পালাবদল এবং হাওয়ামোরগ প্রশাসন

শেষ আপডেট:

পল্লব বসু

রাজ্যপাটের যখন হাতবদল হয়, তখন সেই পরিবর্তনের ঘ্রাণ সবচেয়ে আগে কারা পান? রাজনীতির কারবারিরা মনে করেন, শাসকের পায়ের তলার মাটি যখন আলগা হতে শুরু করে, তখন সবচেয়ে আগে ‘হাওয়ামোরগ’-এর মতো দিক পরিবর্তন করেন উর্দিধারী পুলিশ এবং প্রশাসনিক আমলারা। এবারের বাংলার হাই ভোল্টেজ নির্বাচনেও তার কোনও ব্যতিক্রম হয়নি। তা না হলে কে কবে ভাবতে পেরেছিল যে, খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের ভাইকে বুথের কাছাকাছি জায়গায় ভিড় করতে দেখে কলকাতা পুলিশের একজন তরুণ আধিকারিক সটান আঙুল উঁচিয়ে বাধা দেবেন? এই একটি দৃশ্যই রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণের নিখুঁত ছবিটা ফুটিয়ে তুলেছিল। বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, শাসকদলের দাপটে তৈরি হওয়া ভয়ের চাদরটা এবার সরে গিয়েছে। পুলিশের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস ফিরে এসেছে, কারণ নীচুতলার কর্মীরা আগেই আঁচ করেছিলেন যে, ক্ষমতার ভরকেন্দ্রটা আর নবান্নের ১৪ তলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে বসে নেই।

শুধু পুলিশ নয়, গোটা প্রশাসনিক স্তরেও এই পরিবর্তনের হাওয়া একেবারে স্পষ্ট ছিল। বিডিও, এসডিও থেকে শুরু করে ডিএম— জেলার কর্তারা নির্বাচনের দিনগুলোতে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলেন অত্যন্ত সুকৌশলে। একটা সময় আমলাদের একাংশ শাসকদলের ‘ক্যাডার’-এর মতো কাজ করতেন বলে বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল। কিন্তু এবার সেই অন্ধ আনুগত্যের জায়গায় দেখা গেল এক সতর্ক দূরত্ব। কর্তারা খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন, হাওয়া যেদিকে বইছে তাতে স্থানীয় নেতাদের বেআইনি সুবিধা পাইয়ে দিলে আখেরে নিজেদের বিপদই বাড়বে। তাই তাঁরা নিরপেক্ষতার বর্ম গায়ে চাপিয়ে নিয়েছিলেন। বুথ স্তরে শাসকদলের নেতারা যখন প্রশাসনিক সাহায্যের জন্য হাহাকার করছেন, তখন আমলাদের এই হঠাৎ ‘নিয়মনিষ্ঠ’ হয়ে ওঠাই ছিল পরিবর্তনের আসল দেওয়াল লিখন।

এই দেওয়াল লিখন যে খোদ তৃণমূল নেত্রীর চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল, তা কিন্তু নয়। কয়েক দশকের লড়াকু জীবনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার মাটির স্পন্দন সবচেয়ে ভালো বোঝেন। তাই তাঁর শরীরী ভাষাতেই আসন্ন পতনের ছায়া ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। একুশের নির্বাচনে হুইলচেয়ারে বসে ‘খেলা হবে’ স্লোগানে যে আগ্রাসী মেজাজ দেখা গিয়েছিল, এবার তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। ভোটের প্রচারের শেষ দিকে তাঁর আত্মবিশ্বাসের জায়গা নিচ্ছিল এক অদ্ভুত অসহায়তা ও ক্লান্তি। শুধু তাই নয়, গণনা শুরুর আগেই শাসকদল যেন হারের জন্য জমি তৈরি করতে শুরু করেছিল। ইভিএম হ্যাক হওয়ার তত্ত্ব বা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে আসলে আসন্ন হারের একটা সম্মানজনক অজুহাত খাড়া করার চেষ্টাই প্রকট হচ্ছিল।

অথচ এই গোটা ডামাডোলে সবচেয়ে অবাক করা ভূমিকা ছিল রাজ্যের একাংশ সংবাদমাধ্যমের। ক্ষমতার পালাবদলের ইঙ্গিত যখন একজন সাধারণ পুলিশ কনস্টেবল পড়তে পারছিলেন, তখন বহু ‘সিনিয়ার’ সাংবাদিক ও বিশ্লেষকের অন্ধত্ব ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। গ্রাউন্ড জিরোর বাস্তবতা এড়িয়ে তাঁরা ক্রমাগত শাসকদলের পক্ষে একটি সমান্তরাল বয়ান তৈরি করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। এর নেপথ্যে অন্ধ আনুগত্য নাকি রোষানলের ভয়— সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রশাসন নিজের পিঠ বাঁচাতে হাওয়ার দিকে ঘোরে, আর শাসক হার বুঝতে পেরে অজুহাত খোঁজে— রাজনীতিতে এটাই দস্তুর। কিন্তু সমাজের দর্পণ হিসেবে সংবাদমাধ্যমের কাজ ছিল আসল ছবিটা নির্লিপ্তভাবে তুলে ধরা। দুর্ভাগ্যবশত, পুলিশের মেরুদণ্ড যে সাহসের পরিচয় দিল, একাংশের কলমচিদের লেখায় তা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হল।

(লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

উন্নয়নের নতুন ভোরে বাংলা

হরদীপ সিং পুরী হাওড়াকে একসময় বলা হত এশিয়ার শেফিল্ড। হুগল...

অভিষেকের ঘাড়েই হারের দায়

সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায় রাজনীতির ময়দান আর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট বোর্ডের মিটিং যে...

বাংলার রাজনীতিতে এক নয়া অধ্যায়

সাত দশকের চেনা রাজনৈতিক ব্যাকরণ বদলে রাজ্যের মসনদে এবার...

পূর্ণ বৃত্ত পেল এক দীর্ঘ ইতিহাস

নন্দীগ্রামের লড়াই থেকে ব্রিগেডের মঞ্চ, এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও...