রূপায়ণ ভট্টাচার্য
শিলিগুড়ি, ইসলামপুর বা জলপাইগুড়ি থেকে পঞ্চগড় খুব কাছেই। বেলা দশটা নাগাদ সেখানে ভোট দিয়ে এনসিপি নেতা সারজিস আলম বলে দিলেন, ‘প্রশাসন শান্তিপূর্ণভাবে ভোট না করলে আমরা কাউকে জিততে দেব না।’ একেবারে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি। উপমহাদেশের সব দলের নেতারাই হারলে বলেন শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়নি। সারজিস তার ব্যতিক্রম নন।
তার কিছুক্ষণ পরে ঢাকা শহরে ভোট দিয়ে যাওয়ার পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যা বললেন, তার মধ্যেও সেই ভয় পাওয়ার প্রতিধ্বনি। ‘বিভিন্ন জায়গায় অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটছে। একটি নির্দিষ্ট দল এরকমভাবে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। এটা মানা হবে না।’ কোনও পার্টির নাম করেননি তারেক। তবে বোঝাই গেছে, তাঁর লক্ষ্য জামায়াতে জোট।
দুই পার্টির দুই বড় নেতার আরও ভয় পাওয়ার কারণ, ভোটের হার অস্বাভাবিক কমে যাওয়া।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভোটের হারের সংখ্যা বলাই হয়নি। অবিশ্বাস্য ঢাকঢাক গুড়গুড় চলছে অনেক রাত পর্যন্ত। অনেকক্ষণ নিস্তব্ধতার পর সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া হল। এটা আসলে স্পষ্টই আওয়ামী লিগের জয়। নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার পার্টি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ভোট বয়কটের। সংখ্যাতত্ত্ব বলছে, দেশের প্রায় অর্ধেক লোক ভোট দেয়নি। অবশ্যই যারা আওয়ামী লিগের সমর্থক। হাসিনা তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন ভোট না দেওয়ায়।
আওয়ামী লিগের অধিকাংশ হিন্দু সমর্থককে বরং ভোট দিতে যেতে হয়েছেই। ভোট না দিলে তাঁরা পরবর্তীতে বিজয়ী দলের কোপে পড়ে যেতে পারেন, সেই স্ট্র্যাটেজি নিয়েই তাঁরা ভোট দিতে গিয়েছেন। আওয়ামী লিগ যেখানে শক্তিশালী যেমন গোপালগঞ্জ যশোর টাঙ্গাইলের কিছু অংশে শুনলাম হিন্দু সমর্থকরা ভোট দিতে যাননি। কেননা সেখানে তাঁদের রক্ষা করার জন্য আওয়ামী লিগের মুসলিম সমর্থকরা আছেন।
কে কী বলবেন পরে, সেটা অন্য বিষয়। ভোট কিন্তু জানিয়ে দিয়ে গেল হাসিনার পক্ষে অনেক লোকই আছেন এখনও।
আওয়ামী লিগের মুক্তিযোদ্ধা নেতা কাদের সিদ্দিকী বলেছিলেন, হাসিনার অপরাধে পার্টিকে কেন নিষিদ্ধ করা হবে। ইতিহাস বলবে, হাসিনার বিরুদ্ধে নির্বাচনে যে একতরফা ভোটের ব্যবস্থার অভিযোগ উঠত, সেটা ইউনূস সরকারের আমলেও হল। এখনই জল্পনা চলতে পারে আওয়ামী লিগ ভোটে থাকলে কী দাঁড়াত ভোটের চেহারা। এখনকার বাংলাদেশে ইউনূস, জামায়াতে ও বিএনপির ঠ্যাঙাড়েবাহিনীর ভয় অস্বীকার করে ভোট দিতে না যাওয়া একটা বিশাল ব্যাপার। হাসিনার পক্ষে এটা টনিক হতে পারে।
এই লেখা যখন পড়বেন তখন মোটামুটি জানা হয়ে গিয়েছে, কোন দল এল ক্ষমতায়। তবুও নির্বাচনের সময় যে বিএনপি ও জামায়াতে জোট নেতারা যথেষ্ট আশঙ্কায় তার একটাই কারণ ভোট কমে যাওয়া। সব সমীক্ষায় বলা হয়েছিল বিএনপি অনেকটাই এগিয়ে। আবার এটাও বলা হয়েছিল, বেশি ভোট পড়লে বিএনপির লাভ, কম ভোট পড়লে জামায়াতের।
বিএনপি কর্তাদের বড় ভয়, ভোট গণনার সময় হিসেব গোলমাল হতে পারে। গণনার দায়িত্বে ইউনূস প্রশাসনের লোকেরা। তাঁদের ওপর একেবারে আস্থা নেই বিএনপির। প্রকাশ্যেই সেকথা বলছেন অনেকে। আগের রাতেই জামায়াতে এবং এনসিপির ভোট দিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছিল বিএনপি।
জামায়াতের ভয়, ছয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোটে তরুণরা তাঁদের জিতিয়ে দিলেও সামগ্রিকভাবে তাঁদের সাম্প্রদায়িক মডেল আম-বাংলাদেশিদের নাপসন্দ।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ভোটের হার কমে যাওয়া বা কম ভোট পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক সূচক। আওয়ামী সমর্থকদের ভোট বয়কট ছাড়া আরও গোটা চারেক কারণ থাকতে পারে। ১) সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ ছিল। তাই ভোটের হার কমে যায়। ২) ‘রেজাল্ট তো জানাই আছে’ —এই মানসিকতা মানুষকে বিমুখ করেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনতা ও একতরফা নির্বাচন একটা কারণ। ৩) ভোটকেন্দ্র দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা জোর করে ভোট দেওয়ার নজির থাকায় অনেক শান্তিপ্রিয় নাগরিক ঝামেলা এড়াতে ভোটকেন্দ্রে যাননি। ৪) দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং দুর্নীতি দেখে মানুষের একটি বড় অংশ রাজনীতিবিমুখ। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ‘যে-ই যায় লঙ্কায়, সে-ই হয় রাবণ’ —এমন ধারণা বদ্ধমূল। ছ’টি বিশ্ববিদ্যালয় জামায়াতে দখল করার পর অনেক মহিলা ভয় পেয়ে গিয়েছেন জামায়াতের আমিনের কথায়।
সকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির উদ্দিন বলেছিলেন, দেশ গণতন্ত্রায়ণের ট্রেনে উঠে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পরে ইউনূস এসে মন্তব্য করেন, আজ নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন।
ভোটারদের এত কম উপস্থিতি কিন্তু তেমন আশাবাদ জাগাচ্ছে না। ফেসবুকে আওয়ামী লিগের সরকারি হ্যান্ডলে ফাঁকা সব ভোটকেন্দ্রের ছবি দেখিয়ে নানা মন্তব্য করা হয়েছে। দুটো তিনটে নমুনা দেওয়া যাক। ১) ইউনূস দেশ নিয়ে খেলছে, আর বাকিরা খেলছে খালি ভোটকেন্দ্রে। ২) ভোট দিতে পারছে না সাধারণ মানুষ, ভোট দেওয়ার আগেই ভোট হয়ে যাচ্ছে। ৩) ফাঁকা ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা।
শুক্রবার যেই জিতুক, আওয়ামী লিগ নেতারা তাঁদের নৈতিক জয় দাবি করতেই পারেন।

