সুবীর মহন্ত, বালুরঘাট: কোনও স্কুলে শিক্ষক কম। কোনও স্কুলে হয়তো শৌচাগার ভাঙাচোরা। কোথাও আবার শৌচাগার নেই। তবে বালুরঘাট (Balurghat) শহরের তুড়িপাড়ার বিবেকানন্দ বিদ্যানিকেতন নামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের সমস্যা অন্যরকম। মদের ঠেক পার করে স্কুলে যেতে হয় সেখানকার পড়ুয়াদের। আবার কখনো-কখনো ব্যবসায়ীরা মদ তৈরির সামগ্রী রাস্তার মধ্যেই ফেলে রাখে। অথবা পচা গুড় রাস্তায় ঢেলে দেয়। নাক চেপে সেগুলি পেরিয়েই, ওই স্কুলে ঢুকতে হয় শিক্ষক ও পড়ুয়াদের।
সমস্যা এখানেই শেষ নয়। সেই স্কুল ঘেঁষেই চলে চোলাই মদ তৈরির প্রক্রিয়া। আর ওই মদের দুর্গন্ধে সারা এলাকা তো বটেই, ওই স্কুলের পড়ুয়াদেরও মাথা ঝিমঝিম করে। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে বেরোতে হাঁসফাঁস করেন তুড়িপাড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, পড়ুয়া ও অভিভাবকরা। কিন্তু কারওই এই মদ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস হচ্ছিল না। তবে সম্প্রতি পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে এলাকার ২১ বছর বয়সি এক তরুণের মৃত্যুর ঘটনা। মদ্যপানের প্রভাবেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে, এমন খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় চোলাইয়ের ঠেকগুলির বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন স্থানীয় মহিলারা। মদের জন্য আর যাতে ওই এলাকায় কোনও কিশোর বা তরুণের মৃত্যু না হয় তার জন্য এলাকায় মদ ব্যবসা একেবারে নির্মূল করতে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে প্রমীলাবাহিনী। মদ ব্যবসায়ীদের হাতে মারধর খেয়েও, প্রতিবাদীরা যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, এবারে সেই লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন স্কুলের শিক্ষকরাও। এই মদ ব্যবসা বন্ধ হলে, এলাকার পরিবেশ বদলে যাবে বলে মনে করছেন বিবেকানন্দ বিদ্যানিকেতন নামের ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এলাকার প্রতিবাদী মহিলারা ইতিমধ্যে ওই স্কুলের শিক্ষকদের কাছেও গিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে কথাও বলেছেন। এলাকার মহিলাদের মদবিরোধী এই আন্দোলনের পাশে রয়েছেন বলে সেই স্কুলের শিক্ষকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন।
সেই স্কুলের শিক্ষকরা বলছেন, ‘মদের এই কারবারের জন্য এলাকার পরিবেশ খারাপ। আর তার প্রভাব পড়ছে ছোটদের ওপর। স্কুলে পড়ুয়াদের না আসার প্রবণতা রয়েছে। তাই ওই পড়ুয়াদের উৎসাহ দিতে শিক্ষকরা নানারকম চিন্তাভাবনাও করছেন। প্রধান শিক্ষক গোপাল চৌধুরী বলছিলেন, ‘স্কুলে শিশুরা যাতে নিয়মিত আসে সেজন্য তাদের আকৃষ্ট করতে, আমাদের নিজের খরচে আবৃত্তি শিক্ষক, নাচের শিক্ষক রেখেছি। আমরা নানা চেষ্টা করে যাচ্ছি পঠনপাঠন ভালো করার। কিন্তু মদ ব্যবসায়ীদের জন্য এলাকার পরিবেশই অস্বস্তিকর হয়ে থাকছে। এলাকার মহিলারা যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন, ওদের সঙ্গে আমরা রয়েছি।’
সম্প্রতি ওই এলাকায় প্রমীলাবাহিনীর আন্দোলনের জেরে সন্ধ্যা থেকে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। দফায় দফায় পুলিশের টহলদারি ভ্যান ঘুরছে। নজর রাখছেন সিভিক ভলান্টিয়াররাও। তবে পুলিশের চোখের আড়ালে, মাঝে মাঝেই প্রতিবাদীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে ওই মদ ব্যবসায়ীদের পরিবারের পক্ষ থেকে। এমনটাই অভিযোগ।
মদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রিয়াংকা সরকার বলেন, ‘ওরা আমাদের দুজনকে মেরেছে। ওরাই আবার আমাদের নামে মিথ্যা মামলা করেছে থানায়। যাই হয়ে যাক, আমরা এই আন্দোলন থেকে সরছি না। এলাকাতে মদের কোনও কারবার করতে দেব না আমরা। এলাকার পরিবেশ ও সেই প্রাথমিক স্কুলের পরিবেশ আমরা সুস্থ ও স্বাভাবিক করে তুলতে চাই।’

