অভিরূপ দে, ময়নাগুড়ি: দূর থেকে দেখলে বোঝা মুশকিল যে এটা কোনও মন্দির! একটা বড় বট গাছ। তার ঠিক পাশেই কতগুলি বড় বড় পাথর সাজানো রয়েছে। দেখভালের অভাবে সেগুলি শ্যাওলা পড়ে সবুজ হয়ে গিয়েছে। সাজানো পাথরগুলির মাথায় টিনের ছাউনি। সবমিলিয়ে সেটি একটি ঘরের রূপ নিয়েছে। আর সেই ঘরের পিছনে রয়েছে বাঁশের জঙ্গল। সবমিলিয়ে এক নিঃস্তব্ধ পরিবেশ। এখানেই প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন বটেশ্বর মন্দির (Bateshwar Temple)।
মন্দিরের পূর্ব দিকে বয়ে গিয়েছে জরদা নদী৷ তারই মধ্যে রয়েছে মন্দিরের ভগ্নস্তূপ। রয়েছে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা পাথরের টুকরো৷ মন্দিরের সামনে পাথরে খোদাই করা একটি মঙ্গলঘট রয়েছে। আর ভেতরের পাথরের স্তূপের বেশিরভাগের মধ্যেই হরেক কারুকাজ। কোনওটিতে ধ্যানরত যোগীমূর্তি, কোনওটিতে আবার প্রস্ফুটিত পদ্ম, কোনওটিতে হাতির ছবি। পাশাপাশি যোগাসনে উপবিষ্ট যে মূর্তিটি রয়েছে, তা দেখে মনে হয় তিনি কোনও লৌকিক ধর্মগুরু।
প্রকাণ্ড বট গাছের নীচে ছায়ার মধ্যে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশের সময় দু’পাশে দুটি পাথরের খিলান। মাটির নীচে আছে শিবলিঙ্গ। অনাদর, অযত্ন, অবহেলা আর সংরক্ষণের অভাবে পরিত্যক্ত এই চিহ্নগুলির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে যেন আজও সোনালি অতীত কথা বলে।
বটেশ্বর মন্দিরের এই দেবস্থানের প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে সেভাবে কিছু জানা যায়নি। কেউ বলেন, মন্দিরের প্রতিষ্ঠা পাল যুগে, কারও মতে এই মন্দির গুপ্ত যুগের। বটেশ্বর মন্দির জল্পেশ ও জটিলেশ্বর মন্দির-এর সমসাময়িক সপ্তম কিংবা অষ্টম শতাব্দীতে নির্মিত বলেও দাবি করা হয়। বাংলার আর পাঁচটা মন্দিরের মতো এই মন্দিরে পোড়ামাটির ইটের ব্যবহার নেই। মন্দিরের সবটাই বেলেপাথর দিয়ে তৈরি। গবেষকরা জানিয়েছেন, বটেশ্বর ছাড়া উত্তরবঙ্গে কোনও মন্দিরে বেলেপাথরের কারুকার্য পাওয়া যায়নি। মন্দিরের ভগ্নস্তূপ বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই মন্দিরের সঙ্গে অসমের কামাখ্যা মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর মিল রয়েছে। আবার বিশেষজ্ঞদের এক অংশের মতে, এটি আদতে বৌদ্ধ স্তূপ।
ঐতিহাসিক সার্জেন জর্জ রেনি বটেশ্বর মন্দির নিয়ে তাঁর গবেষণায় লিখেছেন, অষ্টম শতাব্দীতে ইংরেজদের তাড়া খেয়ে পালিয়ে যাবার সময় ভুটানি সেনাবাহিনী বটেশ্বর মন্দিরে সোনা ও অন্য মূল্যবান সম্পদ লুকিয়ে রেখেছিল। ভুটানি সেনারা পালিয়ে যাবার পর ব্রিটিশ সেনা বটেশ্বর মন্দিরে প্রবেশ করে সেই সোনা ও সম্পদের খোঁজ করে। সেসময় তারা মন্দিরটি ভেঙে চুরমার করে দেয়। ফলে বিপুল ক্ষতি হয় উত্তরবঙ্গের প্রাচীন মন্দিরটির। সব মিলিয়ে আজও ভগ্নস্তূপের মধ্যে থেকে অনেক কথা বলে চলে প্রাচীন বটেশ্বর মন্দির।

