উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: চব্বিশের ছাত্র আন্দোলন পাল্টে দিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতির ব্যাকরণ। সেই পালাবদলের ঢেউয়ে ভর করে ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেছিল কট্টরপন্থী মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি হিসেবে পরিচিতি জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami Bangladesh)। বিগত কয়েক মাসে তাদের ‘উদার’ ও ‘প্রগতিশীল’ ভোলবদল নজর কেড়েছিল রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করল, ভোটাররা—বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম—আস্থা রেখেছে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ওপরই, ধর্মীয় পরীক্ষানিরীক্ষায় নয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির বিপুল জয়ে কার্যত কোণঠাসা জামায়াত এখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ‘স্বচ্ছতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ভোলবদল ধোপে টিকল না


নির্বাচনের আগে জামায়াতের আত্মবিশ্বাস ছিল তুঙ্গে। তারা কেবল অংশগ্রহণের জন্য নয়, সরকার গঠনের লক্ষ্যেই মাঠে নেমেছিল। হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন (খুলনা থেকে কৃষ্ণ নন্দী) দেওয়া থেকে শুরু করে নারী অধিকার নিয়ে শফিকুর রহমানের ইতিবাচক মন্তব্য—সবই ছিল জামায়াতের ‘হার্ডলাইন’ ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলার কৌশল। তারা চেয়েছিল ‘অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট’ এবং ‘প্রো-আপরাইজিং’ (গণঅভ্যুত্থানপন্থী) শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে।
কিন্তু নির্বাচনী পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। যে তরুণরা চব্বিশের জুলাই মাসে হাসিনাকে গদিচ্যুত করেছিল, তারা ব্যালট পেপারে সিল মারার সময় জামায়াতের চেয়ে বিএনপিকেই বেশি নিরাপদ মনে করেছে। এমনকি নারী ভোটার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, যাদের মন জয়ে জামায়াত আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল, তারা শেষ মুহূর্তে মুখ ফিরিয়ে ধানের শীষেই ভরসা রেখেছে।
আমেরিকান ‘ফাঁদ’ ও বিএনপির কিস্তিমাত
জামায়াতের এই ভরাডুবির পেছনে অন্যতম বড় কারণ হতে পারে তাদের তথাকথিত ‘কূটনৈতিক সাফল্য’। নির্বাচনের ঠিক আগেই ওয়াশিংটন পোস্ট-এর একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়, আমেরিকার কূটনীতিকদের সঙ্গে জামায়াতের গোপন বোঝাপড়া চলছে। অডিও রেকর্ডিং ফাঁসের সেই দাবিকে হাতিয়ার করে বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনী প্রচারণায় ঝড় তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত ও আমেরিকার এই গোপন আঁতাত দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য বিপজ্জনক।
বিএনপির এই প্রচার কৌশল দারুণ কাজ করেছে। একদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগকে উস্কে দেওয়া গেছে, অন্যদিকে জামায়াতের নিজস্ব কট্টরপন্থী ভোটব্যাংকেও সন্দেহের বীজ বুনতে সক্ষম হয়েছে বিএনপি। ফলস্বরূপ, জামায়াত না পেয়েছে তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’ ভোট, না ধরে রাখতে পেরেছে তাদের ঐতিহ্যবাহী কট্টর সমর্থক।
আওয়ামী লীগের ভোট গেল কোথায়?
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো আওয়ামী লীগের চিরাচরিত ভোটব্যাংকের আচরণ। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং শীর্ষ নেতৃত্ব পলাতক বা কারাবন্দি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভেবেছিলেন, আওয়ামী বিরোধী কট্টর অবস্থানে থাকার কারণে এই ‘অনাথ’ ভোটগুলোর একটি বড় অংশ জামায়াতের বাক্সে যাবে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো চিত্র। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা জামায়াতের ধর্মীয় রাজনীতির চেয়ে বিএনপির উদার জাতীয়তাবাদকে মন্দের ভালো হিসেবে বেছে নিয়েছে। ‘দিল্লিতে দোস্তি’র গুঞ্জন বা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে বিএনপির নমনীয় অবস্থানই হয়তো তাদের আকৃষ্ট করেছে।
শেষের সে দিন
ভোটের ফল প্রকাশের পর যখন মার্কিন দূতাবাস তারেক রহমানকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’-এর জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছে, তখন জামায়াত শিবির থমথমে। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে তাদের ‘গুরুতর প্রশ্ন’ রয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল পিছুটান মাত্র। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে জামায়াত যে ‘কিংমেকার’ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, তা আপাতত সুদূরপরাহত। ভোটাররা বুঝিয়ে দিয়েছেন, তারা পরিবর্তন চেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে তারা কট্টর ধর্মীয় রাজনীতির চেয়ে মূলধারার রাজনৈতিক দলকেই বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন।

