এবছর তো নভেম্বরের শেষদিক থেকেই বেশ শীত শীত ভাব। আর শীতকাল মানেই গুড়ের রসগোল্লা, কমলাভোগে কামড়। কিন্তু বালুরঘাটের মিষ্টির দোকানগুলি থেকে শখ করে যে মিষ্টি কিনে আনছেন, তা খেলে পেটে সইবে তো? মিষ্টি ভেবে কামড় বসাচ্ছেন না তো রাসায়নিকের গোলায়? খোঁজ নিলেন পঙ্কজ মহন্ত
সোমবার দুধবাজারে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকদের অভিযান ছিল চমকপ্রদ। ল্যাক্টোমিটার হাতে তাঁরা হাতেনাতে প্রমাণ করে দিয়েছেন দুধে জলের আধিক্যের বিষয়টি। সেইসঙ্গে মিষ্টির দোকানে যে মিষ্টিগুলো বিক্রি হচ্ছে, সেগুলির মধ্যেও যে ময়দার ভেজাল যথেষ্ট, প্রমাণ করে দিয়েছেন সেটাও। এবার প্রশ্ন উঠছে, দোকানগুলিতে রঙিন মিষ্টির যে রমরমা, তাতে কোনও রাসায়নিক মিশে নেই তো?
বালুরঘাটের (Balurghat) বিভিন্ন দোকানপাট ঘুরে দেখা গেল, কৃত্রিম সুঘ্রাণ থেকে শুরু করে ক্ষতিকর ফুড কালারের অবাধ ব্যবহার চলছে। জিভে জল নিয়ে আসা বিভিন্ন খাদ্যের সুগন্ধ ও মনকাড়া রং তৈরির জন্য এমন রাসায়নিকই ভরসা। তা কিন্তু শরীরের পক্ষে যথেষ্ট ক্ষতিকর। যদিও সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিচ্ছেন শহরের একাধিক মিষ্টি প্রস্তুতকারক।
বালুরঘাটের মঙ্গলপুরের এক মিষ্টির দোকানে এব্যাপারে কথা বলতে গিয়েই গোল বাঁধল। সাংবাদিক পরিচয় না দিয়ে প্রথমে জানতে চাওয়া হল কমলাভোগ মিষ্টি সম্পর্কে। বিক্রেতা দাবি করলেন, তাঁদের দোকানে আসল কমলালেবু ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আসল কমলালেবু ব্যবহার করলে কি এমন গাঢ় কমলা রং ধরে ছানার গোল্লায়? কোন রাসায়নিক ব্যবহার করেন? এপ্রশ্ন করতেই তেড়েমেড়ে দোকান থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন বিক্রেতা। রঘুনাথপুরের এক মিষ্টির দোকানেও একই অভিজ্ঞতা। তাঁরাও দাবি করেছেন, সব মিষ্টি একদম ‘খাঁটি’। কোনও ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। যেটুকু রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, সবই নাকি প্রাকৃতিক ও অনুমোদিত।
এবার যাওয়া গেল শহরের বড় বড় মুদির দোকানে। সেখানে রমরমিয়ে বিক্রি হচ্ছে রাসায়নিক রং। বিক্রেতারা জানালেন, খাবারের দোকানের লোকজনই এমন রাসায়নিকের বড় ক্রেতা। বাজার ঘুরে জানা গেল, কমলাভোগের যে মনকাড়া কমলা রং, তার ‘নেপথ্যশিল্পী’ লেমন ইয়েলো লিকুইড কালার। গুড়ের রসগোল্লার লালচে আভাও আসলে কৃিত্রম। হলুদ রংয়ের সন্দেশেও অনেক সময় মিশছে রাসায়নিক রং। সবুজ রঙের মিষ্টিতেও রাসায়নিক।
বালুরঘাট ব্যবসায়িক সমিতির সম্পাদক হরেরাম সাহা অবশ্য বলেন, ‘অনেকেই মিষ্টিতে ক্ষতিকারক রং ব্যবহার করার অভিযোগ করেন। বিষয়টি আমরা খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরে পরীক্ষা করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছি। তাঁরা যদি তেমন মিষ্টির দোকানদারদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করেন, আমাদের কিছু করার নেই। ব্যবসায়ী বলেই সেইসব ব্যবসায়ীকে সমর্থন করব, এমনটা নয়। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
মিষ্টির উজ্জ্বল রং দেখে খাদ্যরসিকরা আকৃষ্ট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তা স্বাস্থ্যের পক্ষে কতখানি নিরাপদ? বালুরঘাট শহরের ক্রেতারা বলছেন, রংগুলো এমন উজ্জ্বল যে না কিনে থাকা যায় না। কিন্তু খাওয়ার পর অদ্ভুত স্বাদ মুখে লেগে থাকে। চিকিৎসক সঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতে, ‘দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রাসায়নিক রং, সুগন্ধী ব্যবহার করলে লিভার, কিডনি বা ত্বকের সমস্যা বাড়তে পারে।’ শিশুদের ওপর প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে বলেও আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
এমন কথা শুনে স্বভাবতই উদ্বিগ্ন মিলন সংঘের বাসিন্দা, মিষ্টিপ্রেমী তনয় সরকার। বললেন, ‘বাড়িতে অতিথি এলে তাদের জন্য তো মিষ্টি আনতে হয়। মাঝে মাঝে নিজেদের জন্যও আনি। বিভিন্ন দোকানে রংবেরঙের মিষ্টি দেখে সত্যিই লোভনীয় মনে হয়। কিন্তু কীভাবে রংগুলো হয় সেটাও মাথায় ঘুরঘুর করে। তাই সতর্ক থাকতে আমি রঙিন মিষ্টির বদলে রসগোল্লাই বেশি কিনি।’ শহরের বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের নজরদারি বাড়ানো জরুরি। মিষ্টির দোকানগুলিতে হানা দিয়ে উপাদান পরীক্ষা না করলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে। রঙিন মিষ্টির আকর্ষণ বাড়লেও, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সম্ভাব্য বিপদও যে বড় আকার নিচ্ছে, সে কথা মানছেন শহরের অনেকেই।
এই বিষয়ে জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সুদীপ দাসের মন্তব্য, ‘নিয়মিত খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের তরফে বিভিন্ন খাবারের গুণগত মান নিয়ে অভিযান করা হয়। আগামীতে সিন্থেটিক ফুড কালার ও আর্টিফিশিয়াল ফুড এসেন্স নিয়েও অভিযানে নামা হবে। ক্ষতিকারক উপাদান মিললেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

