গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও শর্ত ছাপিয়ে বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছিল বাংলা। জনমতের স্বাভাবিক প্রতিফলনের বদলে ছলেবলে-কৌশলে সমর্থন ছিনিয়ে নেওয়ার উন্মত্ত প্রতিযোগিতা ছিল এই নির্বাচনের অঙ্গ। ভোটগ্রহণের মধ্যে দিয়ে সেই পর্ব শেষ হলেও রণংদেহি পরিস্থিতির কোনও বদল ঘটেনি। বরং ভোটগণনাকে কেন্দ্র করে আরেক যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে কোনওকিছু হওয়ার বদলে প্রতিটি ক্ষেত্রে চড়া মেজাজ ঠিকরে পড়ছে।
স্ট্রংরুমগুলি হয়ে উঠেছে সেই যুদ্ধের দুর্গের মতো। যকের ধন আগলাতেও হয়তো এত দুর্ভেদ্য নিরাপত্তার দরকার হয় না। স্ট্রংরুমে যেন কোনও এক রাজার নয়, সাত রাজার ধন। এখানে রাজার বদলে রাজনৈতিক দলের সমর্থন ইভিএম বন্দি হয়ে স্ট্রংরুমে বন্দি। সেই ঘরটির ভেতরে-বাইরে, চারদিকে সিসিটিভি ক্যামেরায় নজরদারি, প্রবেশপথে নিশ্চল অতন্দ্র প্রহরী, বাইরে নিরাপত্তারক্ষীদের ভারী বুটের শব্দ ইত্যাদিতে পুরোপুরি দুর্গের চেহারা।
যে দুর্গের মালিকানা কোনও রাজনৈতিক দলের হাতে নেই। দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের হাতে। কমিশনের ভূমিকা কিছুটা রেফারির মতো হওয়ার কথা। দুই বা ততোধিক দলের নির্বাচনি যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করে হারজিত ঘোষণা করার এক্তিয়ার কমিশনের। কিন্তু নির্বাচনি যুদ্ধের মতো গণনা পর্বকে কেন্দ্র করেও চরম অবিশ্বাস ও সন্দেহের বাতাবরণ সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বিষিয়ে তুলেছে। দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরি হলেও নির্বাচন কমিশন প্রশংসা পাচ্ছে না।
বরং প্রতিপদে আশঙ্কার আবহাওয়া ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে, স্ট্রংরুম নিরাপদ নয়। এত নজরদারি, টহলদারি, দিনরাতের পাহারা থাকলেও ইভিএমে কারচুপির আশঙ্কা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি পদক্ষেপের দৃঢ় সমর্থক হলেও বিজেপি নিশ্চিন্ত নয়। তাদের দলীয় প্রতিনিধিরা পালা করে পড়ে রয়েছেন স্ট্রংরুমের বাইরে। এমনকি, স্ট্রংরুমের কিছুটা দূরে শিবির করার প্রতিযোগিতা দেখা গিয়েছে আলিপুরদুয়ার শহরের মতো কিছু জায়গায়।
যাতে স্পষ্ট যে, নির্বাচন কমিশনের ওপর কোনও দলের অগাধ ও সম্পূর্ণ আস্থা নেই। এমনকি দেশের সুরক্ষায় নিয়োজিত নিরাপত্তাবাহিনী স্ট্রংরুমে মোতায়েন থাকলেও তাদের ওপর পুরোপুরি বিশ্বাসের অভাব প্রকট। রাজনৈতিক দলগুলির পরস্পরের মধ্যে আস্থা, বিশ্বাস দূরের কথা, পরস্পরের প্রতি সন্দেহ-অবিশ্বাস কার্যত ঘৃণার চেহারা নিয়েছে। যা থেকে উত্তেজনা তো বটেই, কোথাও কোথাও হিংসার বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন সময়। স্ট্রংরুমকে ঘিরে মাঝে মাঝে উত্তাপ বাড়ছে।
নির্বাচন কমিশনও রাজনৈতিক দলগুলিকে বিশ্বাস করছে না। নির্বাচনের প্রার্থী কোনও কোনও মন্ত্রীকে পর্যন্ত স্ট্রংরুমের দোরগোড়ায় হেনস্তার কবলে পড়তে হচ্ছে। মন্ত্রীর প্রাপ্য মর্যাদা তাঁকে বা তাঁদের দিচ্ছে না কমিশন নিযুক্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী। কোনও কোনও ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘বাবু যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ’ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ধরে আনতে বললে যেন বেঁধে আনা দস্তুর হয়ে উঠছে।
স্ট্রংরুমকে ঘিরে এই যুদ্ধের আবহের প্রভাব যে গণনাকেন্দ্রেও পড়বে, তার আভাস স্পষ্ট। নির্বাচন কমিশন একদিকে নানাবিধ কড়াকড়ি, বিধিনিষেধ ইত্যাদি আরোপ করেছে গণনাকেন্দ্রে। অন্যদিকে, গণনাকেন্দ্রকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলির নানাবিধ পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। দলের গণনাকর্মীদের যে ধরনের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, তা আসলে যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমি না ছাড়ার শামিল। মানুষের সমর্থন চুরি বা কারচুিপ করার অভিযোগ-পালটা অভিযোগ নির্বাচনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটিকে প্রতি পদে রণংদেহি করে তুলছে।
যুদ্ধের মেজাজে ভোটগণনা হতে চলেছে বলেই অশান্তির আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। গণনাকেন্দ্রের বাইরে প্রথম থেকে রণংদেহি মেজাজ থাকবে নিশ্চিত। যেসব কেন্দ্রে নির্বাচনি লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হবে, সেখানে এই মেজাজ উগ্র হয়ে উঠতে পারে। তা থেকে অশান্তি, হিংসার সম্ভাবনা থেকে যায়। একশ্রেণির মানুষের মধ্যে নির্বাচনকে ঘিরে যে বিদ্বেষের বীজ বপন হয়ে গিয়েছে, তা শুধু কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। বিপদ সেখানেই।



