শুভদীপ শর্মা, লাটাগুড়ি: গরুমারা ও লাটাগুড়ি জঙ্গলের কোল ঘেঁষে থাকা বিচাভাঙ্গা বনবস্তিবাসীর (Bichabhanga Forest Village) জীবন প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক জীবন্ত দলিল। এখানে কখনও ভোরের আলো ফুটতেই চাষের জমিতে, সন্ধ্যায় গ্রামের পথে, আবার গভীর রাতে বাড়ির একেবারে কাছেই হাতি চলে আসে। মাঝেমধ্যে চিতাবাঘের দেখা মেলে। সকাল-বিকেলে ফসলের খেতে অবাধে ঘুরে বেড়ায় ময়ূরের দল। বুনোর আতঙ্ক, সতর্কতা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে এভাবেই বছরের পর বছর কাটছে বনবস্তির মানুষের জীবন।
বর্তমানে পর্যটনের হাত ধরে সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেকটা উন্নত হয়েছে। বদলেছে জীবিকা, জঙ্গলের প্রান্তে গড়ে উঠেছে পাকা বাড়ি। জঙ্গলকে সঙ্গী করেই বর্তমানে এই গ্রামের অনেক পুরুষ ও মহিলা স্বনির্ভরতার পথে হাঁটছেন।
লাটাগুড়ি–চালসাগামী ৭১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের নিউ মাল–চ্যাংরাবান্ধা রেলপথ পেরোলেই বিচাভাঙ্গা বনবস্তি। সর্বসাকুল্যে এখানে ৫১টি পরিবারের বাস। প্রায় ২১৫ জন গ্রামবাসী মিলেমিশে গড়ে তুলেছেন এক সহমর্মিতার গ্রাম। চারপাশে ঘন জঙ্গল, আঁকাবাঁকা কাঁচাপথ আর বিস্তৃত চা বাগান-এর মাঝে মানুষের বসতি। স্থানীয় বাসিন্দা দেবা কোরা বলেন, ‘হাতির ভয় আছে। তবে এতে আমরা অভ্যস্ত। রাত হলে সতর্ক থাকি। জঙ্গল আমাদের শুধু ভয় দেয়নি, বাঁচার পথও দেখিয়েছে। আগে দিন চালানো কঠিন ছিল। এখন পর্যটনের জন্য কিছুটা স্বস্তি এসেছে।’
সময়ের সঙ্গে গ্রামের চেহারা পালটেছে। বর্তমানে এই বনবস্তিতে পাঁচটি হোমস্টে তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বন দপ্তর ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরও দুটি রিসর্ট গড়ে উঠেছে। পর্যটনের প্রসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এলাকার আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় মালতী কোরা, তুলসী কোরা ও সুশীলা পাইকরা নিজেদের হাতে তৈরি হস্তশিল্প সামগ্রী বন দপ্তরের সহযোগিতায় পর্যটকদের কাছে বিক্রি করছেন। হীরা পাইক, মুক্তি পাইক, পূজা কোরা ও পার্বতী কোরারা আদিবাসী নৃত্য পরিবেশন করে রোজগারের দিক থেকে গ্রামের পুরুষদের টেক্কা দিচ্ছেন। আদিবাসী শিল্পী পূজা কোরার কথায়, ‘আদিবাসী নাচ আমাদের সংস্কৃতি। আগে সেটা শুধু উৎসবেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন পর্যটকদের সামনে নাচ করে আয় করতে পারছি। এতে সংসার যেমন চলছে, তেমনই আমাদের সংস্কৃতি বেঁচে থাকছে।’
গরুমারা জঙ্গল সংলগ্ন অন্য চারটি বনবস্তির তুলনায় বিচাভাঙ্গা বনবস্তিতে কিছুটা হলেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে বেশ কয়েকটি মুদি দোকান গড়ে উঠেছে। তবে ওষুধ ও জামাকাপড়ের জন্য গ্রামবাসীকে এখনও কয়েক কিলোমিটার দূরে লাটাগুড়ি বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়। পর্যটনের হাত ধরে একের পর এক কংক্রিটের ইমারত গড়ে উঠলেও জঙ্গলের অকৃত্রিম সৌন্দর্য বনবস্তিতে অটুট।

