সমীর দাস, হাসিমারা: চার শ্রমিকের মৃত্যুর ৬০ ঘণ্টার মধ্যেই খুলে গেল আড়াই মাস ধরে বন্ধ থাকা ভার্নোবাড়ি চা বাগান (Bharnobari Tea Estate)। শ্রমিক মহল্লায় প্রশ্ন উঠছে, আড়াই মাস ধরে তিনটি বৈঠকে টালবাহানা না চললে তো এভাবে অন্য বাগানে কাজ করতে যেতে হত না। অকালে পরিবারকে অনাথ করে চলে যেতে হত না চার মহিলা শ্রমিককে।
শনিবার দুর্ঘটনার পর বাগানের শ্রমিকরা ৪৮ নম্বর এশিয়ান হাইওয়েতে ১০ নম্বর এলাকা অবরোধ শুরু করেন। তাঁদের আন্দোলনের ঝাঁঝ দেখে তড়িঘড়ি ডেপুটি শ্রম কমিশনার গোপাল বিশ্বাস ঘটনাস্থলে এসে সোমবার বাগান খুলবে বলে আশ্বাস দেন। গত আড়াই মাস ধরে বাগানে পরিচালকদের কারও দেখা না মিললেও রবিবার সন্ধ্যাতেই বাগানে চলে আসেন নতুন জেনারেল ম্যানেজার মদনমোহন ঝা ও সহকারী ম্যানেজাররা। সোমবার দুপুরে ডুয়ার্সকন্যায় ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের পর বাগানের জেনারেল ম্যানেজার মদনমোহন ঝা বলেন, ‘এদিন বাগান স্বাভাবিকভাবে খুলছে। আগামীদিনে বাগান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা হবে।’
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চা বাগান মালিকপক্ষের সংগঠন টি অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার (টাই) সম্পাদক সুমিত ঘোষ। তিনি বলেছেন, ‘বাগান সুষ্ঠুভাবে চলবে বলে আমরা আশা করছি।’ এদিন মৃত শ্রমিকদের শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। শ্রম দপ্তরের তরফে জানানো হয়েছে, খুব শীঘ্রই রাজ্য সরকারের তরফে মৃত শ্রমিকদের পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দেওয়া হবে। এক মাসের মধ্যে বাগানের পরিস্থিতি নিয়ে ফের রিভিউ মিটিং হবে।
ভার্নোবাড়ির শ্রমিক দেবী লোহারের কথায়, ‘এর আগে অন্তত তিনটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হয়েছে। তবে সেই বৈঠকগুলোয় সিদ্ধান্ত হলেই তো চার সহকর্মীকে হারাতে হত না আমাদের। বাগান বন্ধ থাকায় আমাদের সবাইকে অন্য বাগানে যেতে হচ্ছিল।’ বাগানের আরেক শ্রমিক সিয়া খাড়িয়ার কথায়, ‘গতমাসের ২৬ তারিখ বৈঠকের পর বাগান খুললে এতগুলো তরতাজা প্রাণ হারাত না। ঘটনার জেরে কয়েকটি পরিবার অভিভাবকহীন হয়ে গেল।’
যদিও শ্রম দপ্তরের দাবি, ২৬ ফেব্রুয়ারি ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে বাগান খোলা নিয়ে কর্তৃপক্ষ সবুজ সংকেত দিয়েছিল। ২ মার্চ বাগান খোলার জন্য বৈঠক ডাকা হয়েছিল গত শুক্রবার।
বাগান খুললেও শ্রমিকদের মনে যে ক্ষোভ রয়েছে তা এদিন শ্রমিকদের উপস্থিতির হার দেখলেই বোঝা যায়। বাগান সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ শ্রমিক কাজেই আসেননি। বাগান সূত্রে খবর, মূলত পুরুষ শ্রমিকরা এদিন কাজে যোগ দিয়েছেন। মহিলা শ্রমিকদের উপস্থিতির হার খুবই কম ছিল প্রথম দিন। শ্রমিকদের অনেকের মনেই প্রশ্ন, দুর্ঘটনার দায় এড়াতেই কি তড়িঘড়ি বাগান খোলার সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়ল? তা না হলে আড়াই মাসের সমস্যা একদিনে মিটল কীভাবে?
শনিবার দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন বেরথা খাড়িয়া, রজনী ওরাওঁ, অগাস্টিনা মুন্ডা ও পুষ্পা দোরজি। আরও তিন শ্রমিক গুরুতর জখম অবস্থায় চিকিৎসাধীন। বাগানের শ্রমিক সিয়া খাড়িয়ার নিকট আত্মীয় বেরথা। সেই শোক সিয়া এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘দুই-একদিনের মধ্যেই কাজে ফিরব।’ আরেক শ্রমিক সোমা খাড়িয়া বললেন, ‘দিনকয়েক আগেও একসঙ্গে কাজ করছিলাম। আজ কাজে এসে তাঁদের কথাই মনে পড়েছে বারবার।’
ডেপুটি শ্রম কমিশনার গোপাল বিশ্বাস এদিন জানান, শ্রমিকদের বকেয়া একটি পাক্ষিক মজুরি ৯ মার্চ মালিকপক্ষ মিটিয়ে দেবে। তৃণমূল চা বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বীরেন্দ্র বরা ওরাওঁ বলেন, ‘এর আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি বাগান খোলার পর কাজের রূপরেখা তুলে ধরার দাবি জানানো হয়েছিল। এদিন মালিকপক্ষের তরফে নতুন প্ল্যান্টেশন সহ বাগানের উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। আগামীদিনে বাগান পরিচালনা করার জন্য আমরা সবরকম সহযোগিতা করব।’
কয়েকমাস বন্ধ থাকায় বাগানের সেকশনগুলো ঝোপঝাড়ে ভরে গিয়েছে। বাগান খোলার পর এদিন চা গাছ ছাঁটতে দেখা গেল শ্রমিকদের। কিছু শ্রমিক আবার ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার কাজে নিযুক্ত হয়েছেন। বুধবার হোলির ছুটি। তারপর চা পাতা তোলার কাজ শুরু হবে বলে বাগান সূত্রে জানা গিয়েছে।

