিকত্ব মিলবে। আর না হলে? তখন কি আমাদের জায়গা হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে? এই বিক্ষুব্ধ মতুয়ারা কলকাতায় বিজেপি নেতা তথাগত রায়ের বাড়ির সামনেও বিক্ষোভ দেখিয়েছে। কারণ, এই মতুয়াদের কাটা ঘায়ে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে কদর্য মন্তব্য করে নুনের ছিটে দিয়েছেন তথাগতবাবু।
সিএএ নিয়ে উচ্ছ্বাস কেটে যেতেই যে এরকম সন্দেহ এবং সংশয় দানা বাঁধবে এটা বিজেপি নেতৃত্ব ভাবতে পারেনি। তারা ভেবেছিল, চালাকির দ্বারা মহৎ কার্যসিদ্ধ করে ভোটের ময়দানে টেক্কা দেবে। গোড়া থেকেই সিএএ একটি চালাকিই ছিল বিজেপির কাছে। যে কারণে পাঁচ বছর ধরে সিএএ’র গাজর ঝুলিয়ে রাখার পর ঠিক ভোটের মুখটিতে আইনটি জারি করা হল।
এটা না বললেও বোঝা যায়, এর প্রধান উদ্দেশ্যটি হল, এই রাজ্যের মতুয়া ভোটটিকে কবজা করে উত্তর চব্বিশ পরগনা, নদিয়া এবং উত্তরবঙ্গের কয়েকটি লোকসভা কেন্দ্রে একটু সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা। দ্বিতীয়ত, হিন্দু আবেগটিকে ভোটের আগে আরও খুঁচিয়ে দেওয়া। বিজেপি নেতারা যা-ই বলুন, যারা এমন একটি আইন এনেছে তাঁদের আসল উদ্দেশ্যটি যে নাগরিকত্ব দেওয়া নয়, বরং একটি অংশের জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া, তা বোঝা গিয়েছিল যখন অমিত শা বলেছিলেন, ‘ক্রোনোলজি সমঝিয়ে। পহলে সিএএ, উসকি বাদ এনআরসি।’
প্রশ্ন হচ্ছে এই সিএএ এখন বিজেপির কাছে বুমেরাং হয়ে দাঁড়াচ্ছে না তো? ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে আরএসএসের দক্ষিণবঙ্গ প্রান্তের এক কার্যকর্তাকে এই রাজ্যেরই এক আইপিএস অফিসার সতর্ক করে বলেছিলেন, এনআরসি নিয়ে বেশি চ্যাঁচামেচি আপনারা করবেন না। সেটি আপনাদের বিপক্ষে যেতে পারে। ওই কার্যকর্তার কাছ থেকেই এটি শুনেছিলাম আমি। বিজেপি অবশ্য এই সতর্কবাণী শোনেনি। তার খেসারতও তাদের দিতে হয়েছিল।
এখন সিএএ-কে কেন্দ্র করে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে তার যথাযথ উত্তর কিন্তু বিজেপি নেতাদের কাছে নেই। একসময় বিজেপি নেতারা নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, কার্যক্ষেত্রে কিন্তু দেখা গেল কোনওভাবেই নিঃশর্ত নাগরিকত্ব প্রদান করা হচ্ছে না। বরং এমন সব নথিপত্র চাওয়া হচ্ছে, এক কাপড়ে ভিটেমাটি ছেড়ে আসা অনেক পরিবারের কাছে সেসব নথিপত্র নেই। একজন যখন এদেশে নাগরিকত্বের আবেদন করবেন, তখনই তাঁকে ঘোষণা করতে হবে তিনি ভারতীয় নাগরিক নন। এবার চাহিদামতো নথিপত্র না দিতে পারলে তাকে কি পুশব্যাক করা হবে? না, তাঁর স্থান হবে অসমের মতো ডিটেনশন সেন্টারে? এসব প্রশ্নের কোনও সন্তোষজনক জবাব কিন্তু নেই বিজেপি নেতাদের কাছে।
কয়েকজন বিজেপি নেতা অবশ্য হাস্যকর যুক্তি দিচ্ছেন। যেমন বিজেপি বিধায়ক অসীম সরকার। তিনি বলেছেন, ‘মতুয়ারা আইন বোঝে না।’ তাঁর নিদান, শান্তনু ঠাকুরের দেওয়া কার্ড দেখালেই আর অন্য নথিপত্র লাগবে না। প্রশ্ন উঠবেই, কোনও বিজেপি নেতার বিলি করা কার্ড সরকারি নথি নয়। তাহলে তা কেন গৃহীত হবে? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, কে নাগরিক থাকবে আর কে থাকবে না, তার ঠিকাদারিত্ব বিজেপি নেতাদের দিচ্ছে কে?
অমিত শা বলেছিলেন, ক্রোনোলজি সমঝিয়ে। এখন ক্রোনোলজি বোঝাতে গিয়ে তাঁর খেলাটাই না ভন্ডুল হয়ে যায়। আবার এ-ও দেখার, নরেন্দ্র মোদি-অমিত শা’রা নিজেরাই না বিস্মৃত হন সিএএ’র কথা। যেমনটি গত পাঁচ বছরে ছিলেন তাঁরা।



