সানি সরকার, শিলিগুড়ি: মৃত্যুমিছিল থামছে না বেঙ্গল সাফারিতে (Bengal Safari)। বার্ধক্যজনিত কারণে কুনকি লক্ষ্মীর মৃত্যুর পর এবার সামনে এল তিন রয়েল বেঙ্গল শাবকের মৃত্যুর ঘটনা। সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে স্বাভাবিক দাবি করলেও বিতর্ক কিন্তু থামছে না। আরও জল্পনা বেড়েছে কর্তৃপক্ষ প্রথম থেকে বিষয়টি নিয়ে রাখঢাক করায়। শাবক তিনটি কবে মারা গিয়েছে, একসঙ্গে মারা গিয়েছে কি না, কারণ কী ছিল ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তরও অধরা থেকেছে সাফারি পার্কের কর্তাদের কাছে।
চলতি বছর মার্চ মাসের শেষের দিকে শিলা এবং বিভান জন্ম দেয় পাঁচটি শাবকের। যার জেরে বেঙ্গল সাফারিতে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের (Royal Bengal Tiger) সদস্য সংখ্যা বেড়ে হয় ১৫। পার্ক সূত্রে খবর, ওই পাঁচটির মধ্যে তিনটি শাবক সম্প্রতি মারা গিয়েছে। ফলে এখন বেঙ্গল সাফারিতে রয়েছে ১২টি রয়েল বেঙ্গল।


বাঘের মৃত্যু নিয়ে কর্তৃপক্ষ ‘স্পিকটি নট’ হলেও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় সরকার যে বিশেষ জোর দিচ্ছে, তা স্পষ্ট হয় বেঙ্গল সাফারিতে শুক্রবার শুরু হওয়া তিনদিনের ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রোগ্রাম থেকে। এই প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশ নিয়েছেন পূর্বাঞ্চলীয় পাঁচটি রাজ্যের জু কিপাররা। কীভাবে শাবক এবং পূর্ণবয়স্ক বন্যপ্রাণীদের লালনপালন করতে হবে, স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে সেই সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে এদিন থেকে। সেন্ট্রাল জু অথরিটির সিনিয়ার ফেলো রিসার্চ সালু মিসারিয়া ছাড়াও প্রশিক্ষণ শিবিরে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য জু অথরিটির টেকনিকাল কনসালট্যান্ট আশিসকুমার সামন্ত, দার্জিলিংয়ের পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুওলজিক্যাল পার্কের ডিরেক্টর বাসবরাজ এস হোলিয়াচি এবং বেঙ্গল সাফারির ডিরেক্টর ই বিজয়কুমার।
গত বছরও সাফারি পার্কে মৃত্যু হয়েছিল জোড়া ব্যাঘ্র শাবকের। ১২ জুলাই দুটি শাবকের জন্ম দেয় সাদা বাঘ কিকা। পরদিনই একটি শাবকের মৃত্যু হয়। তার মাসখানেক বাদে আরেকটি শাবকও মারা যায়। প্রথম মৃত্যুর ক্ষেত্রে পার্ক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পরে সাফারি পার্কের চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, অপুষ্টিজনিত কারণ দ্বিতীয় শাবকটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। নতুন তিন শাবকের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও কি তাহলে অপুষ্টিই দায়ী? উত্তর অবশ্য মেলেনি।
বন্যপ্রাণ চিকিৎসকদের একাংশ বলছেন, বুনোদের মৃত্যু হয় মূলত শাবক অবস্থায়। আবহাওয়া এবং খাদ্যাভ্যাসের এদিক-ওদিক হলেই সমস্যা শুরু হয়। যে কারণে আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই কী ধরনের খাদ্যাভ্যাস প্রয়োজন, কীভাবে শাবকদের আগলে রাখতে হয়, নজর রাখতে হয় পূর্ণবয়স্কদের দিকে- সেই সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এই সমস্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত জু কিপারদের। ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, ছত্রিশগড় এবং পশ্চিমবঙ্গের ২১টি জু’র কিপাররা অংশ নিয়েছেন তিনদিনের প্রশিক্ষণ শিবিরে। মূলত মৃত্যুর হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যেই এই ধরনের শিবির। কয়েকটি চিড়িয়াখানার পাশাপাশি বেঙ্গল সাফারিতে তিন শাবকের মৃত্যুর বিষয়টিও উঠে এসেছে শিবিরে। যদিও শাবকের মৃত্যুর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই বলে মনে করছেন বনকর্তারা। এদিন প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত বিষয়ে বেঙ্গল সাফারির ডিরেক্টর ই বিজয়কুমার বলেন, ‘চিড়িয়াখানা এবং মুক্তাঞ্চল বনাঞ্চলে কীভাবে শাবকের লালনপালন করতে হবে, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ করতে হবে, সেই সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’ কিছুদিনের মধ্যে বেঙ্গল সাফারিতে সিংহ শাবক দেখতে পাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
এদিকে, গত মাসেই বেঙ্গল সাফারিতে মারা যায় কুনকি হাতি লক্ষ্মী। ফলে এখন হাতি সাফারিতে ভরসা একমাত্র ঊর্মিলা। ঊর্মিলার সঙ্গীর জন্য অর্থাৎ আরও একটি কুনকি হাতি পাওয়ার জন্য রাজ্য চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে বেঙ্গল সাফারি কর্তৃপক্ষ। সাফারির ডিরেক্টর বলছেন, ‘আমাদের তরফে আবেদন জানানো হয়েছে। তবে কবে পাওয়া যাবে বা কোথা থেকে কুনকি হাতি আসবে, তা এখন পর্যন্ত আমরা জানতে পারিনি।’
জানুয়ারি মাসে সিংহ সাফারি শুরুর কোনও সম্ভাবনা যে নেই, তাও এদিন স্পষ্ট হয়েছে। কেননা, সেন্ট্রাল জু অথরিটির অনুমতি এখনও মেলেনি।

