বাংলাদেশের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে সারা দুনিয়া। জাতীয় সংসদের ২৯৯ (শেরপুর ৩ কেন্দ্র বাদে) আসন এবং জুলাই সনদ গণভোট একইসঙ্গে। ফলাফলও একসঙ্গে ঘোষণা হবে। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)-র নেতৃত্বাধীন জোট নাকি জামায়াতে ইসলামির নেতৃত্বে ১১ দলের জোট জিতবে, তা নিয়ে চর্চা বিস্তর। বিএনপি জোট ক্ষমতায় এলে অবধারিত যে প্রধানমন্ত্রী হবেন খালেদা-পুত্র তারেক রহমান। আর জামায়াতে জোট জিতলে প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই শফিকুর রহমান।
ভারত তলে তলে দুই শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। কেননা, যে পক্ষই জিতুক, এটা পরিষ্কার যে, আগামীদিনে ভারতকে খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লিগের সরকারকে দীর্ঘদিন মদত জুগিয়ে যাওয়ায় নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ছাত্র-যুব সমাজের বিরাট অংশের চাপা ক্ষোভ অনেকদিনের। শুধু ছাত্র-যুবরা নয়, সাধারণ মানুষের বড় অংশও দিল্লির হাসিনা সরকারের পাশে দাঁড়ানোকে ভালো চোখে দেখত না।
হাসিনা জমানায় ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে আজও প্রহসন মনে করেন বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ। ২০২৪-এর ৫ অগাস্ট সেদেশের গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দিল্লির প্রতি ক্ষোভ, ক্রোধ, বিরক্তি আরও বেড়েছে বাংলাদেশের অনেক মানুষের।
হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দু’-দু’বার ভারতকে চিঠি পাঠালেও তাতে কর্ণপাত করেনি নয়াদিল্লি। এমনকি প্রাপ্তিস্বীকার ছাড়া ওই চিঠির বিষয়ে প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত জানায়নি। ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, হাসিনাকে কোনওদিনই হয়তো ঢাকার শাসকদের হাতে তুলে দেবে না নয়াদিল্লি। সেটা বুঝে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও বেড়েছে।
ওপার বাংলার ভারতবিদ্বেষের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতেছে মুস্তাফিজুর-কাণ্ড। ভারতের ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেওয়ায় বাংলাদেশের জনমানসে ক্ষোভের আগুন জ্বলে। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) মুস্তাফিজুর যথেষ্ট পরিচিত এবং সফল মুখ। আইপিএলে অনেক টিমেই খেলেছেন তিনি। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে তাই ম্যাচ খেলতে নারাজ বলে জানিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরানোর আবেদন জানিয়েছিল। ভারত তাতেও বাগড়া দেয়। এতে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা ভারতের ওপর ভীষণ চটে যান। সব মিলিয়ে কঠিন সংকটে তাই ভারত-বাংলা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক।
বিবিসি-র খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মানসিকতা কীভাবে বেড়েছে, এবারের ভোট প্রচারে দেওয়াল লিখন, পোস্টার, ফেস্টুনগুলো দেখলে তা বোঝা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে-কানাচে সর্বত্র বিভিন্ন দলের প্রচারে প্রধান নিশানা দিল্লি। হাসিনা আমলে দিল্লির মাতব্বরিকে কেউই ‘ক্ষমা’ করতে নারাজ। ‘Dhaka, not Delhi’- এটাই এবারের প্রচারের মূল সুর।
হাসিনার সময়ের দমনপীড়ন মুখে মুখে ফিরেছে নির্বাচনি প্রচারে। রাষ্ট্রসংঘের হিসেবে জুলাই অভ্যুত্থানে হাসিনার বাহিনীর গুলিতে নিহতের সংখ্যা অন্তত ১৪০০। সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারে অন্যতম প্রধান আলোচ্য এই নিধন যজ্ঞ। ভারতের দিক থেকে অবশ্য সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টার ত্রুটি নেই। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকরকে পাঠিয়েছিল নয়াদিল্লি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো শোকবার্তা তখন খালেদা-পুত্র তারেক রহমানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বিদেশমন্ত্রী।
তারেকের সঙ্গে জয়শংকরের আলোচনা হয় বেশ কিছুক্ষণ। ঘটনার গতিপ্রকৃতিতে আভাস মিলছে, ভোটে আওয়ামী লিগের অনুপস্থিতিতে ভারত বিএনপি’র সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে মরিয়া। যদিও নয়াদিল্লি একইসঙ্গে জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে কথা বলছে। কেন্দ্রীয় বাজেটে বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক কাজে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে মোদি সরকার। তবুও বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের অনেক সংযত এবং সতর্ক থাকার সময় এখন।

