দু’বছর পর বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে চলেছে। একইসঙ্গে হবে জাতীয় সংস্কারের পক্ষে গণভোট। শেখ হাসিনাহীন পদ্মাপারের ভাগ্য ঠিক হবে এই ভোটে। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লিগের কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করায় এবারের নির্বাচনে নৌকা প্রতীক অনুপস্থিত। লড়াই হচ্ছে মূলত দুই পক্ষের- বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার দল বিএনপি ও একদা তাদের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামি।
ইউনূস জমানায় যে ছাত্র নেতাদের গঠিত এনসিপি এবার জামায়াতের জোটসঙ্গী। এখনও পর্যন্ত সব জনমত সমীক্ষায় এগিয়ে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রীর দৌড়েও পাল্লা ভারী সে দলের চেয়ারম্যান তথা খালেদা-পুত্র তারেক রহমানের। তাঁর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। বিএনপি-র স্লোগান, সবার আগে বাংলাদেশ। অপরদিকে জামায়াতে ডাক দিয়েছে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের।
ভোটের প্রচার থেকে কৌশল, সবেতেই অভিনবত্বের ছোঁয়া দুই শিবিরে। আওয়ামী লিগ ভোট বয়কটের বার্তা দিয়েছে। কিন্তু তা বাংলাদেশে বসবাসকারী হাসিনা সমর্থকরা কতটুকু মানবেন, তা নিয়ে সংশয় যথেষ্ট। কারণ, শীর্ষ নেতৃত্বের প্রায় সকলে হয় দেশান্তরী নয়তো কারাগারে বন্দি। আওয়ামী লিগের সমর্থকদের কাছে টানতে মরিয়া তারেক এবং শফিকুর উভয়েই।
বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। হাসিনাকে উৎখাতের পর এই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার নয়, বরং দেশটির অস্তিত্বের লড়াই। একদিকে শেখ হাসিনা আমলে গত ১৫ বছরের উন্নয়ন ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উত্তরাধিকার, অন্যদিকে রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা- এই দুইয়ের সন্ধিক্ষণে আজ লাল-সবুজের মানচিত্র।
ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর ওপার বাংলায় মৌলবাদী শক্তির আস্ফালন বেড়েছে। রাজাকার, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি এখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে মরিয়া। ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। হাসিনা সহ একাধিক আওয়ামী লিগ নেতা-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা, দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসির নির্দেশ, মুজিবুর রহমানের মূর্তি, তাঁর ঐতিহাসিক ধানমন্ডির বাসভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
প্রথম আলো, ডেইলি স্টার পত্রিকা ছাড়াও ছায়ানট সহ একাধিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা যে উগ্রবাদীদের আস্ফালনের ইঙ্গিত, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি আরও একটা পাকিস্তান হওয়ার পথে? মৌলবাদের এই বিষবৃক্ষে আফগানিস্তানের তালিবানি শাসনের ছায়া দেখার আশঙ্কা অমূলক নয়। নিয়মিত হিন্দু সংখ্যালঘুদের জানমালের ওপর অত্যাচার চলছে।
সংখ্যালঘুদের কাছে টানতে ভোটের প্রচারে বিএনপি, জামায়াতে সক্রিয় হলেও কার্যক্ষেত্রে হিন্দুদের রক্ষায় তাদের দেখা যাচ্ছে না। ফলে হিন্দুদের সমর্থন কোন দিকে, তা স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মজবুত ভিতের ওপর গড়ে ওঠা অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে গত দেড় বছরে লাগাতার কুঠারাঘাত হয়েছে।
ভোটের প্রচারে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান যে আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের কথা বলছেন, তা কট্টরপন্থার মোড়কে নতুন কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়। অপরদিকে বিএনপি-র প্রতিশ্রুতিতে হাসিনা আমলের উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার বার্তা পরিষ্কার। তারেক ভালো করেই জানেন, বিশ্বায়নের যুগে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, কট্টরপন্থী দোসরদের নিয়ন্ত্রণ করার সদিচ্ছা বা ক্ষমতা বিএনপি-র কতটা আছে? ছাত্র নেতা হাদির হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকার রাজপথে ভিড় ও ওই হত্যার বিচার চেয়ে তাঁর সমর্থকদের লাগাতার বিক্ষোভ পরবর্তী সরকারের কাছে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভারতের কাছেও উদ্বেগের।
হাসিনা আমলে ভারতের সন্ত্রাসবাদীদের দমন যে উচ্চতায় পৌঁছেছিল, নতুন সরকার তা থেকে বিচ্যুত হলে নয়াদিল্লি অস্বস্তিতে পড়বে। নয়াদিল্লির জন্য কাম্য এমন এক সরকার, যারা ভারতের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দেবে। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং উন্নয়নের স্পৃহা হারিয়ে পাকিস্তানের দোসরে পরিণত হলে তা হবে ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি।

