বিহারের রাজনীতিতে (Bihar Politics) গত দুই দশকের সমীকরণ এক লহমায় বদলে গেল। ভারতীয় রাজনীতিতে পল্টুরাম বলে পরিচিত নীতীশ কুমার (Nitish Kumar) অবশেষে বিহারের মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে রাজ্যসভার পথে পা বাড়িয়েছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে কিছুটা সময় বাকি থাকলেও তাঁকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে বিজেপি।
পুষ্পস্তবক দিয়ে, লাল কার্পেট পেতে তাঁকে ২১ বছর বাদে বিহার থেকে দিল্লিতে পাঠিয়ে গেরুয়া শিবির শুধু নীতীশের দীর্ঘদিনের অপূর্ণ সাধ পূরণ করেনি, নিজেদের বহুদিনের লালিত স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে চলেছে। বিহারের রাজনীতিতে বরাবর জেডিইউয়ের ছোট শরিক বলে পরিচিত বিজেপি এবার পাটনার রাজ্যপাট দখল করতে চলেছে।
বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন কোনও বিজেপি (BJP) নেতা। নীতীশ স্বেচ্ছায় মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছাড়লেন নাকি বিজেপির চাপের সামনে নতজানু হতে বাধ্য হলেন- সেটা এখন ওপেন সিক্রেট। তবে প্রমাণ হয়ে গেল, নরেন্দ্র মোদি, অমিত শা’র জমানায় বিজেপির মানসিকতা একাধিপত্যবাদের শিখরে পৌঁছেছে। যার সামনে নতিস্বীকার করা ভিন্ন কোনও রাস্তা খোলা নেই শরিক দলগুলির।
নীতীশের এই বিদায় আচমকা হলেও আকস্মিক নয়। তাঁর ডানা ছাঁটার প্রক্রিয়া ২০২০ সালের বিধানসভা ভোটের সময় থেকেই শুরু হয়েছিল। চিরাগ পাসোয়ানকে সামনে রেখে সেবার নীতীশের শক্তি খর্ব করা হয়েছিল। গত বছরের নভেম্বরে নীতীশকে মুখ করে এনডিএ প্রচারে নেমেছিল ঠিকই। কিন্তু তাঁকে কার্যত অতিথিশিল্পীর ভূমিকায় রেখে দেওয়া হয়েছিল।
বিহারে এনডিএ’র বড় শরিক জেডিইউ-কে ধীরে ধীরে ছোট শরিকে পরিণত করা হয়েছিল। এনডিএ’র সংকল্পপত্র প্রকাশের সময় মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য ক্যামেরার সামনে তাঁর উপস্থিতি এবং দ্রুত প্রস্থান বুঝিয়ে দিয়েছিল, নীতীশ বিহারে স্রেফ আলংকারিক নামে পরিণত হয়েছেন।
বিপুল ভোটে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হলেও গত বছর নীতীশ আর আগের দাপট ফিরে পাননি। তাঁর হাত থেকে স্বরাষ্ট্র দপ্তর কেড়ে নেয় বিজেপি। পাটনার ১ নম্বর অ্যানে মার্গে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে দিল্লির বার্তা স্পষ্ট হয় যে, বিহার সরকারের চাবিকাঠি এখন মোদি-শা’দের হাতে। নীতীশের এই পরিণতির তুলনা চলে দেশের অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে।
বাজপেয়ী-আদবানি জমানায় এনডিএ ছিল বহুদলীয় মঞ্চ। মোদি-শা’র জমানায় তার ছিটেফোঁটাও টিকে নেই। শিরোমণি অকালি দল থেকে শিবসেনা- যে দলই বিজেপির ছত্রছায়ায় ছিল, তারা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একনাথ শিন্ডেকে সামনে রেখে উদ্ধব ঠাকরের হাত থেকে শিবসেনা দল ও দলের নির্বাচনি প্রতীক কেড়ে নেওয়া হয় মহারাষ্ট্রে। শিন্ডেও এখন নখদন্তহীন।
শিরোমণি অকালি দলের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙা পড়েছে অনেক আগেই। পঞ্জাবে বাদল পরিবারের প্রভাবেও ক্ষয় ধরেছে। হরিয়ানায় দুষ্মন্ত চৌতালাকে সঙ্গী করেছিল বিজেপি। জাঠভূমে তিনিও এখন অপ্রাসঙ্গিক। জম্মু ও কাশ্মীরে পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি বিজেপির সমর্থনে একদা মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। তারপর থেকে ভূস্বর্গের রাজনীতিতে পিডিপি নেত্রীর শক্তিক্ষয় ক্রমাগত চলছে।
ওডিশার নবীন পট্টনায়েক বা অন্ধ্রপ্রদেশের জগন্মোহন রেড্ডির মতো নেতা, যাঁরা সংসদে বিভিন্ন সময় বিজেপিকে পরোক্ষ সমর্থন দিয়ে এসেছেন, তাঁরাও ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত। এখন জেডিইউ-এর হাল কে ধরবেন? শোনা যাচ্ছে নীতীশ-পুত্র নিশান্তের নাম। কিন্তু আজন্ম পরিবারতন্ত্রের বিরোধিতা করে আসা ললন সিং বা সঞ্জয় ঝা’র মতো দাপুটে জেডিইউ নেতারা কি তা সহজে মেনে নেবেন? নাকি নীতীশের প্রস্থানে জেডিইউ-এর ভাঙন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা?
বিজেপি ঠিক এটাই চেয়েছিল। চোখের নিমেষে জেডিইউ-কে না ভেঙে ধীরেসুস্থে নীতীশকে হাসিমুখে বিহার থেকে বিদায় জানিয়ে তাঁর দলকে গিলে খাওয়ার রাস্তায় হাঁটছে বিজেপি। বিজেপির লক্ষ্য এখন অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডু। সেখানে পবন কল্যাণকে বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার ইঙ্গিত মিলছে। নীতীশ আত্মসমর্পণ করেছেন। চন্দ্রবাবুর দশা ভবিষ্যতে হয়তো তেমনই হবে।

