রূপায়ণ ভট্টাচার্য
বাংলাদেশের পরিচিত যে সাংবাদিককে ফোন করি না কেন, প্রত্যেকের গলায় একইরকম সংশয় এখন।
‘‘দুটো জায়গায় ভোট দিতে হবে সবাইকে। একটা ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’। আরেকটাতে নির্দিষ্ট প্রতীকে। আমাদের দেশের গ্রামের ক’জন মানুষ ঠিকঠাক কাজটা করবে খুব সন্দেহ আছে।’’
সন্দেহ থাকাটা খুব স্বাভাবিক। আমাদের ভারতেও এমন হলে এই একই রকম সন্দেহ হত। পঞ্চায়েত ভোটের সময়ই গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদের ভোট দিতে নাজেহাল হন অনেকে।
‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটটা কীসের ওপর?
আসলে এই ভোটে (Bangladesh Election 2026) জানতে চাওয়া হচ্ছে, আওয়ামী লিগের আমলের কিছু সংবিধান বদল করতে জনতার সায় আছে কি না! এখন থেকেই বলে দেওয়া যায়, এখানে ‘হ্যাঁ’ ভোটটা জিতবে! পরিবর্তিত জমানায় কে আর ‘না’ ভোটে ভোট দিতে যাবে! সেখানে ভোট দেওয়া মানে তো আওয়ামী লিগকেই ভোট দিতে যাওয়া।
এমনিতে ঢাকায় ফোন করে জানা গেল, আওয়ামীমনস্ক অধিকাংশ ভোটারই ভোট দিতে যাচ্ছেন না! বাংলাদেশের ভোটে নোটা-র কোনও অস্তিত্ব নেই। নইলে হয়তো ভোট দিতে যেতেন এবং নোটায় ছাপটা মারতেন। সে তো আর সম্ভব নয়। তবে যে কয়েকজন যাবেন, তাঁদের ভোটটা বিএনপি-র দিকেই পড়ার সম্ভাবনা। তাঁরা মনে করছেন, জামায়াতে ক্ষমতায় এলে দেশটা আর একটা আফগানিস্তান হয়ে উঠবে।
নিউ ইয়র্কের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যে তথ্য সম্প্রতি পেশ করেছে, তা ইউনূস সরকারের পক্ষে লজ্জার। বলা হয়েছে, আওয়ামী লিগের শত শত নেতা, কর্মী, সমর্থককে সন্দেহজনক হত্যা মামলায় জেলে আটকানো হয়েছে। এঁদের মধ্যে অভিনয়শিল্পী, আইনজীবীরা রয়েছেন।
ইউনূস সরকারের পক্ষে এই তথ্য চরম লজ্জার। ভোটের আগে তিনি ভয়াবহ অবস্থায় রেখে যাচ্ছেন বাংলাদেশকে। শুক্রবারও রংপুরের গাইবান্ধার রাধাগোবিন্দ মন্দিরে মৌলবাদীরা দা, কুড়াল এনে মূর্তি ভাঙচুর করে।
ভোটের আর দেরি নেই বলে জামায়াতে বা বিএনপি (BNP), দুটো বড় পার্টিই নিজেদের স্ট্র্যাটেজি পালটাচ্ছে। যে জামায়াতের আমির ক’দিন আগে আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাস জৈনকে সাফ বলেছিলেন, ‘আমাদের দলে নারী কোনওদিন প্রধান হতে পারবে না, কোনও নারীকে প্রার্থী করা হবে না।’
সেই আমির শফিকুর রহমান নওগাঁর এক জনসভায় যা বলেছেন, শুনলে অবাক লাগবে। ‘এই বাংলাদেশে যাঁরা মাইনরিটি অধিকার নিয়ে বেশি হল্লাচিল্লা করতেন, সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকার আপনাদের পাশে সাঁওতালপল্লিতে (গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ) কী করেছে আপনারা কি দেখেন নাই? তাঁরা কি আমাদের ভাই-বোন না? তাঁরা কি এ দেশের নাগরিক না? আমরা তাঁদের কথা দিচ্ছি, আমরা সবাইকে বুকে ধারণ করে সামনে এগোব। আমরা সবার নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করব।’
নারীদের সম্পর্কে জামায়াতের আমির বলেন, ‘নারীদের হুমকি-ধমকি, গায়ে হাত- এগুলো যদি বন্ধ না রাখেন, তাঁদের মনে করিয়ে দিতে চাই, জুলাইয়ের ১৫ তারিখে মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়ার জন্য যেভাবে যুবক ভাইয়েরা গর্জে উঠেছিল, আবার বিস্ফোরিত হবে, গর্জে উঠবে। মায়ের অপমান সহ্য করবে না।’
বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিপক্ষ নারী এবং তরুণদের ভোট নিয়ে উদ্বিগ্ন। সম্প্রতি বাংলাদেশের ছ’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতে জিতেছে। বাংলাদেশি বন্ধু সাংবাদিকরা বলছেন, ওই ফল থেকে কোনও সিদ্ধান্তে আসা কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে ভোট হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনে এ রকম হবে না। এখানে বিএনপিই এগিয়ে।
বাংলাদেশের এই নির্বাচন ঘিরে পশ্চিম এশিয়ার এক নম্বর চ্যানেল আল জাজিরার উত্সাহ প্রচুর। বড় নেতারা ওখানে ইন্টারভিউ দিচ্ছেন। জামায়াতের আমিরের মতো ইন্টারভিউ দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল। আপনারা কি ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী, এই প্রশ্ন শুনে নতুন তত্ত্ব দিয়েছেন ভদ্রলোক।
ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, বিএনপির লক্ষ্য সব ধর্ম ও সব বিশ্বাসের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা বলে তাঁর ব্যাখ্যা, ‘না, এটা- এটা আমাদের লক্ষ্য নয়। আমাদের লক্ষ্য সব ধর্ম, সব বিশ্বাসের মানুষের অধিকার থাকবে, তারা যেন তাদের ধর্ম পালন করতে পারে এবং তাদের সব অধিকার থাকবে।’ বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশ মুসলমান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সে কারণে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য মোটেও উপযোগী নয়। যদি আমরা অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে কোনও সমস্যা নেই।’
মানে সাপও মরল, আবার লাঠিও ভাঙল না। মুসলিমদের বার্তা দেওয়া হল, ধর্মনিরপেক্ষতা মানছি না। আবার সংখ্যালঘুদেরও চটানো হল না।
ভোটে ফেভারিট বিএনপির একমাত্র ফজলুর রহমানকেই দেখি একেবারে প্রাণ খুলে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য এবং মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জোর গলায় সওয়াল করছেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা বলতে বলতে জনসভায় কেঁদে ফেলেন।
এটা একেবারে সত্যি, জামায়াতের মোকাবিলা করতে গিয়ে বিএনপি আচমকা মুক্তিযুদ্ধের কথা টেনে আনছে। শুধু মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছে না, বলছে, একাত্তরের যুদ্ধে জামায়াতে কীভাবে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। অতীতে বাংলাদেশ দেখেছে, আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে একাধিকবার বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছে, আন্দোলনে নেমেছে। এমনকি সরকারও গড়েছে। তখন তাদের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতা গুরুত্ব পায়নি। এখন আবার তাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধ।
মজা হল, দুটো পার্টিই অতীতে যে অভিযোগ তুলেছে, এবার তাদের ক্ষেত্রে সেটা খেটে যায়। এতদিন তারা বলত. আওয়ামী সরকার তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে দিত না। এবার একই ভুল তারা আবার করছে। আওয়ামী লিগকে নিঃসংকোচে বাদ দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে লড়ছে। যদি প্রশ্ন করেন, ‘আপনার পার্টির সঙ্গে তা হলে কী ফারাক রইল’, তাঁরা ক্রুদ্ধ গলায় বলবেন, ‘ওদের সঙ্গে আমাদের তুলনা করবেন না।’
মজা হল, আওয়ামী লিগকে একেবারে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিলেও তাদের জোটসঙ্গী এরশাদের জোট পার্টি কিন্তু নির্বাচনে লড়ছে। তাদের এককালের দুর্গ রংপুর সামলানোর লোক নেই। নেতা নেই। সমর্থকরা অন্য পার্টিতে চলে গিয়েছে। তবু এরশাদের পার্টি ১৯২ আসনে প্রার্থী দিয়েছে সারা দেশে। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এ নিয়ে মাথাই ঘামাতে চান না।
এই যে ভোট নিয়ে এত তত্ত্বের কচকচি, তাতে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের যায় আসে না কিছু। সে দেশের সুন্দরবনে পশুর নামে নদী আছে একটা। সেই পশুর নদীর তীরে বেআইনিভাবে মাছ ধরে সংসার চালান প্রায় আড়াই হাজার বাসিন্দা। সেখানে লবণাক্ত জলে মাছ ধরার জন্য নামেন চপলারানি মণ্ডল, ক্লারা সরকার, কৃষ্ণা দাসের মতো অনেক নারী। কারও বাড়ি তলিয়ে গিয়েছে, কারও স্বামীর কাঁধ থেকে হাত পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছে বাঘে। বিবিসি বাংলাকে চপলারানি বলছিলেন, ‘আমাদের মানুষরা রাজনীতি খুব কম বুঝি। আমরা বুঝি পেটনীতি।’
অবিকল আমাদের বাংলার সুন্দরবনের কোনও মা-বোনের কথা। এঁরা নিশ্চিতভাবেই জানেন না, এবার বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে রয়েছে গণভোট। প্রত্যেককে দিতে হবে দুটো ভোট। এখানে হ্যাঁ ভোট জিতলে সনদের কতটা বাস্তবে পরিণত হবে, কেউ নিশ্চিত নন। অনেক আইনজীবী পর্যন্ত চূড়ান্ত বিভ্রান্ত। ইউনূসের বিশেষ সহকারী আলী রিয়াজ যা বলেছেন, তাতে আরও গুলিয়ে গিয়েছে ব্যাপারটা। তাঁর দাবি, জুলাই সনদে অনেক সংস্কার থাকলেও গণভোট হবে শুধু সংবিধান সংস্কার সম্পর্কে ৩০টি প্রস্তাব নিয়ে।
বুঝতেই পারছেন, কত জটিল ব্যাপারটা। চপলারানিরা কী করবেন! ঢাকায় ফোন করে যা শুনলাম, তাতে এই বাংলায় যেমন বিজেপির পাখির চোখ উত্তরবঙ্গ, ওই বাংলায় জামায়েতের পাখির চোখও উত্তরবঙ্গ। ৩৩ আসনের মধ্যে ২৯ আসনেই লড়বে তারা।
ঢাকার এক সাংবাদিক স্পষ্ট বললেন, ‘ভোট তো নির্বাচন কমিশন করছে না, করছে ইউনূস সরকার।‘ ইউনূস (Muhammad Yunus) কার জয় চান? স্পষ্ট উত্তর, ‘জামায়াতে, এনসিপি। ইউনূস ওদের সঙ্গে মিলে ক্ষমতায় থাকতে চান। এই চক্রান্তে আমেরিকা, ব্রিটেন, চিন, পাকিস্তান আছে। চিনও নেপথ্যে আছে।’ সংশয় থেকে যায়। একসঙ্গে এতগুলো বিপরীত মেরুর দেশ এক হতে পারে না।
এইসব ভাবতে ভাবতে চোখে পড়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের একটা খবরে। চট্টগ্রাম বন্দরের একটি টার্মিনালের দায়িত্ব পেয়েছে আরব আমিরশাহির প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। যার মালিকের সঙ্গে যৌন অপরাধী এপস্টেইনের সম্পর্ক ছিল। তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে আমেরিকা থেকে জিবুতি। সেই সংস্থাকে জামাই আদরে ডাকল কেন ইউনূস সরকার?
ভোটের বাজারে এই প্রশ্ন তোলার জন্য আর কেউ নেই বাংলাদেশে।

