নীহারিকা সরকার
নির্বাচনের আবহে একটি রাজ্যের রাজনৈতিক তর্জা কতটা নিম্নগামী হতে পারে, গোটা বাংলা আজ তারই নগ্ন ও হাস্যকর উদাহরণ রুদ্ধশ্বাসে দেখছে। একটা রাজ্যে যখন বেকারত্বের জ্বালায় লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত তরুণ-তরুণী ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন, একের পর এক নিয়োগ দুর্নীতিতে যখন শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে, তখন সেই রাজ্যের নির্বাচনি প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এক অদ্ভুত এবং অলীক প্রশ্ন- বাঙালির পাতে আর মাছ-ভাত জুটবে তো? শাসক ও বিরোধী দলের লড়াইটা এখন আর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান বা শিল্পের ব্লু-প্রিন্টে নেই, তা কার্যত আটকে গেছে বাঙালির হেঁশেল আর বাজারের ব্যাগের ভেতর। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আচমকাই তাঁর প্রতিটি নির্বাচনি সভা থেকে এক প্রবল আতঙ্কের বাণ ছুড়তে শুরু করেছেন। তাঁর স্পষ্ট দাবি, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার মানুষকে আর মাছ-মাংস খেতে দেবে না, জোর করে নিরামিষাশী বানিয়ে দেবে। আপাতদৃষ্টিতে এই দাবিটি হাস্যকর এবং ভিত্তিহীন মনে হলেও, এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক অত্যন্ত সুচতুর, গভীর এবং নিখুঁত রাজনৈতিক মগজধোলাইয়ের অঙ্ক।
পোড়খাওয়া এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব ভালো করেই জানেন, নির্বাচনের ময়দানে কঠিন যুক্তি বা অর্থনীতির খতিয়ান দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায় না। সাধারণ মানুষ যুক্তির চেয়ে আবেগে বেশি বশ মানেন। আর বাঙালির কাছে তার সংস্কৃতি, ভাষা এবং সর্বোপরি তার খাদ্যাভ্যাস হল সেই পরম আবেগ, যেখানে আঘাত লাগলে সে অন্ধের মতো প্রতিক্রিয়া দেখায়। মাছ-ভাত শুধু বাঙালির খাবার নয়, এটি তার আত্মপরিচয়, যাপনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাই ভোটের মুখে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়ার রূঢ় বাস্তবকে ধামাচাপা দেওয়ার এর চেয়ে মোক্ষম ‘ট্রাম্প কার্ড’ আর কী হতে পারে? কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ- প্রতিটি জনসভায় দাঁড়িয়ে তিনি যখন মা-বোনেদের উদ্দেশে বলছেন, ‘ওরা এলে আপনাদের মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেবে, মাংস রান্না করতে দেবে না’, তখন তিনি আসলে অত্যন্ত সুকৌশলে রাজ্যের আসল সমস্যাগুলো থেকে ভোটারের চোখ ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। বেকারত্ব, দুর্নীতি বা সন্দেশখালির মতো ইস্যুগুলোর মোকাবিলা করার চেয়ে, বাঙালির মনে এই ‘অস্তিত্বের সংকট’ তৈরি করাটা অনেক বেশি সহজ এবং ভোটের অঙ্কে তা জাদুমন্ত্রের মতো কাজ করে।
কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় বিচার করলেই এই আতঙ্কের ফানুসটা চুপসে যায়। সত্যিই কি বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে মানুষ মাছ-মাংস খায় না? ভারতের মানচিত্রের দিকে তাকালেই বাস্তব চিত্রটা পরিষ্কার হয়ে যায়। পড়শি রাজ্য অসম বা ত্রিপুরায় বিজেপির সরকার রয়েছে। সেখানকার মানুষের প্রধান খাদ্যও কিন্তু মাছ-ভাত। ত্রিপুরায় তো বাঙালির চেয়েও বেশি মাছের পদ রান্না হয়। সেখানে কি কারও পাতে মাছ পড়া বন্ধ হয়েছে? মহারাষ্ট্র বা গোয়ার মতো রাজ্যগুলোতে, যেখানে দীর্ঘসময় ধরে বিজেপি ক্ষমতায় আছে বা ছিল, সেখানকার মানুষের একটা বড় অংশ কট্টর আমিষাশী। সমুদ্রঘেরা গোয়া বা মহারাষ্ট্রের কঙ্কণ উপকূলে সি-ফুড বা মাছ ছাড়া মানুষের একদিনও চলে না। এমনকি গোয়া বা উত্তর-পূর্বের অনেক বিজেপি শাসিত রাজ্যে প্রকাশ্যে গোরুর মাংসও খাওয়া হয়, যা নিয়ে সেভাবে কোনও আইনি বা সামাজিক বাধাও নেই। তাহলে হঠাৎ করে শুধুমাত্র বাংলায় এসেই বিজেপি সবার পাত থেকে মাছের ঝোল কেড়ে নেবে- এমন অযৌক্তিক তত্ত্ব কীভাবে হালে পানি পায়? উত্তরটা খুব সহজ। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য তথ্য বা সত্যের কোনও প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় শুধু একটা ভয় তৈরি করার। আর সেই ভয়ের রাজনীতিতেই এখন বাংলা আচ্ছন্ন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হল, রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি-ও শাসকদলের এই সুকৌশলী ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে পিচে খেলাতে চেয়েছেন, বিজেপি ঠিক সেই পিচেই খেলতে নেমে নিজেদের হাস্যাস্পদ করে তুলছে। শাসকদলকে দুর্নীতি, নারী নির্যাতন বা শিল্পহীনতার মতো জ্বলন্ত ইস্যুতে ক্রমাগত আক্রমণ করে ব্যাকফুটে ফেলার বদলে, গেরুয়া শিবিরের নেতারা এখন প্রমাণ করতে ব্যস্ত যে তাঁরা কতটা মাছ-মাংস খেতে ভালোবাসেন! রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতা শমীক ভট্টাচার্যকে টিভি ক্যামেরার সামনে বসে রীতিমতো কবজি ডুবিয়ে মাছ-ভাত খেতে দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিজেপির কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য নেতারা জনসভায় দাঁড়িয়ে রীতিমতো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, ‘বিজেপি ক্ষমতায় এলে পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হবেন একজন পুরোদস্তুর আমিষাশী বাঙালি।’ বিরোধী শিবিরের এই চরম আত্মরক্ষামূলক কৌশল দেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও হতবাক। যে দলের কাজ ছিল রাজ্যের অর্থনৈতিক দেউলিয়া দশা নিয়ে শাসকদলের ঘুম উড়িয়ে দেওয়া, তারা কিনা এখন মাছ-মাংসের গ্যারান্টি কার্ড বিলি করছে! রাজনীতির এই ভিত্তিহীন তর্জায় আসলে জয় হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই সুনিপুণ স্ট্র্যাটেজিরই, যা তিনি অত্যন্ত সন্তর্পণে বুনেছেন।
এই মাছ-ভাতের সস্তা রাজনীতির ডামাডোলে আজ বাংলার আসল এবং জ্বলন্ত ইস্যুগুলো কার্যত ব্যাকসিটে চলে গেছে। যে রাজ্যে শিক্ষিত বেকার তরুণরা মাসে মাত্র ১৫০০ টাকার ‘যুবসাথী’ অনুদান পাওয়ার জন্য সরকারি ক্যাম্পগুলোতে মাইলের পর মাইল লাইন দিচ্ছেন, সেখানে কর্মসংস্থানের কোনও সুনির্দিষ্ট দিশা নেই কেন- সেই প্রশ্নটা আজ আর কেউ করছে না। নিয়োগ দুর্নীতির জেরে যাঁদের যৌবন আজ রাজপথের ধর্নামঞ্চে তিল তিল করে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী? রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশা, পরিকাঠামোর অভাব, অনুৎপাদক খয়রাতির জেরে রাজ্যের মাথায় চেপে বসা ঋণের বিশাল পাহাড়- এই সব জীবনমরণের প্রশ্নগুলো আজ মাছের বাজারের কোলাহলে তলিয়ে গেছে। নীতি আয়োগের মতো সংস্থা যখন বলছে যে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার নিরিখে বাংলা আজ দেশের একেবারে তলানিতে, তখন সেই লজ্জাজনক পরিসংখ্যান নিয়ে কোনও রাজনৈতিক দলেরই যেন মাথাব্যথা নেই। কারণ, উভয় পক্ষই বুঝে গেছে যে, সাধারণ মানুষকে এই সস্তা আবেগের আফিমে ভুলিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে নিরাপদ।
বাঙালির মননশীলতা এবং রাজনৈতিক চেতনার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। একসময় এই বাংলা গোটা দেশকে পথ দেখাত। কিন্তু আজ সেই বাঙালির রাজনৈতিক চর্চা এমন এক তলানিতে এসে ঠেকেছে, যা দেখলে সত্যিই শিউরে উঠতে হয়। রাজনৈতিক দলগুলো হয়তো তাদের নিজস্ব সমীকরণ এবং ভোটব্যাংকের স্বার্থে এই ধরনের অপপ্রচার চালাবেই, কিন্তু রাজ্যের সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজ কি সত্যিই এত বোকা? তাঁরা কি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে, ভোটের বোতাম টিপলে তাঁদের হাঁড়ির খবর কেউ নিয়ন্ত্রণ করবে?
সময় এসেছে এই আবেগের রাজনীতিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার। শাসকদলকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে, মানুষের পকেটে যদি রোজগার না থাকে, কর্মসংস্থানের অভাবে রাজ্যের তরুণ প্রজন্মকে পরিযায়ী শ্রমিকের তকমা নিয়ে যদি ভিনরাজ্যে ছুটতে হয়, তবে সেই শূন্য পকেটে বাজারে গিয়ে মাছ কেনার ক্ষমতা কারও থাকবে না। মাছ-ভাতের অধিকার কেউ কেড়ে নেয় না, কিন্তু অর্থনৈতিক দেউলিয়া দশা মানুষকে অনাহারে ঠেলে দেয়। তাই ভোটের ময়দানে মাছ-মাংসের তর্জা বন্ধ করে, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত বাংলার হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার এবং কর্মসংস্থানের ব্লু-প্রিন্ট নিয়ে মানুষের সামনে আসা। তা না হলে, এই অপসংস্কৃতি এবং সস্তা আবেগের রাজনীতি বাংলার ভবিষ্যৎকে এমন এক খাদের কিনারায় ঠেলে দেবে, যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনও পথ খোলা থাকবে না।
(লেখক সমাজতত্ত্ববিদ)

