দক্ষিণ দিয়ে উত্তরের ক্ষতি ঢাকতে চায় তৃণমূল

শেষ আপডেট:

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

পয়লা বৈশাখের সন্ধে। হরিশ চ্যাটার্জি রোড ধরে হরিশ মুখার্জি রোডের দিকে এগোনোর সময় কালীঘাট পটুয়াপাড়ায় অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পার্টির পতাকার পাশাপাশি সিপিএমের প্রচুর পতাকা ঝুলছে রাস্তার দু’পাশে। আর একটু এগোলে কিছু পতাকা উড়ছে কংগ্রেসেরও। মুখ্যমন্ত্রীর পাড়া এবং তাঁর এলাকা সংলগ্ন পথে বিজেপির পতাকার কোনও অস্তিত্ব নেই।

সিপিএম-কংগ্রেস দিদির পাড়ার এই দুর্ভেদ্য গড়ে প্রবলভাবে ঢুকল, আর বিজেপিই পারল না! কোনও স্ট্র্যাটেজি কাজ করছে কি?

মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি থেকে পাঁচ পা এগোলেই রাস্তার ধারে তৈরি হচ্ছে নানা রকমের ঠাকুর। সামনে বড় পুজো নেই এখনও। তবু রাতের রাস্তার ধারে মাটির কালী প্রতিমা পড়ে আছে। খুব সরু ঘরে সার দিয়ে রাখা ছোট কালী প্রতিমা। কালীপুজো সারাবছর লেগেই থাকে। একজন শিল্পী মা শীতলার মূর্তি সবে ধরেছেন। খড়ের কাজ চলছে। ভোটের কথা শুনে অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘কোনও আগ্রহ নেই জানেন। আমাদের পেট ভরানোর দায় অনেক বেশি।’

ভবানীপুরের একমাত্র জীবন্ত সিনেমা বিজলির পাশে বিজলি গ্রিলের দোকানেও একই কথা বললেন দুই কর্মী। একজন ক্যানিংয়ের, একজন কলকাতারই বন্ডেল গেটের ভোটার। মুখ্যমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দাবিদার এই কেন্দ্রে লড়ছেন, অথচ কেমন যেন উদাসীন মানুষ! সপ্তাহ দুই বাকি বলেই কি? হরিশ মুখার্জি ও চ্যাটার্জির মোড় পেরিয়ে ভূতপরি হয়ে থাকা পূর্ণ সিনেমার দিকে যাওয়ার সময় চোখে এল, সিপিএমের কয়েকজন প্রবীণ কর্মী ফ্ল্যাগ লাগাচ্ছেন। এর মাঝে বহু জায়গাতেই ফুটপাথে অনেকে মিলে তাস খেলছেন।

এই তো এখানে পতাকা লাগানো নিয়ে এদিকে বিশাল ঝামেলা হল ক’দিন আগে! আপনাদের সমস্যা হচ্ছে না? সযত্নে লাল পতাকা লাগাতে লাগাতে এক প্রবীণের উত্তর, ‘মাঝে একবার হয়েছিল, এখন তো আর কিছু হচ্ছে না।’ দেখলামও, তৃণমূলের পতাকার মাঝেই দিব্যি কিছু লাল পতাকা গুঁজে দিচ্ছেন তাঁরা।

তৃণমূলের উদ্যোগে সেদিন হরিশ পার্কে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান হচ্ছিল আর বিজেপির উদ্যোগে চলছিল হাজরা মোড়েই। হাজরা পার্কের গায়ে বড় রাস্তার উপরে অনুষ্ঠান। হচ্ছে বাঙালিদের নববর্ষ বরণ আর ওখানে শুনলাম মাঝে মাঝেই হিন্দি ভজন হচ্ছে, হচ্ছে রাম বা কৃষ্ণ সংকীর্তন। শুভেন্দু অধিকারী নামতে অনেকেই জয় শ্রীরাম চ্যাঁচালেন। ওই ভিড়ে অবাঙালিদেরই মুখ বেশি।

উত্তরবঙ্গের উপরের চার জেলায় যে পদ্মের চাষ অনেক বেশি হচ্ছে, এটা এতদিনে স্পষ্ট। দক্ষিণের অবস্থা কী? কেমন পরিস্থিতি মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্রের? ভবানীপুরজুড়ে ঘুরে বেড়ানোর পর মনে হচ্ছে, লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি! তবে দুই প্রধান পক্ষ চূড়ান্ত বিভ্রান্ত বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা নিয়ে। এটা যে কার সুবিধে, স্থানীয় নেতারা তা নিয়ে বিভ্রান্ত। মুসলিম নাম (চারজনের মধ্যে একজন) হিন্দুদের (১৮ জনের মধ্যে একজন) তুলনায় বেশি বাদ বলে বিজেপি নেতাদের মুখ বেশি হাসি হাসি।

আরও চোখে পড়ল, এখানে বাঙালি ও অবাঙালি ভাগাভাগিটা অনেক বেশি হয়ে গিয়েছে। গুজরাটি, মাড়োয়ারি, বিহারি ও শিখেরা সবচেয়ে বেশি এখানে। শিখ এবং গরিব বিহারির ভোট মমতা পাচ্ছেন। বাকিদের ভোট বেশি পাওয়ার কথা শুভেন্দুর। তবে বাঙালিপাড়ায় পদ্মের বেশি পতাকা না থাকাটা চোখে পড়ার মতো। যেমন চোখে পড়ার মতো শুভেন্দুর অনুষ্ঠানে অবাঙালিদের ভিড়। এঁরা অনেকে অন্য রাজ্যের হলেও অবাক হব না।

উত্তরবঙ্গের সম্পূর্ণ উত্তরে পদ্মবন তৈরি হলেও উত্তর দিনাজপুর আর মালদার ছবি অন্যরকম। মালদার মতো মুর্শিদাবাদেও কংগ্রেস হঠাৎই প্রবল দাবিদার হয়ে উঠেছে অন্তত ছয় থেকে সাত সিটের। সেখানে অনেক জায়গায় মুসলমান ভোট বেশি পড়বে কংগ্রেসে।

দক্ষিণবঙ্গের কী পরিস্থিতি, জানতে চান? কলকাতা ঘুরতে ঘুরতে যেমন মনে হচ্ছে, এই ভোট অনেকটা বাঙালি বনাম অবাঙালি খেলায় চলে গিয়েছে। অন্যান্য অঞ্চলেও কিন্তু আরেক রকম লড়াই চলছে— হিন্দু বনাম মুসলিম। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির পক্ষে সবচেয়ে বড় লজ্জা নিয়ে আসছে এই নির্বাচন। এভাবে হিন্দু-মুসলিম বা বাঙালি-অবাঙালির ভোট আগে কখনও হয়নি। আর হবে বলেও মনে হয় না।

দক্ষিণবঙ্গে কী সামগ্রিক পরিস্থিতি? এখানে যা শুনছি, তাতে শুভেন্দুর পূর্ব মেদিনীপুরে বিজেপি অনেকটা এগিয়ে। অনেকটাই। একেবারে আলিপুরদুয়ার-কোচবিহারের মতো। অনেকটা উত্তরবঙ্গের উপরের মডেলে। ঠিক একইভাবে আবার উত্তর চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলিতে এগিয়ে তৃণমূল। প্রথম দুটো তো তাদের গড়। কিছুটা দুই বর্ধমান ও বীরভূমেও। হুগলিতে আরামবাগ ডিভিশনে এগিয়ে থাকবে বিজেপি। কলকাতার জোড়াসাঁকোয় বিজেপি এগিয়ে। রাসবিহারী, ভবানীপুর, চৌরিঙ্গ, শ্যামপুকুর, মানিকতলায় জোর লড়াই।

বাকি পাঁচ জেলা পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম এবং নদিয়ায় লড়াই উনিশ-বিশ। মুর্শিদাবাদে শুধু ত্রিমুখী লড়াই। মালদার মতো এখানেও কংগ্রেস কিছু আসন কাটতে পারে তৃণমূলের। রাহুলের ঘুরে যাওয়াটা তৃণমূলেরই ক্ষতি বেশি।

ভবানীপুর থানা ও আশুতোষ কলেজের মাঝে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু হোর্ডিং জড়ো করছিল একদল তরুণ। মমতার ছবির নীচে সেখানে লেখা— ‘আজানে শঙ্খে ধ্বনিত হোক সম্প্রীতির সুর, ঘরের মেয়ের প্রহর গুনছে আবার ভবানীপুর’।

সম্প্রীতির সুরটা আসলে কোথায়? ভবানীপুরের পথেঘাটে তথাকথিত ভদ্রলোকের মুখেও শুনলাম প্রবলভাবে হিন্দু-মুসলিম ভাগাভাগির কথা! বাঙালি-অবাঙালির কথা। ভোট নিয়ে প্রশ্ন করলেই তাঁরা বলছেন, ওই ওয়ার্ডে বাঙালি বেশি, অমুক ওয়ার্ডে মুসলিম।

জগুবাবুর বাজারের পিছনে গুজরাটি মহল্লায় সরাসরি অনেকে বললেন, মোদি-শা’র গুজরাটি কানেকশনেই ভোট দিতে হবে। এই এলাকায় গুজরাটি খাবারদাবারের দোকানের রমরমা ভালোই। ভাবার চেষ্টা করলাম, নয়াদিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্ক এলাকার কেউ কি এইভাবে ভোটের আগে বাঙালি জাতির কথা ভাববে? না দল দেখে, প্রার্থী ভেবে ভোট দেবে? ওখানে এইভাবে বাঙালি-অবাঙালি ভাবনাটা এখনও গ্রাস করেনি হয়তো। বা সামান্য দূরের লেক মার্কেট এলাকায়, যা পড়ছে রাসবিহারী কেন্দ্রে। যেখানে দক্ষিণ ভারতীয়দের ভিড়! সেখানে কোনও পার্টির প্রার্থীকেই মাছ হাতে ঘুরতে হবে না। ভোটারদের বোঝাতে হবে না, মাছ খেলে সমস্যা হতে পারে। বা হবে না।

আগেই লিখেছি, বঙ্গ রাজনীতির পক্ষে সবচেয়ে বড় লজ্জা হতে চলেছে এই নির্বাচন। এমন করে হিন্দু-মুসলিম বা বাঙালি-অবাঙালির ভোট আগে কখনও দেখেনি বাংলা।

Categories
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

যে হাতে ক্ষমতা, সেই হাতে বন্দি বঙ্গ বিবেক

রূপায়ণ ভট্টাচার্য পঁচিশে বৈশাখ। সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা...

জটিল অর্থনীতি, সহজ পাঠ মোদির 

অনিরুদ্ধ দাশগুপ্ত সোনার গয়না কেনা বা নিজের গাড়িতে চেপে প্রতিদিন অফিসে...

রং পালটে ক্ষমতার কাছে ফেরার মরিয়া চেষ্টা

দীপ সাহা শিকারির হাত থেকে বাঁচতে, কখনও বা সঙ্গিনীর নজরে...

তৃণমূলিকরণ ঠেকানো কি আদৌ সম্ভব শমীকের?

গৌতম সরকার গৈরিকীকরণ স্বাভাবিক। কিন্তু দুয়ারে বিপদ তৃণমূলিকরণের! বিজেপির জন্য...