যদিও না দাও টাকা, তবে তোমার কপাল ফাঁকা!

শেষ আপডেট:

 

সৌমেন সিংহ রায়

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে গোটা দেশে প্রবল জনপ্রিয় হওয়া রোজা সিনেমার গল্পের প্লটটাই ছিল একজন সরকারি নিরাপত্তা অফিসারের অপহরণ এবং তাঁকে উদ্ধার করতে তাঁর অতি সাধারণ গ্রাম্য স্ত্রীর নাছোড়বান্দা লড়াইকে কেন্দ্র করে। যদিও সেই গল্পে ছায়া সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল আর একটি বাস্তব অপহরণের ঘটনা; কাশ্মীরের একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের দ্বারা এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কন্যার অপহরণের ঘটনা। রামায়ণের কাহিনীর টার্নিং পয়েন্টও ছিল একটি অপহরণের ঘটনা; সীতা অপহরণ কাণ্ড ছিল ন্যায় এবং অন্যায়ের যুদ্ধে যাকে বলে একেবারে ইমিডিয়েট কজ অফ কনফ্লিক্ট! সংবাদপত্রের পাতা, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে আজকের দিনে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, অনাদায়ে হত্যা এবং রোমহর্ষক পুলিশি অভিযানের পর অপরাধীদের গ্রেপ্তার অত্যন্ত পরিচিত শব্দ। ২০০০ সালে চন্দনদস্যু বীরাপ্পনের কন্নড় অভিনেতা রাজকুমারের অপহরণ এবং ১০৮ দিন পর অনেক কাঠখড় এবং টাকা দেওয়ার পর সেই অভিনেতার মুক্তি পাওয়া, সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এক ভাবে এ রাজ্যেও ২০০১ সালে খাদিম কর্তা পার্থ রায় বর্মনের অপহরণ এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর সংযোগ এবং কয়েক কোটি টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাঁর মুক্তি পাওয়া, রাজ্য ও দেশে প্রবল আলোড়ন ফেলেছিল। গোয়েন্দা গল্প, সিনেমার পর্দা থেকে সংবাদ শিরোনাম, অপহরণ আজকের দিনে যাকে বলে ওই জেন জি’র ভাষায় – ইন থিং।

অপহরণ কথাটির সহজ অর্থ হল কোনও ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিসমূহকে বেআইনিভাবে ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে তুলে নিয়ে যাওয়া এবং আটকে রাখা। অপহরণ কেন করা হয়? কোন একটি বিশেষ কারণে অপহরণ করা হয় না। ফিলাডেলফিয়ার রিসার্চগেট ফাউন্ডেশনের অনুসন্ধানে অপহরণের কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে তা মোটামুটি সব দেশের জন্যই সত্য। তাদের অনুসন্ধানে অপহরণের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আর্থিক লাভ বা মোটা টাকা মুক্তিপণ আদায়, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা, জবরদস্তি যৌনপেশায় নামানো ও শ্রম শোষণ, ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো, নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ করা, অপরাধী চক্রে শামিল করা, তুলে এনে বিয়ে করা থেকে পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেওয়ার দাবিও খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে বেশিরভাগ অপহরণের উদ্দেশ্য অল্প সময়ে মোটা টাকা মুক্তিপণ আদায় করা, এটা সব দেশের ক্ষেত্রেই সমান। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, স্বৈরাচারী শাসন, দূর্বল আইন রক্ষাকারী ব্যবস্থা, মানসিক হতাশা ইত্যাদি কারণে অপহরণ আজকের দিনে সংঘটিত অপরাধের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠেছে। শুধু দারিদ্র্যপীড়িত, রাজনৈতিক লড়াইয়ে দীর্ণ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোই নয়, গ্লোবাল ক্রাইম ইনডেক্সের রিপোর্টে পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশের, নাইজিরিয়ায় সঙ্গে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, বেলজিয়ামের মতো উন্নত দেশগুলোতেও অপহরণ এবং মুক্তিপণ আদায় হামেশাই ঘটছে। এমনকি যে দেশগুলোর নাম হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স এবং ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ইনডেক্সের উপর দিকে থাকে মানে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস প্রভৃতি দেশে অপহরণ অহরহ ঘটছে। ভারতে প্রতি ১ লাখ অপরাধের ঘটনায় অপহরণ ৫.১, যদিও ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় তা যথাক্রমে ১০.৩ এবং ১৫.১! অবশ্যই এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকার সমস্যাদীর্ণ দেশগুলোতে অপহরণের হার অনেক বেশি। ওই তালিকা অনুযায়ী আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভুটানে অপহরণের নথিবদ্ধ অপরাধের সংখ্যা শূন্য, হ্যাঁ এই জন্যই ভুটানকে শান্তির দেশ বলাটা অতিশয়োক্তি হবে না।

অপহরণ বন্ধ করা বা অপহরণের ঘটনা কম করার উপায় আছে কি? মনে হয় না। অসাম্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সমাজে অথবা ব্যাপক গরিবি বেকারত্ব অথবা পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সময়ে অপহরণ পুরোপুরি বন্ধ করা যাকে বলে ওই ‘নেক্সট টু ইম্পসিবল’। তবে অপহরণের ঘটনা থেকে বাঁচতে কিছু উপায় নিশ্চয়ই গ্রহণ করা যেতে পারে। নিজের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকা, নিজের আর্থিক এবং সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে অহেতুক বারফাট্টাই না করা বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অহেতুক শো আপ না করা, নিজের ভৌগোলিক অবস্থান জনসমক্ষে প্রকাশ করায় সতর্ক থাকা, শিশুদের বিশেষ করে বিদ্যালয়ে যাওয়া শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ শেখানো মানে সবার কাছ থেকে খাদ্যবস্তু না নেওয়া, সবার সঙ্গে না যাওয়া ইত্যাদি। তবে অপহরণ হয়ে যাওয়ার পর মূল ভূমিকা তো পুলিশ এবং গোয়েন্দা দপ্তরের, তাদের কার্যকরী এবং বুদ্ধিদীপ্ত ভূমিকা অনেক অপহরণকারীর পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে; অপহৃতকে উদ্ধার করে অপহরণকারীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি বিধান সম্ভব হয়েছে। অপহরণকারীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেওয়া সম্ভব হলেও অপহৃতের উপর যে মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতন করা হয়, তার ট্রমা তারা অনেকদিন ধরে বয়ে নিয়ে বেড়াতে বাধ্য হয়। অপহরণ থাকবে। বৈষম্যমূলক সমাজে অপহরণ হয়তো পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না কিন্তু নাগরিক সচেতনতা এবং পুলিশ প্রশাসনের সময়োচিত সক্রিয়তা, তা অবশ্যই কম করতে পারে।

ভারী ভারী কথার পরে অপহরণ সংক্রান্ত একটা মজার গল্প বলা যাক। জনৈক বন্ধু আশিস (কাল্পনিক নাম) ক্লাস নাইনে পড়ার সময় হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পড়ার পর উধাও হয়ে গেল। প্রথমে মনে করা হয়েছিল বাবার মারের ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছে। দু’দিন ধরে খোঁজাখুঁজির পরও যখন আশিসকে পাওয়া গেল না, বাড়িতে কান্নাকাটির রোল পড়ে গেল। তখন ল্যান্ড ফোন বা মোবাইল ফোন এত সহজলভ্য ছিল না। বাড়িতে কান্নাকাটির রোল, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার মধ্যেই দু’দিন পর আশিসের বাড়ির দরজায় একটা উড়োচিঠি পাওয়া গেল তাতে জানানো হয়েছে আশিসকে অপহরণ করা হয়েছে এবং দু’হাজার (হ্যাঁ, তখন দু’হাজার টাকার বেশ দাম ছিল) টাকা না দিলে ওকে ছাড়া হবে না। ভিড়ে ভিড়াক্কার আশিসের বাড়ির শোওয়ার ঘরে ঢুকে জীবনে প্রথমবারের মতো মুক্তিপণের চিঠি দেখলাম। গোটা গোটা অক্ষরে ছন্দ মিলিয়ে লেখা ‘যদিও না দাও টাকা, তবে তোমার কপাল ফাঁকা!’ হাতের লেখা এবং এই ছন্দ মিলিয়ে লেখার স্টাইলটা বড্ড চেনা চেনা ঠেকল! ওখান থেকে বেরিয়ে সোজা হানা দিলাম আরেক বন্ধু সুবোধের (এটাও কাল্পনিক নাম) কোঠাবাড়ির দোতলায়। চেপে ধরতেই স্বীকার করে নিল সবকিছু হয়েছে আশিসের বুদ্ধিতে, নকল করে বাবার মারের হাত থেকে বাঁচতে। তারপর সেখান থেকেই আশিসকে উদ্ধার করে নিজ বাড়িতে দিয়ে আসা। যদিও মারের হাত থেকে পুরোপুরি না বাঁচলেও, কম মার খেয়েছিল সে যাত্রায়! সামাজিক মাধ্যমেও এই অপহরণ এবং তা নিয়ে অনেক মজার গল্প খুঁজে পাওয়া যায়। একজনের স্ত্রীকে অপহরণ করেও মুক্তিপণ পাওয়া তো দূরের কথা, উলটে কিছু টাকাপয়সা দিয়ে কীভাবে অপহরণকারী তাকে ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিল, সে ঘটনা নির্মল হাসির উদ্রেক করে।

তবে সব অপহরণ এরকম মধুরেণ সমাপয়েৎ হয় না, মুক্তিপণ না পেয়ে নির্মম শিশুহত্যার অনেক ঘটনা আছে। তবে সেসব পরে কোনওদিন বলা যাবে।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Popular

More like this
Related

রাজনীতির অন্যতম অস্ত্র, দিশা দেখিয়েছিলেন রাবণ

শৌভিক রায়  বেশ কিছু বছর আগের কথা। বিদ্যালয় পরিচালন...

উত্তরের ছড়াকার

দেবাশিস কুণ্ডু জলপাইগুড়িতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা দেবাশিস কুণ্ডুর। বর্তমানে...

একদিন প্রতিদিন

অনুরাধা সেন  উল বুনতে বুনতে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন কনকময়ী।...

কবিতা

বাবা শমীক ঘোষ পুরানো জামা, পুরানো ঘড়ি, কোয়ার্টারের ছোট্ট ঘর-- সাদামাঠা জীবন যাপন লোকটা নাকি...