রেডি, স্টেডি, গো… লাফের বিশেষজ্ঞরা আজ তৈরি

শেষ আপডেট:

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

বাংলার নির্বাচনি বুথফেরত সমীক্ষা দেখে পাড়ার পচাদার খুব চিন্তা দেখলাম দুটো প্রশ্ন নিয়ে।

নীল নবান্ন থেকে কি রাজ্যের মূল দপ্তর আবার লাল রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ফিরে যাবে? তা হলে নবান্নতে কী হবে এখন?

দ্বিতীয় কৌতূহল, সরকার গড়লে অন্য রাজ্যের মতো বিজেপি কি জোড়া উপমুখ্যমন্ত্রী করবে?

পচাদার মতো পাড়ার অনেক দাদারই অনেক কিছু নিয়ে কৌতূহল ও চিন্তা। সবচেয়ে বড় চিন্তা এবার ফেসবুকে কী নিয়ে লেখালেখি করবেন। ভোট তো অনেক হল! রাজনৈতিক কচকচি বড়জোর আরও দিন দশেক শুনবে লোকজন। এরপরেও তো চালাতে হবে। আত্মীয় বন্ধু সংসর্গে আর সুখ নেই। যত সুখ মোবাইল সংসর্গে।

গোপালদা ঠিকই বলেন, সব মানুষই এখন বিশেষজ্ঞ হয়ে গিয়েছে। কেউ সাধারণ মানুষ হয়ে থাকতে চায় না। সবাই সাংবাদিকের কাজ করতে চায়। পাড়ার স্টুডিওর ক্যামেরাম্যান যদি ইউটিউবার হয়ে নেতা, অভিনেতার সঙ্গে গা ঘষাঘষি করতে পারে, তা হলে আমিও কম কী! হম কিসিসে কম নেহি ভাই, হম কিসিসে কম নেহি!

সবাই বিশ্লেষণ তো করবেই, নিজের মতো করে সাংবাদিকসুলভ ব্রেকিং খবরও দিতে চাইবে। এই সাংবাদিক হওয়ার লক্ষ্যে অনেকে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়কে বহু আগে মেরেই ফেলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। লাভ সাইন, নমস্কারের সাইন, আরআইপি লেখা খবর রি-চেক না করে লেখার কুফল। রি-চেক আর করবে কেন! অন্যের আগে তো খবর দিতে হবে!

ছোটনদা পদ্মফুলেই মধু পান বহুদিন। টোটনদা আবার পদ্মফুলে কোনও গন্ধ পান না। এগজিট পোলের খবর দেখার পর ছোটনদার যেমন নাচানাচি চলছে, টোটনদা বিদ্রুপ করে বলছে, ক’টা সংস্থার নাম শুনেছিস আগে? এরা যে হঠাৎ গজিয়ে ওঠেনি তার কী গ্যারান্টি!

এসব তর্কাতর্কির ফাঁকে সান্ধ্য আড্ডায় ভোম্বলদা মজা করে বলল, ‘ইলেকশন তো শেষ। এবার আর কী নিয়ে তর্ক করবি তোরা! ফেসবুকে যে বিশেষজ্ঞ কম পড়ে যাবে।’ রাজনীতির ক্ষেত্রে ছোটনদা আর টোটনদার যতই মতের অমিল থাকুক, এই জায়গায় এসে তাঁরা এক হয়ে গেলেন হঠাৎ। একযোগে বলে উঠলেন, ‘আলোচনার কি কম বিষয় থাকে? এরপর আইপিএল চলছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ চলবে। তারপরে বিশ্বকাপ।’

এখন কি স্বচ্ছন্দে বাঙালি রাজনীতি থেকে ফুটবলে বিচরণ করে! সব কিছুতেই এক্সপার্ট। সব কিছুতেই সাংবাদিক। জুনে বিশ্বকাপ শুরু হলে বাঙালি ভিনিসিয়াসের কোন পা’টা ইয়ামালের কোন পায়ের থেকে ভালো, দিব্যি বলতে পারবে। এখন লোকের জ্ঞান প্রচুর! এখন লোকের আত্মবিশ্বাসও প্রচুর। যে কোনও সময় লোকে যে কোনও বিষয়ে ঢুকে যেতে পারে। শুধু একবার বলবেন, রেডি, স্টেডি, গো…। ব্যাস, ট্র্যাক বদলে যাবে।

তাই বুঝি মমতা-মোদি থেকে এই বঙ্গসন্তানের দল ট্রাম্প-নেতানিয়াহু হয়ে দিব্যি রোনাল্ডো-মেসিতে চলে যেতে পারে। শুধু চলে যেতে পারে না, বিশেষজ্ঞের মতামত দিতে পারে নির্দ্বিধায়। চার-পাঁচ লাইন লিখেও দেবে ফেসবুকে।

আসলে এসব ক্ষেত্রে বাঙালির যত আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, তত কমেছে লজ্জা এবং বিবেচনা বোধের দায়। কোনটাতে মন্তব্য করা উচিত, কোনটাতে নৈঃশব্দ জরুরি, সেই ভাবনাটাই আস্তে আস্তে কুয়াশাচ্ছন্ন। বাঙালি সাহিত্যিক থেকে শুরু করে পরিচালক, প্রযোজক থেকে অভিনেতা নিজেকে সামলাতে পারছেন না কেউই। সবাই কিছু না কিছু মন্তব্য করছেন। এবং তাতে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এঁদের নিজেদের হিংসা, ঈর্ষা, ল্যাং মারামারির খেলা। না পাওয়ার ক্ষোভ। ধান্দাবাজি। সুবিধেবাদের গল্প। অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী জেনেও প্রবলভাবে নেমে পড়ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক হওয়ার লোভে।

এক অদ্ভুত তাড়নায় সবাই কিছু না কিছু বলছেন। আর সেই বলাবলির ভেতরেই উঁকি দিচ্ছে একে অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার সুপ্ত প্রতিযোগিতা। ডিজিটাল দুনিয়ায় লাইক-কমেন্টের লোভে এই যে তড়িঘড়ি ‘বিশেষজ্ঞ’ হয়ে ওঠা, তাতে পাণ্ডিত্যের চেয়েও আত্মপ্রচারের নেশাই যেন বেশি।

এ বলে আমায় দ্যাখ, ও বলে আমায় দ্যাখ। এঁদের পাশাপাশি এই বঙ্গে আর এক দল রয়েছে দেখার মতো। অধিকাংশই দেওয়ালের ওপর চিন্তিত মুখে বসে। ক্ষমতার ভরবিন্দু পালটালেই এদিক ভুলে ওদিকে লাফাবেন নিশ্চিতভাবে। প্রত্যাবর্তন হলে একরকম ভল্ট, পরিবর্তন হলে আর একরকম। এঁরা কখনও মনে করাবেন হাইজাম্পের জেভিয়ার সোতোমেয়ারকে, কখনও পোল ভল্টের সের্গেই বুবকাকে, কখনও লংজাম্পের কার্ল লুইসকে। কখনও ৫৯ বছরের আগের হরিয়ানার নেতা গয়ালালকে। দু’সপ্তাহে তিনবার দল পালটানোর পর যাঁর কথা ভেবে শুরু হয়েছিল ‘আয়ারাম গয়ারাম’ বলা।

এই বঙ্গসন্তানরা আবার ডিগবাজি খাওয়ার বিশেষজ্ঞ। আয়ারাম গয়ারামের দল এখন বাংলার ঘরে ঘরে। ভরে গিয়েছে রাজ্যে। তাঁরা স্টার্টিং ব্লকে দাঁড়িয়ে লাফানোর অপেক্ষায়। রেডি, স্টেডি, গো…।

Categories
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

যে হাতে ক্ষমতা, সেই হাতে বন্দি বঙ্গ বিবেক

রূপায়ণ ভট্টাচার্য পঁচিশে বৈশাখ। সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা...

জটিল অর্থনীতি, সহজ পাঠ মোদির 

অনিরুদ্ধ দাশগুপ্ত সোনার গয়না কেনা বা নিজের গাড়িতে চেপে প্রতিদিন অফিসে...

রং পালটে ক্ষমতার কাছে ফেরার মরিয়া চেষ্টা

দীপ সাহা শিকারির হাত থেকে বাঁচতে, কখনও বা সঙ্গিনীর নজরে...

তৃণমূলিকরণ ঠেকানো কি আদৌ সম্ভব শমীকের?

গৌতম সরকার গৈরিকীকরণ স্বাভাবিক। কিন্তু দুয়ারে বিপদ তৃণমূলিকরণের! বিজেপির জন্য...