- সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
মাটির পৃথিবীর কথা আর ভাবতে ইচ্ছা করে না। ইচ্ছে করে না তাকাতে। পৃথিবী বড় হতাশ করছে। মানুষের বেহিসেবি দাপটে বেঁচে থাকার আনন্দটাই নষ্ট হয়ে এসেছে। না আমরা ভালো আছি, না আমাদের প্রতিবেশীরা ভালো আছে। সীমানার ওপারের তিন প্রতিবেশী বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাও ভালো নেই মোটেই। ডামাডোল সর্বত্র। কেমন যেন মনে হচ্ছে, ধন-জন-অর্থ-প্রতিপত্তি-যশ-খ্যাতি-সিংহাসন-মসনদ-নেতৃত্ব— কোনও কিছুরই দাম নেই। মানুষ ভালোবাসা চায়, ভালোবাসা পেতে চায়। বিশাল মানবগোষ্ঠীকে নিয়ে একটা পরিবার গড়তে চায়। নিরাপত্তা চায়। এই মারামারি, কাটাকাটি, দেশসেবার নামে ভণ্ডামি, মুখে বলছে এক, করছে আরেক। এই সবই দেখতে দেখতে মনে হয়, মানুষের সমস্ত ব্যাপারটাই একটা বড় রকমের তামাশা। প্রাণী হিসাবে মানুষ খুব একটা উৎকৃষ্ট কিছু নয়। অকারণে নিষ্ঠুর। বোধ-বুদ্ধি শূন্য। আত্মম্ভর। কল্যাণ, অকল্যাণের ধার ধারে না। সবসময় অভিনয়। চরিত্র বলে কিছু নেই। যার সুযোগ আছে, সে কেবল নিজের কোলে ঝোল টেনে চলেছে।
অসুরের চরিত্র আছে, সে বীর। মনে-প্রাণের অধার্মিক। সে যা করে, তা বিশ্বাস করে। মানুষ অসুরও নয়, দেবতাও নয়। দেবতা হতে চায়, কিন্তু বিশ্বাস নেই, নিষ্ঠা নেই, সাধনা নেই। মানুষ হল অসুরের ক্রীতদাস। প্রবৃত্তির কাছে বিকিয়ে বসে আছে। নীচ সত্তা যে আদেশ করবে তাই পালন করতে বাধ্য। চারিদিকে এত হিংসা, এত দানবীয় দাপাদাপি চারপাশে, এত দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা, নির্যাতন, নিপীড়ন! কেন? ভারত নাকি পুণ্যভূমি, ধর্মের দেশ! অনেক পুণ্যফলে মানুষ এদেশে জন্মায়। এই পুণ্যভূমি তিন টুকরো হয়েছে সেই ’৪৭ সালে। ভাগের পরে কি আরও পাপে ভরে গিয়েছে টুকরো দেশগুলো!
জন্মের কথা হচ্ছিল। জন্মে কি হয়! জানোয়ার হয়। সারাটা জীবন বড় বড় কথা শোনে। প্রতিশ্রুতির ভারে নুয়ে পড়ে। সমস্যার পর সমস্যা। কোনও সমস্যারই সমাধান নেই। রাষ্ট্রযন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় মানুষকে কিছু দেবার জন্যে। নিরাপত্তা, সুস্থ জীবিকা, জীবনের সুস্থ বিকাশের পরিমণ্ডল, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাস্তাঘাট, যানবাহন, আলো, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, আইনকানুন। নির্বাচিত হবার আগে জনপ্রতিনিধিরা প্রতিশ্রুতির যে ফিরিস্তি তুলে ধরেন, তাতে বহু ভালো ভালো আশা জাগানোর কথা থাকে। গদিতে আরোহণ করে তাঁরা সব ভুলে যান। তখন দলবাজি ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। মানুষ তখন অবাক হয়ে দেখতে থাকে— যে-ই যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবণ। স্বজনপোষণই চলতে থাকে নানা নামে। এইসব দেখে দেখে আমাদের ধারণা হয়েছে, সব পার্টিই মরণে-অলা পার্টি। দাসখত লিখে দিয়ে যারা ঝান্ডা ধরতে পারবে তারাই দিনান্তে চিকেন-বিরিয়ানি পাবে। যারা পারবে না, তারা নির্যাতন সহ্য করবে।
একটা সর্বনাশা ভাবধারা আমাদের রাজনীতিতে প্রথম থেকেই এমনভাবে ঢুকে গিয়েছে, যার আর সংশোধন সম্ভব নয়। মানুষ যখন জলে-জঙ্গলে বসবাস করত, ট্রাইবাল ছিল, তখন যেমন দল ছিল, দলপতি ছিল, এ-দলে ও-দলে মারামারি হত, এখনও ঠিক সেই অবস্থাই চলছে। তখন লড়াই হত জায়গা-জমি নিয়ে, খাদ্য নিয়ে, নারীর দখল নিয়ে, এখন হয় গদির লড়াই, মতবাদের লড়াই নিয়ে। সেই একই ব্যাপার চলছে অন্য নামে। অন্যভাবে। দলের সমর্থক হতে হবে, না হলে জমির ফসল যাবে, বসতবাটী যাবে। প্রয়োজনে হাসপাতালে অ্যাডমিশন হবে না, নিজের থেকে শুরু করে ছেলেমেয়ের চাকরি জুটবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ মিলবে না। যার চাকরি আছে তাকে বদলি করা হবে। শয়ে-শয়ে প্রাণ গেলেও আপত্তি নেই।
দেশ একটা, দল অনেক। মতবাদ হল আইওয়াশ। অর্থনীতি, সমাজনীতির সঙ্গে যোগ নেই। মতবাদ হল আইডল। ধর্ম আর ধর্মের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যাদের এত জেহাদ, তারা কিন্তু সযত্নে মতবাদের একটা অদৃশ্য দেব-প্রতিমা সামনে খাড়া করে মানুষের সহজাত ফ্যানটিসিজমের জিগিরের খোঁচা মেরে চলেছে। আমাদের যেসব প্রবৃত্তি প্রবল তার মধ্যে হিংসা সবার উপরে। প্রবল বিদ্বেষভাব। শান্তির চেয়ে লড়াই আমাদের বেশি উত্তেজিত করে। প্রেমের চেয়ে প্রবল হল ঘৃণা। মানুষকে সাইকোলজিক্যালি নাচানো হচ্ছে। প্রতিবেশীকে আমরা বাঙালিরা সহ্য করতে পারি না। বরাবরই আমরা অসামাজিক, স্বার্থপর, অনুদার। আমাদের ইতিহাস বিশ্বাসঘাতকতার, পদলেহনের, ক্রীতদাসের। স্বদেশের ঠাকুর ফেলে বিদেশের কুকুর ধরার প্রবণতা। এ আমাদের আজকের নয়। দলাদলিতে আমরা শ্রেষ্ঠ। মাটি দিয়ে পুতুল গড়া সহজ। হাতের চাপে যে কোনও আকৃতি নিতে পারে। নমনীয়। ইস্পাত হলে সহজ হত না। এই জাতীয় চরিত্রকে বিদেশিরা যেভাবে স্লেভ তৈরির কাজে লাগিয়েছিল, স্বদেশিরাও নিজেদের উদ্দেশ্যসাধনে সেইভাবেই কাজে লাগাচ্ছে। ধর্মের নামে হত্যা, নিপীড়নের বদলে মতবাদের নামে তছনছ চলছে। গেঁয়োযোগী ভিখ পায় না এদেশে। অমুকে বিলেত ঘুরে এসেছে শুনলে আমরা সসম্ভ্রমে এগিয়ে যাই এখনও। বিলেতফেরত ডাক্তার হোক বা সাহেব ডাক্তার, হালুইকর যদি সাহেব হয় আমরা একেবারে গলে যাই। দেশ থেকে দেশের ফসলটুকু ছাড়া আমাদের তখনও কিছু নেবার ছিল না। এখনও কিছু নেবার নেই। এ দেশের ধর্ম, দর্শন, মহাপুরুষ, মত, পথ সব ফেলে দাও। নিয়ে এসো বিদেশি মতবাদ। সেই মতবাদ ভালো করবে কি খারাপ করবে, দেখার দরকার নেই। উপযুক্ত ক্ষেত্রে উপযুক্তভাবে প্রযুক্ত হল কি না, প্রয়োগ করা যায় কি না, এসব প্রশ্ন পরে, প্রয়োজনও নেই। এদেশের মানুষকে এমন একটা অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে, যে অবস্থায় প্রশ্ন আসে না। আসে আত্মসংলাপ, ‘সলিলোকি’। কেউ চ্যালেঞ্জ করছে না। করবার সাহস হবে না, কারণ পাশেই থাকবে প্রহরী কুকুর। ধর্মগুরুর মতো, রাজনীতির গুরুরা কীর্তন শোনাতে থাকবে, ‘ভজো, ভজো, প্রভুর ভজনা করো, আমরা সুদিনের সন্ধানে আছি। গোটাকতক শত্রু খতম করতে পারলেই তোমাদের স্বর্গপ্রাপ্তি কেউ ঠেকাতে পারবে না।’
এ দেশের মানুষ কী আর চাইবে! দুশো-আড়াইশো বছর ইংরেজ বুটের তলায় রেখেছিল। তারপর ছিয়াত্তর বছরের স্বাধীনতায় যা হয়েছে তা ইতিহাস লিখবে। কিছু মানুষ, বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন কিছু মানুষ, স্তাবক, হাততোলা নয়, ধামাধরা নয় এমন কিছু মানুষ লিখবেন সেই ইতিহাস। ‘লুট লে, লুট লে’ চলেছে সেই সাতচল্লিশ থেকে। আর একে একে পরিবারের পর পরিবার এসে পড়ছে পথে। ঝুপড়িতে বাড়ছে ভারতের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের জনতাও। এই স্তর থেকে মানুষ কী চাইতে পারে! কী চাইতে হয় জানা আছে কি? দশকের পর দশক ধরে একটি পরিকল্পনাই হয়েছে— মানুষকে কীভাবে আরও গরিব করা যায়! শাসক আর শাসিতের মধ্যে বিশাল একটা ফারাক তৈরি করে রাখতে হবে পরিখার মতো, সহজে লাফিয়ে যেন চলে আসতে না পারে ওরা। নিজের ছেলেকে বলব, ‘ভালো করে লেখাপড়া কর।’ সুযোগ পেলেই তাকে বিদেশ পাঠাব, আর ওদের ছেলেকে বলব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বোমা মার। এমন হাস্যকর কথাও বলে ফেলব— ছাত্ররাই শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করবে। ছাত্ররাই পরীক্ষা নেবে। আসলে হচ্ছেও তাই। নির্বাচিত প্রশ্ন তালিকার বাইরে প্রশ্ন এলে পরীক্ষকের জীবনসংশয়। পরীক্ষাকেন্দ্রে গণটোকাটুকি। বাধা দিতে চাইলেই মৃত্যু। এখন অবশ্য প্রশ্ন আর প্রশ্ন নেই, উত্তর সহ বাইরে বিকোয়।
‘ক্লাস’ আর ‘মাস’, দুটো ক্লাসই তো এখন স্পষ্ট। সোনার পাথরবাটির গোছের অবস্থা। মাস হল ক্লাসের হাতিয়ার। অমানুষ হবার পুরো স্বাধীনতা দেওয়া আছে। মানুষ হবার স্বাধীনতা নেই। সুযোগও নেই। কিছুই যখন নেই আর আমাদের জাতীয় চরিত্রের ধরনটাই যখন গয়ং-গচ্ছ, যাই হোক এবং যেভাবেই হোক দিন কাটিয়ে যাও আর সংসার বাড়িয়ে যাও, কিছু পাবার আশাও নেই। অ্যাম্বিশন নেই যে জাতের, সে জাতের ‘আমরা বাঙালি’ বলে চ্যাঁচানোই সার হবে। ছাত্র আন্দোলনের নামে সুযোগসন্ধানীরা কলকাঠি নাড়বে। ক্ষমতায় বসবার ছুতো খুঁজবে।
নেতারা সবসময় বলেন, ‘আহা, ওদেরও তো একটা কিছু করা চাই। একটা কিছু নিয়ে থাকতে হবে তো! চাকরি নেই বাকরি নেই!’
‘এনগেজ’ করে রাখতে হবে। ভারী সুন্দর কথা। এই এনগেজমেন্টের অর্থ হল, বোমাবাজি করা। মারধর। দাঙ্গাহাঙ্গামা। আন্দোলনের নামে খুনখারাপি। চোলাইয়ের কারবার। নেশা-ভাং-গাঁজা ছিনতাই। সবমিলিয়ে, ‘মাস্তানি’। কি সুন্দর একটা শ্রেণি বা বর্ণ বেরিয়ে এসেছে আজকের দিনে, ‘মাস্তান’।
বাঙালি সুতোর ব্যবসা করত সুতানুটিতে, সেই ব্যবসা এখন সবেতে। নেপোরা সবসময় রেডি। দই পেলেই হয়।
ধর্মও এখন নেপোদের হাতে। যারা ‘এনগেজ’ করে রাখে আমাদের ছেলেদের।
বিলিতি বুলির বাংলা, ‘আওয়ার বয়েজ’। সবই বুঝি আমরা। দিন-দিন দেখছি সবকিছু থেকেই স্পিরিট উড়ে যাচ্ছে। আত্মশূন্য অবস্থা। একে স্পিরিচুয়ালিজমের উলটো মেটিরিয়ালিজম বলে না। এর নাম সুবিধাবাদিজম। সবার ওপরে নৈবেদ্যের চূড়ায় কলার মতো নেপো।
দেশ হোক বা প্রতিবেশী দেশ, নেপোর কীর্তন সর্বত্র।



