পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট: ‘দুধে জল’ কথাটা নতুন নয়। কিন্তু বালুরঘাটে (Balurghat) পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে জলের মধ্যে কষ্ট করে দুধ খুঁজতে হচ্ছে। অভিযান চালিয়ে তো প্রশাসনের চোখ কপালে উঠেছে। সোমবার বালুরঘাটের দুধ বাজারে আচমকা হানা দেয় খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। আধিকারিকদের হাতে ল্যাক্টোমিটার, সঙ্গে কর্মী। তাঁদের উপস্থিতি টের পেতেই দুধের বালতি ফেলে চম্পট দেন দুই দুধ ব্যবসায়ী। পরে সেই পরিত্যক্ত দুধ বাজেয়াপ্ত করে গাড়িতে তুলে নেন দপ্তরের কর্মীরা। কেবল দুধ নয়, ভেজালের হদিস মিলেছে মিষ্টিতেও। এদিন মিষ্টির দোকানেও হানা দেন আধিকারিকরা। ছানা বা ক্ষীরের মিষ্টিতে ছানা কম, ময়দার উপস্থিতিই বেশি ধরা পড়েছে তাঁদের পরীক্ষায়।
খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের কেউ অভিযান নিয়ে মন্তব্য করেননি। তবে দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ সুদীপ দাস জানিয়েছেন, ‘অভিযানের কথা আমাকে জানানো হয়েছে। আধিকারিকরা বিভিন্ন পরীক্ষা করে রিপোর্ট তুলে এনেছেন। রিপোর্টের ভিত্তিতে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দুধ বাজার ও বিভিন্ন মিষ্টির দোকান ঘুরে পরীক্ষা করেন খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিক নবনীতা মজুমদার সহ দপ্তরের একাধিক কর্মী। এদিন তাঁদের পরীক্ষায় উঠে এসেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। বহু ব্যবসায়ীর আনা দুধের ঘনত্ব নেমে এসেছে ২০–২৫ মার্কে। যেখানে স্বাভাবিক মান হওয়া উচিত ৩০। অর্থাৎ অতিরিক্ত জল মেশানোর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এদিন পরিদর্শনে গিয়ে আধিকারিকরা দেখতে পান, রসগোল্লা থেকে সন্দেশ- অধিকাংশ মিষ্টিতেই ময়দার পরিমাণ এতটাই বেশি যে নির্দিষ্ট রাসায়নিক দেওয়ার পর রং হয়ে যাচ্ছে কালচে। আধিকারিকরা বুঝিয়ে বলেন যে, মিষ্টিতে সেই রাসায়নিক মেলানোর পর যদি রং কমলা হয় তাহলে বুঝতে হবে তাতে ময়দা নেই। কিন্তু কালো হয়ে যাওয়া মানেই যেন ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’। এদিন পরীক্ষার ফলাফল লিপিবদ্ধ করে ব্যবসায়ীদের নাম লিখে দপ্তর পরে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
দুধ বাজারে প্রতিদিন সকাল থেকে ভিড় জমান শহর ও আশপাশের গ্রামের দুধ ব্যবসায়ীরা। সাধনা মোড় সংলগ্ন রাস্তার ধারে চলে খোলা দুধ বিক্রি। সেই দুধই চোখ বন্ধ করে বিশ্বাসে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন ক্রেতারা। কিন্তু পরীক্ষায় উঠে আসা তথ্য দেখে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। দুধ মূলত শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থদের পথ্য। কিন্তু এমন ভেজাল দুধ পান করলে শরীরের ক্ষতি হবে না তো? আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শহরবাসী। বালুরঘাট জেলা হাসপাতালের পুষ্টিবিদ গুঞ্জা রায় বলেন, ‘বাজারের খোলা দুধে ভেজালের প্রবণতা বেশি। এতে শিশু ও বয়স্কদের পুষ্টিহানি হচ্ছে। প্যাকেটজাত দুধ তুলনামূলক ঘন। আর দোকানের মিষ্টি বিশেষত যেগুলোয় ময়দা বেশি সেগুলোতে ফাইবার নেই, ট্রান্স ফ্যাট প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। তা শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর।’
এদিকে, অভিযুক্ত দুধ ব্যবসায়ী নারায়ণ মণ্ডলের দাবি, ‘ক্রেতারা কখনও অভিযোগ করেননি। দুধ দুইয়ে সরাসরি বাজারে নিয়ে আসি। পরীক্ষায় ফেল হওয়ায় আমিও হতবাক।’
যদিও ভেজাল মিষ্টি ও দুধ বিক্রির ক্ষেত্রে কোনওরকম আপস করতে রাজি নয় বালুরঘাট ব্যবসায়িক সমিতি। ব্যবসায়িক সমিতির সম্পাদক হরেরাম সাহা বলেন, ‘দুধে জল মেশানোর অভিযোগ বহুদিন ধরেই আসছিল। ব্যবসায়ীদের এর আগেও আমরা বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করেছি। আমরা প্রশাসনকে পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। সাধারণ মানুষের স্বার্থে ভেজালের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার ক্ষেত্রে আমাদের কঠোর অবস্থান রয়েছে।’

