অনিশ্চয়তার আঁধার থেকে অবশেষে মুক্তির আলো দেখল বাংলাদেশ (Bangladesh)। শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) পতন পরবর্তী মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত ১ বছর ৬ মাস পদ্মাপারে কার্যত যে নৈরাজ্যের রাজত্ব চলেছিল, জনতার রায়ে তার অবসান ঘটল ধরে নেওয়া যেতে পারে।
হাসিনার পতনের পর মুখে যে দাবিই করা হোক না কেন, গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে শোষণ, বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি দেওয়ার বদলে নামিয়ে আনা হয়েছিল অসহনীয় পরিবেশে। সেদিক থেকে দেখলে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি (BNP)-র ঐতিহাসিক বিজয় পদ্মাপারে নতুন সূর্যোদয়ের সূচনা করল।
নির্বাচনের পাশাপাশি এবার রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে জুলাই সনদের ভিত্তিতে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। তাতে হ্যাঁ ভোটের পাল্লা ভারী হয়েছে। ফলে জনতার রায়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে বসে তারেক রহমানকে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে হাত দিতে হবে। ভোটের আগে একাধিক জনমত সমীক্ষায় বেগম খালেদা জিয়ার দলের ক্ষমতায় আসার জোরালো আভাস ছিলই। সেই আভাস বাস্তবের মুখ দেখেছে বটে। তবে নির্বাচনের ময়দানে দুরন্ত উত্থান ঘটেছে জামায়াতে ইসলামির। ক্ষমতা দখলের যে স্বপ্ন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান দেখেছিলেন, তা শেষপর্যন্ত বাস্তবায়িত না হলেও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের ফলাফল হেলাফেলার নয়।
তারা যে আসনগুলিতে জয়ী হয়েছে, তার সিংহভাগই পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া। ফলে জামায়াতের মতো মৌলবাদী শক্তি ভারতের ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পেল, যা ভারতের পক্ষে অত্যন্ত উদ্বেগের। নিষেধাজ্ঞার কারণে ভোট ময়দানে গত তিন দশকের মধ্যে এই প্রথম আওয়ামী লিগের নৌকা প্রতীক অনুপস্থিত ছিল। শেখ হাসিনা তাই নির্বাচনকে প্রহসন বলে সমালোচনা করেছেন। দলে দলে মানুষ বুথমুখো হবেন বলে বিএনপি এবং জামায়াতে নেতারা দাবি করলেও শেষমেশ তার প্রতিফলন ঘটেনি আওয়ামী লিগ ভোট বয়কটের ডাক দেওয়ায়। মাত্র ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।
শেখ হাসিনার আমলে নয়াদিল্লির সেই দুশ্চিন্তা দূর হয়েছিল। ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে হাসিনা আমলে যে উষ্ণতার ছোঁয়া লেগেছিল, ইউনূসের দেড় বছরের জমানায় তা পুরোপুরি উধাও হয়ে গিয়েছে। তারেকের জমানায় সেই পুরোনো মিত্রতা ফিরে আসবে কি না,সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
গঙ্গা ও তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি দুই দেশের সম্পর্কে বহু বছর ধরে ছায়া ফেলে আসছে। এই দুটি বিষয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকার কী অবস্থান নেবে, সেদিকে লক্ষ্য রেখে এগোতে হবে নয়াদিল্লিকে। বর্তমান বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষ প্রবল। তারেকও বারবার বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বাধিক প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছেন। ফলে তাঁর নেতৃত্বাধীন নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগোবে বাস্তব পরিস্থিতি মাথায় রেখেই।
হাসিনাহীন বাংলাদেশে পাকিস্তান ও চিনের প্রভাব আগের তুলনায় অনেকটা বেশি। ভারত তড়িঘড়ি তারেক ও তাঁর দলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই বন্ধুত্বের দাম বিএনপি মেটাতে চাইবে একেবারে তাদের নিজেদের শর্তে। বিএনপি-র মতো একটি পরীক্ষিত শক্তির পুনরুত্থান বাংলাদেশকে ইউনূস জমানার নৈরাজ্যের হাত থেকে সাময়িকভাবে মুক্তি দিয়েছে।
কিন্তু জামায়াতে ও পাকিস্তানপন্থী কট্টরপন্থী শক্তিগুলির মরূদ্যানে পরিণত হওয়া বাংলাদেশ যে মবতন্ত্রের স্বাদ পেয়েছে, তাকে ভেবেচিন্তে সামলাতে হবে তারেক এবং বিএনপি নেতৃত্বকে। শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লিগের মতো তাঁর পক্ষে সহজাত ভারতবন্ধু হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। কিন্তু ভারতের মতো একেবারে পাশে থাকা প্রতিবেশীর প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব বজায় রেখেও তাঁর খুব একটা সুবিধা হবে না।

