অভি
সেবার বেতাল আর ডায়ানার বিয়ে হবে। ইন্দ্রজাল কমিকসের আগের সংখ্যাতেই তা বলে দেওয়া হয়েছে। আর তাই সেই বিশেষ সংখ্যা জোগাড় করতে আমাদের সে কী হুড়োহুড়ি! যিনি স্টলে কমিকস বিক্রি করতেন তাঁকে আগেভাগে বলে রেখেও তেমন সুবিধা হয়নি। সেই সংখ্যার দাম আর কতই বা ছিল। হয়তো তখনকার দিনে বারো আনা। কিন্তু কিনতে গিয়ে দেখি তা ব্ল্যাকে বিক্রি হচ্ছে। শেষমেশ কোনওমতে ইন্দ্রজাল কমিকসের সেই সংখ্যাটা কেনা।
কমিকস এভাবেই আমার জীবনে জড়িয়ে। ছবি আঁকাকে ঘিরে যদি এই জীবনে সামান্য কিছুও করে থাকতে পারি, তার মূলে কিন্তু এই কমিকসই। ফুটপাথের স্টল থেকে কিনে আনা বিভিন্ন কমিকস দেখে ছবি আকঁার চেষ্টা করতাম। সেই সমস্ত ছবিতে আমার অঙ্কের খাতা হামেশাই ভরে যেত। পড়াশোনায় ভালো ছিলাম বলে দুর্নাম আমার চরম শত্রুও দেবে না। রেগেমেগে বাবা তো একবার অঙ্কের খাতাই ছিঁড়ে ফেলে দিলেন। ফের ছবি আঁকলে খুব খারাপ হবে বলে হুংকার দিয়েছিলেন। রীতিমতো থ্রেট কালচার। তবুও কী আর মন মানে! খুব বেশি করে নারায়ণ দেবনাথের আঁকা কমিকসগুলিতে ডুবে গিয়েছিলাম।
শিলিগুড়ি বয়েজ হাইস্কুলে পড়াশোনা। যতদূর মনে পড়ে তখন ক্লাস সেভেন। তখন থেকেই ক্লাসের ফাঁকে খাতায় প্রচুর আঁকিবুকি চলত। সময় গড়ানোর ফাঁকে নারায়ণ দেবনাথ আরও বেশি করে জীবনে জুড়ে যাচ্ছিলেন। এই সময়ই কমিকসের দুনিয়ায় ময়ূখ চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয়। তঁার অঙ্কনশৈলী যে কতটা নিখঁুত ছিল তখন ততটা বুঝতাম না। আজ বুঝি। এভাবেই তুষার চ্যাটার্জি, গৌতম কর্মকারদের আঁকা কমিকস দেখে এই দুনিয়ার বিষয়ে আরও অনেক কিছু শেখা শুরু করলাম। তবে মনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাগ ফেলে যাওয়া বলতে কিন্তু সেই নারায়ণ দেবনাথই। উনি বলতেই আমাদের চোখে বাঁটুল দি গ্রেট, হাঁদা ভোঁদা, নন্টে ফন্টে। তবে তার বাইরেও সেই সময়কার নানা পুজোসংখ্যায় তাঁর সমস্ত অলংকরণ ছিল এককথায় অসাধারণ।
এভাবেই চলছিল। নমস্য আঁকিয়েদের আঁকা সমস্ত ছবি দেখে আমি হচ্ছিলাম ‘কপিক্যাট’। আমার স্কুলের স্যর গৌরীশংকর ভট্টাচার্যের একটি লেখার সূত্রে একদিন উত্তরবঙ্গ সংবাদে ছবি আঁকার সুযোগ পেলাম। আর তারপরই জীবনের অন্য খাতে বওয়া শুরু। প্রথমে নিধুভূষণ দাস ও পরে তুষারকান্তি বিশ্বাস ঠিকমতো পথ চলার দিশাটা দেখিয়েছিলেন। তবে কার্টুন ঠিক কী, তা হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন পত্রিকার সম্পাদনা দপ্তরের অন্যতম অমিতাভ চক্রবর্তী। তাঁর সুবাদেই ‘বিন্দু বিসর্গ’–র অবতারণা। আমার এক নতুন পরিচিতিও। আমার পথ চলার এই পর্বে আমাদের প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মহাশয় সুহাসচন্দ্র তালুকদারের অবদান কোনওদিন ভোলার নয়। পরবর্তীতে একইভাবে সহযোগিতা করে চলেছেন আমাদের বর্তমান সম্পাদক সব্যসাচী তালুকদার। নানা প্রতিষ্ঠানে ছবি আঁকায় কতই না বিধিনিষেধ থাকে শুনেছি। আমাদের উত্তরবঙ্গ সংবাদে কিন্তু আমার ক্ষেত্রে একটি দিনের জন্যও তা অনুভব করিনি। বরং নিত্যনতুন নানা আঙ্গিকে ছবি আঁকার জন্য আমাকে প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করা হয়।
সাংবাদিক বীরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা মনে পড়ছে। ওঁর লেখা স্ক্রিপ্টেই উত্তরবঙ্গ সংবাদে আমার প্রথম কমিকস আঁকা। সেটি শিশু কিশোর আসর বিভাগে প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে সাংবাদিক রমাপদ পাহাড়ির সৌজন্যে আমাদেরই সহযোগী পত্রিকা তথ্যকেন্দ্রে চঁাদের পাহাড় নিয়ে ১০০ পর্বের কমিকস এঁকেছিলাম। এরপরও আরও বেশ কিছু কমিকস এঁকেছি। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর টুনটুনির গল্প, গোপাল ভাঁড়, মোল্লা নাসিরুদ্দিন, তেনালি রামা। এই পর্বে স্ক্রিপ্ট লিখে রমাপদ আমাকে প্রতিনিয়ত যোগ্য সহযোগিতা করেছেন। তবে খবরের কাগজে কাজ করলে যা হয় আর কী! রোজকার কাজে এতটাই চাপ থাকে যে কমিকস নিয়ে আমার আর সেভাবে এগোনোর সুযোগ হয়নি। তবে আমি কিন্তু প্রতিনিয়ত এই দুনিয়ার খোঁজ রেখে গিয়েছি। আজও রেখে চলি।
খুব মনে পড়ে সদাশিবের কথা। ছোটবেলার এক পত্রিকায় বিমল দাসের আঁকা সেই কমিকস–স্ট্রিপ আজও বুকে। তরুণ মজুমদারের লেখা সেই কমিকসের স্ক্রিপ্ট ছিল আক্ষরিক অর্থেই দমদার। নানা অ্যাঙ্গেলে কমিকসটি আঁকা হয়েছিল। কী করে বিমলবাবু সেই সময় এই ভাবনা পেয়েছিলেন আজ ভাবি আর অবাক হই। সেই কমিকস হোক বা টিনটিন, সংলাপগুলি খুব মন দিয়ে পড়তাম। এই করতে করতেই নিজেও কিছুটা লেখা শিখে গেলাম। আজ যখন নানা কার্টুন আঁকি সেই শিক্ষাটা খুবই কাজে দেয়।
লি ফফের অরণ্যদেব দারুণ। ইন্দ্রজাল কমিকসে আমাদের ‘বাহাদুর’–ও কিন্তু কম ছিল না। কী করে এক ভারতীয় অবতারকেও এই দুনিয়ায় হিট করা যায় তা বাহাদুর হাতে–কলমে দেখিয়েছিল। নারায়ণ দেবনাথের আঁকা বাহাদুর বেড়াল বেশ মজার লাগত। সঙ্গী সাবুকে নিয়ে কার্টুনিস্ট প্রাণের আঁকা চাচা চৌধুরীর মজাদার সমস্ত কাণ্ডকারখানাও বেশ ভালো লাগত। তবে তা দেখতে দেখতে তাঁর সঙ্গে প্রতিনিয়ত আমাদের নারায়ণবাবুর কমিকসগুলিরও তুলনা চলত। আর বলাই বাহুল্য যে আমার বিচারে পরের জনই সবসময় এগিয়ে থাকতেন। আমাদের ছোটবেলাটার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকার সুবাদে আজীবন থাকবেনও।

