পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট: কথায় বলে ‘বাঁশ দেওয়া’। অর্থাৎ, কারও ক্ষতি করা। কিন্তু গুণী শিল্পীর হাতে পড়লে বাঁশের তৈরি সামগ্রীর কদর দেখে কে! কেউ যদি মনে করেন, বাঁশের কাজ মানে কেবল একঘেয়ে ঝুড়ি বা ফুলদানি, তবে তাঁর সেই পুরোনো ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে বালুরঘাটের (Balurghat) স্বদেশিমেলার স্টলে পা রাখলেই। বাঁশ ও বেতের মধ্যেও যে কত প্রজাতি এবং কত রকম সূক্ষ্ম কারুকার্য লুকিয়ে থাকতে পারে, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। আর সেই বহুমাত্রিক শিল্প নিয়েই উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের শিল্পীরা এখন বালুরঘাটে এসে লাভের মুখ দেখছেন।
কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ উদ্যোগে শহরের ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন ক্লাব প্রাঙ্গণে বসেছে এই আকর্ষণীয় স্বদেশিমেলা। নাগাল্যান্ড (Nagaland), মেঘালয় (Meghalaya), অসম (Assam), মিজোরাম (Mizoram), অরুণাচলপ্রদেশ (Arunachal Pradesh), মণিপুর (Manipur) ও ত্রিপুরা (Tripura)— ভারতের এই ‘সেভেন সিস্টার্স’ ও সিকিম থেকে আসা হস্তশিল্পীরা তাঁদের ঝুলি উজাড় করে নিয়ে এসেছেন। মেলায় দেখা যাচ্ছে বাঁশ-বেতের তৈরি নানা সামগ্রীর এক নান্দনিক সম্ভার। কোথাও সরু প্রজাতির বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম নকশার সামগ্রী, আবার কোথাও মোটা ও টেকসই বাঁশ দিয়ে তৈরি হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। পাতলা বাঁশের আস্তরণ দিয়ে তৈরি কিছু শিল্পকর্ম দেখে ক্রেতাদের বুঝতেই সময় লেগে যাচ্ছে যে এগুলি আদৌ বাঁশ দিয়ে তৈরি। বেতের ক্ষেত্রেও রয়েছে একইরকম চমক। সাধারণ বেতের চেয়ার-টেবিল অনেক বাড়িতে দেখা গেলেও, এখানে বেতের বিভিন্ন ভাগ ও তার বৈচিত্র্যময় ব্যবহার দেখে মানুষ নতুন করে এই উপকরণকে চিনছেন। শহরবাসীর পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী গ্রামাঞ্চল ও গঙ্গারামপুর মহকুমা থেকেও প্রতিদিন মেলায় ভিড় বাড়ছে।
খিদিরপুরের এক ক্রেতা তনুজা সরকার একটি চটের হাত ব্যাগ ১০০ টাকায় কিনেছেন। বললেন, ‘এমন বালুরঘাটে পাওয়া তো সম্ভবই নয়, অন্য জায়গা থেকে কিনতেও অনেক টাকা লাগত। কিন্তু এখানে হাতল দেওয়া সেই ব্যাগ এত কম টাকায় পাব ভাবিনি।’
ক্রেতারা খুশি, তাই বিক্রেতারাও খুশি। নাগাল্যান্ডের হস্তশিল্পী সাংসই লাম দক্ষিণ দিনাজপুরের মানুষের এই উৎসাহ দেখে অভিভূত। তিনি বললেন, ‘আমার এলাকায় পর্যটকরা ঘুরতে এসে আমাদের হাতে বানানো জিনিস স্মারক হিসেবে কিনে নিয়ে যান। কিন্তু দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় এসব সামগ্রীর চাহিদা দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছি।’ সিকিম থেকে আসা হস্তশিল্পী কুলবাহাদুর লিম্বোর স্টলে সাজানো রয়েছে চমৎকার সব স্মারক, জলের জগ, ট্রে এবং ঝুড়ি। বিক্রি ভালো হওয়ায় খুশি তিনিও। বললেন, ‘আমরা স্টলে বসেই কাজ করছি। আমাদের কাজ দেখতে অনেকে ভিড় জমাচ্ছেন।’ শিল্পীদের কাজ সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়ে ক্রেতারাও খুব খুশি। মেলায় আসা সমীর সূত্রধরের সহাস্য মন্তব্য, ‘সিকিমে না গিয়েই সিকিমের জিনিস কিনতে পারলাম। এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে!’

