উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: মৃগী একটি সাধারণ স্নায়বিক রোগ, যা সারাবিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করে। এটি কোনও মনোরোগ নয়, কোনও অভিশাপও নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক ক্রিয়ার একটি অসামঞ্জস্য, যা সঠিক চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। জাতীয় মৃগী সচেতনতা মাসে কলম ধরলেন কোচবিহারের ডাঃ পিকে সাহা হাসপাতালের সিনিয়ার কনসালট্যান্ট (নিউরোঅ্যানাস্থিশিয়া) ডাঃ কৌস্তভ দত্ত।
মৃগী বোঝার জন্য প্রথমে খিঁচুনি (Seizures) কী তা বুঝতে হবে। আমাদের মস্তিষ্কে বিলিয়ন বিলিয়ন সেল বা কোষ একে-অপরের সঙ্গে সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। সহজভাবে বললে, খিঁচুনি হল হঠাৎ এবং সাময়িক ‘বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট’, যা এই স্বাভাবিক যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটায়। এই অল্প সময়ের ‘ঝড়’-ই সাময়িকভাবে চেতনা হারানো, দৃষ্টি লোপ বা অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়ার কারণ হয়। অন্যদিকে, মৃগী এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা, যেখানে রোগীর মধ্যে এমন অনিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক ঝড় (খিঁচুনি) বারবার ঘটার প্রবণতা থাকে।
প্রাথমিক সতর্ক সংকেতঃ ‘অরা’ চিনুন
সব খিঁচুনি হঠাৎ করে হয় না। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে খিঁচুনি শুরু হয় ‘অরা’ নামের একটি অনুভূতি দিয়ে। অরা আসলে খিঁচুনির প্রাথমিক ধাপ, যা তখনও সীমিত অংশে থাকে। এটি চিনতে পারা নিরাপত্তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
যা লক্ষ করবেন
অরা হতে পারে হঠাৎ পেটে একধরনের ওঠানামার অনুভূতি, তীব্র ভয় বা আগেও এই জায়গায় ছিলাম এমন অনুভূতি, পোড়া রাবারের মতো অদ্ভুত গন্ধ বা চোখের সামনে আলোর ঝলক দেখা।
কী করতে হবে
যদি রোগী বুঝতে পারেন যে তাঁর অরা শুরু হয়েছে, তাহলে তিনি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন এবং দ্রুত নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে পারেন বিশেষ করে আগুন, জল বা উঁচু জায়গা থেকে দূরে।
চিকিৎসা
উন্নত এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার যুগে জটিলতম মৃগী রোগীরও চিকিৎসা করা সম্ভব। যাঁদের খিঁচুনি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী— যেমন, রিফ্র্যাক্টরি স্ট্যাটাস এপিলেপটিকাস (আরএসই) অর্থাৎ এমন খিঁচুনি যা ৩০ মিনিটেরও বেশি স্থায়ী হয় বা একের পর এক খিঁচুনি হয়। কিন্তু রোগী পুরোপুরি সেরে উঠতে পারেন না এবং সাধারণ ওষুধেও কাজ হয় না। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় এমন রোগী জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পান। প্রয়োজনে অ্যানাস্থেটিক ওষুধের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার করে সম্পূর্ণ খিঁচুনি দমন করা হয়, যাতে মস্তিষ্কের ক্ষতি বন্ধ করা যায়। এই অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়াটি নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞ টিমের সহায়তায় সম্পন্ন হয়।
ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ
অ্যান্টি-সিজার মেডিকেশন (এএসএম) বা খিঁচুনি প্রতিরোধক ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীর খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এইসব ওষুধ মস্তিষ্কের বিদ্যুৎ চলাচল স্বাভাবিক রাখে, যাতে নতুন বিদ্যুৎ চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ওষুধ সঠিকভাবে খাওয়া। একটি ডোজ বাদ পড়লে রক্তে ওষুধের মাত্রা নেমে যেতে পারে। তখন হঠাৎ তীব্র খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। নিয়মিত ও নির্ধারিত সময়ে ওষুধ খাওয়া সবচেয়ে ভালো প্রতিরক্ষা।
যেসব নিয়ম মেনে চলবেন
- একা কখনও সাঁতার কাটবেন না। পাশে এমন কেউ থাকবেন যিনি খিঁচুনির সময় কীভাবে সাহায্য করতে হয় জানেন।
- একা রান্না করবেন না, বিশেষ করে খোলা আগুনে বা ডিপ ফ্রাই করার সময়। হিটার বা গরম তরল থেকে সতর্ক থাকুন।
- ঘুমের অভাব খিঁচুনি বাড়িয়ে দিতে পারে, তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত সময় ঘুমোন।
খিঁচুনি হলে কী করবেন
সময় দেখুন – খিঁচুনি ৫ মিনিটের বেশি চললে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুল্যান্স ডাকুন।
চারপাশ পরিষ্কার রাখুন – ধারালো বা শক্ত জিনিস সরিয়ে ফেলুন।
মাথার নীচে নরম কিছু দিন – যাতে আঘাত না লাগে।
খিঁচুনি থামার পর রোগীকে পাশ ফেরান যাতে শ্বাসনালি অবরুদ্ধ না থাকে।
কী করবেন না
মুখে কিছু ঢোকাবেন না। সিনেমায় যা দেখানো হয়, তা সম্পূর্ণ ভুল।
জোর করে ধরে রাখবেন না।

