- সুমন্ত বাগচী
বছরচারেক বাদে পুরোনো সেই চেনা হাড়কাঁপানো শীত আবার ফিরে এসেছে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রার শিরোপা দার্জিলিংয়ের দখলে থাকলেও সবাইকে চমকে দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বীরভূমের ‘শ্রীনিকেতন’। উত্তরবঙ্গের সমতলের শীতকে এবার যেন রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে রাঢ়বঙ্গের শুকনো ঠান্ডা। গত কয়েক বছর লেপ সেভাবে বার করতেই হয়নি, পাতলা কম্বলেই দিব্যি শীত জব্দ ছিল। কিন্তু এবছর বেলা পর্যন্ত কুয়াশায় ঢাকা আকাশ, উত্তুরে হাওয়া আর ঝিরঝিরে বৃষ্টির একাধিক ‘স্পেল’ ইতিমধ্যেই বাঙালির হাড়হিম করে ছেড়েছে।
শীতঋতু কি মানুষকে কিছুটা অন্তর্মুখী করে তোলে? লক্ষ করলে দেখা যায়, শীতের দেশের মানুষরা কাজ করেন অনেক বেশি, কিন্তু কথা বলেন কম। তীব্র শীতে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরোনোর প্রশ্ন নেই, অনেকটা সময় গৃহবন্দি হয়েই কাটে। আর সেই নিভৃত মুহূর্তেই ফেলে আসা ‘অতীত’ মনের জানলায় উঁকি দেয়। ইউরোপের তীব্র দীর্ঘ শীতের সঙ্গে বিষণ্ণতার সম্পর্ক আজ বিজ্ঞানেও প্রমাণিত। একে বলা হয় ‘উইন্টার ব্লুজ’। বিলেতের মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা লক্ষ করেছেন, শীতকালে অনেকের মধ্যেই মানসিক অবসাদ, ক্লান্তি ও ঘুমের আধিক্য দেখা দেয়। এই অবস্থার নাম ‘সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার’ বা সংক্ষেপে ‘স্যাড’ (SAD)। আমাদের মস্তিষ্কের ‘মেলাটোনিন’ হরমোনের ভারসাম্যহীনতাই এর মূলে। ছোট দিন আর সূর্যের আলোর অভাব এই হরমোনের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করে আমাদের মনকে অবশ করে দেয়।
বিলেত থেকে স্বদেশে ফিরলে কিন্তু স্মৃতিরা বেশ রঙিন। সাত-আটের দশকে উত্তরবঙ্গের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে শীতের প্রস্তুতি শুরু হত অনেক আগে থেকে। জ্বালানি হিসেবে ‘ঘুঁটে’ জমিয়ে রাখা হত, কয়লার ডিপোয় পড়ত লম্বা লাইন। আজকের মতো ‘অ্যাটাচড বাথরুম’ তখন কল্পনার অতীত। সেই কনকনে ভোরে বাথরুমে যাওয়ার আতঙ্ক আজও স্মৃতিতে টাটকা। রান্নাঘরে তখন উনুনের ধোঁয়ায় মেশা মশুর ডালের খিচুড়ি আর ডিমের অমলেটের স্বর্গীয় সুঘ্রাণ। শীতের পোশাক বলতে ছিল শুধুই হাতেবোনা সোয়েটার। দুপুরবেলা রোদে পিঠ দিয়ে পাড়ার মহিলাদের দলবেঁধে উলের সোয়েটার বোনার সেই দৃশ্য আজ বিলুপ্তপ্রায়। মাপ ঠিক করার জন্য কাউকে ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা কিংবা বারবার হাতা মাপার সেই ঘরোয়া উত্তাপ এখনকার ব্র্যান্ডেড জ্যাকেটের জমানায় নেই বললেই চলে। আধুনিক ‘উইন্ডচিটার’ আসলে স্কুটার বা মোটরবাইক সংস্কৃতির দান, যা হাতে বোনা সোয়েটারের ছিদ্র দিয়ে ঢোকা বাতাসকে রুখতে পারে।
শীতের সঙ্গে সার্কাসের সম্পর্ক আজ ছিন্নপ্রায়। বাঘ-সিংহ নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই সার্কাসের তাঁবু তার গৌরব হারিয়েছে। গ্যালারিতে বসে রুদ্ধশ্বাস ট্রাপিজের খেলা দেখার সেই রোমাঞ্চ আজকের মাল্টিপ্লেক্সের যুগে বোঝানো দুষ্কর। সার্কাসের সেই বিশেষ বাজনার সুর শুনলেই এক অদ্ভুত যাযাবর জীবন বা জিপসিদের কথা মনে পড়ে যেত। পাহাড়ের মানুষ আজও শীতের কমলালেবু আর পশম নিয়ে সমতলে ডেরা বাঁধেন ঠিকই, কিন্তু ডজন দরে লেবু কেনার দিনগুলো আজ ইতিহাস। শীতের রাতে আধো-জাগরূক অবস্থায় আজও যখন দূর থেকে ভেসে আসা অষ্টপ্রহর কীর্তনের সুর কানে আসে, মনে হয় এ যেন অন্য কোনও অলীকপুর থেকে ভেসে আসা স্মৃতি। পুরোনো শীত একা আসে না, সঙ্গে নিয়ে আসে ফেলে আসা সময়ের এক দীর্ঘ অ্যালবাম।
(লেখক শিক্ষক। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)

