শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬

Balurghat | অন্ধ ঠাকুমার একমাত্র ‘চোখ’ এই নাতি! শৈশব তুচ্ছ করে ঠাকুমার যষ্ঠি ১৪-র বিজয়

শেষ আপডেট:

পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট: দুপুর গড়িয়ে গেলে চকশ্যাম নয়াপাড়ার কুঁড়েঘরটার সামনে পায়ের শব্দ শোনা যায়। ভিক্ষের টাকা দিয়ে বাজার করে তখন বাড়ি ফেরে বিজয় মার্ডি। ১৪ বছরের কিশোরের ছোটখাটো শরীরের আর কতই বা ওজন? পায়ের শব্দই বা কতখানি? তবু বুঝতে পারেন ঠাকুমা মণি হাঁসদা। উঠোন ঝাঁট দিতে দিতে দাঁড়িয়ে পড়েন। নাতি আসছে। মুখে একচিলতে হাসি ফুটে ওঠে। ‘এলি রে?’ প্রশ্নে মেশানো থাকে আদর, স্বস্তি আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা।

দক্ষিণ দিনাজপুরের (Dakshin Dinajpur) বালুরঘাট (Balurghat) ব্লকের ভাটপাড়া পঞ্চায়েতের চকশ্যাম নয়াপাড়া গ্রামে মণি ও বিজয়ের সংসার বলতে এই ছোট্ট কুঁড়েঘরটাই। সরকারি কাগজে ‘শতভাগ প্রতিবন্ধী’ মণি মাসে এক হাজার টাকা ভাতা পান। কিন্তু টাকার চেয়ে বড় ভরসা তাঁর নাতি। ভোর হলেই হাতড়ে খুঁজে নেন বিজয়ের হাত। সেই হাতই তাঁর নিরাপত্তা। বিজয়েরও পৃথিবী বলতে ঠাকুমাই সব। বাবা মানসিক ভারসাম্যহীন, বহুদিন নিরুদ্দেশ। মা ছোটবেলায় ছেড়ে গিয়েছেন। ফলে জন্মান্ধ ঠাকুমার আঁচলের তলাতেই বড় হয়েছে সে। সমবয়সিরা যখন স্কুলের বেঞ্চে, বিজয় তখন ঠাকুমার হাত শক্ত করে ধরে রওনা দেয় গ্রাম পেরিয়ে বাজার বা বাসস্ট্যান্ডে। দুজনে কখনও গান গেয়ে, কখনও নীরবে হাত পেতে ভিক্ষা চায়। দু’টাকা, পাঁচ টাকা যা মেলে, তাই দিয়ে উনুনে হাঁড়ি চড়ে। প্রতিবেশীরা সাহায্য করেন, কিন্তু তা সীমিত। তবু এই দারিদ্র্যের মধ্যেও গ্রামবাসীরা অবাক হন তাদের একে-অপরের প্রতি টানে। একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়েই যেন বেঁচে আছেন দুজনে। মণির চোখে দৃষ্টি নেই, কিন্তু নাতির মুখের রেখা তিনি স্পর্শে চিনে নেন। বিজয়ের শৈশব কাটছে দায়িত্বে, তবু ঠাকুমার হাত ছাড়েনি সে।

ভিক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে রান্নার আয়োজনও যেন তাদের নীরব সখ্যের অংশ। মণি হাতড়ে হাতড়ে সবজি কেটে দেন। নাতির পছন্দের অংশটা আলাদা করে রাখতে ভোলেন না। রান্নার বড় দায়িত্ব বিজয়ের কাঁধে। থালা বাড়িয়ে দিলে ঠাকুমা প্রথমে জানতে চান, ‘তুই খাচ্ছিস তো?’ স্কুলে যাওয়ার কথা উঠতেই মাথা নীচু করে বিজয়, ‘আমি স্কুলে গেলে খাওয়া জুটবে না। ওই সময়টায় ঠাকুমাকে নিয়ে ভিক্ষে করি।’ কথায় আক্ষেপ কম, দায়িত্ববোধ বেশি। আর মণির গলায় নিঃশর্ত নির্ভরতা, ‘নাতি না থাকলে বিষ খেয়ে নেব। ওই আমার শেষ সম্বল।’ হুমকি নয়, জন্মান্ধ বৃদ্ধার নির্ভরতার আর্তি।

অভাব আছে, অনিশ্চয়তা আছে, উপোসও আছে। নেই শুধু বিচ্ছেদ। অন্ধ ঠাকুমার অন্ধকার পৃথিবীতে বিজয়ই একমাত্র আলো। আর বিজয়ের কঠিন জীবনে মণিই আশ্রয়, স্নেহ, ঘর। দারিদ্র্যের রুক্ষ মাটিতে তাদের ভালোবাসাই যেন একমাত্র সবুজ অঙ্কুর।

Sushmita Ghosh
Sushmita Ghoshhttps://uttarbangasambad.com/
Sushmita Ghosh is working as Sub Editor Since 2018. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Digital. She is involved in Copy Editing, Uploading in website and various social media platforms.

Share post:

Popular

More like this
Related

Cooch Behar | শিক্ষক সংকটে বিপর্যস্ত ৪ সরকারি স্কুল

কোচবিহার: ‘ধার’ করা শিক্ষক দিয়েই বর্তমানে কোচবিহারে চারটি সরকারি...

Cooch Behar | মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জেরবার মধ্যবিত্তের হেঁশেল

কোচবিহার ও দিনহাটা: পিউ সাহা কোচবিহারের বাসিন্দা।  সোশ্যাল মিডিয়ায়...

Cooch Behar | নার্সিং স্টাফের মৃত্যুতে দায়ের খুনের মামলা

কোচবিহার: ‘পুড়িয়েই মারা হয়েছে আমাদের বাড়ির মেয়েকে।’ পুলিশের কাছে...

Ajoy Edward-Bimal Gurung Meeting | পাহাড়ে কি তবে ‘তৃতীয় বিকল্প’? অজয়-বিমল গোপন বৈঠকে নয়া সমীকরণের জল্পনা

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি: অজয় এডওয়ার্ডের (Ajoy Edward) সঙ্গে বিমল...